অবিনির্মাণ
: ইংরেজি প্রতিশব্দ 'ডিকন্স্ট্রাকশন' (Deconstruction) ফরাসি দার্শনিক
জাক দেরিদা প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। প্রাথমিকভাবে
শব্দটি এক বিশেষ ধরনের সাহিত্য-সমালোচনা পদ্ধতি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। ১৯৬০ সালের
শেষ দিকে এই দর্শনসংক্রান্ত দেরিদার লেখা বিভিন্ন আকরগ্রন্থের প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই
এই ধারণার প্রবর্তন হয়। ইংরেজি অনুবাদে গ্রন্থগুলির নাম
: Speech and Phenomena, Of Grammatology এবং Writing and Difference । দেরিদার
দুজন প্রখ্যাত সমালোচক—ইয়েল-এর জে. হিলিস্ মিলার এবং পল
দ্য মান এই সমালোচনাপদ্ধতি ব্যবহার করেন। দেরিদার
মতে পাশ্চাত্য দর্শনে অস্তিত্বের আধিদৈবিক বিষয়টি নিহিত থাকে। অন্যভাবে
বলা যায়, লিখিত শব্দের বিপজ্জনক দ্ব্যর্থ
ব্যঞ্জনার মধ্যে না গিয়ে প্রত্যক্ষভাবে কথিত শব্দের মধ্যে দিয়ে ধ্রুব সত্য বা আপেক্ষিক
সত্য বা কোনও বিশেষ অর্থ বা সারবস্তু অথবা কেন্দ্রীয় বিষয়ের সন্ধান পাওয়া সম্ভব। এটি হল 'শব্দকেন্দ্রিক' বীক্ষণ অর্থাৎ শব্দের মধ্য দিয়ে, শব্দ রূপে সত্যের অনুসন্ধান। এই 'শব্দকেন্দ্রিক' বীক্ষণে স্বাভাবিক কারণেই লিখিত শব্দকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া
হয়। কারণ, বক্তার এবং শ্রোতার মধ্যে সমন্বয়ের ফলে শ্রোতার পক্ষে, যে সত্য কেবলমাত্র বক্তার জানা আছে, সেই সত্যই জানা সম্ভব। নিট্শের
মতে দর্শন তখনই একমাত্র সত্যের সন্ধান পেতে পারে যখন এটি ভাষার অধরা আলংকারিক স্বরূপ
নিবৃত্ত করতে পারে। দেরিদা জোর দিয়ে বলেছেন, যে-কোনও ভাষাতাত্ত্বিক সংযোগস্থাপনে অনিশ্চয়তা এক অবশ্যম্ভাবী
ঘটনা। প্রসঙ্গত
তিনি সুইস ভাষাতাত্ত্বিক ফের্দিনাঁ দ্য সোসুর-এর উল্লেখ করেছেন। সোসুর-এর
মতে ‘তাৎপর্যকারী (signifier) এবং 'তাৎপর্যিতের' (signifié) মধ্যে সম্পূর্ণ
সাযুজ্য কখনোই হতে পারে না। তাঁর মতে
ভাষা হল নেতিবাচক স্বতন্ত্রীকরণের চিহ্ন-সমষ্টি। অর্থাৎ
ভাষার প্রতিটি চিহ্ন 'তা অন্য চিহ্ন নয়'-এই বর্ণনার দ্বারা নিদিষ্ট। দেরিদার
মতে এই কারণেই অসম্পূর্ণ ভাষা, ব্যক্ত
এবং পূর্ণ অর্থকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। ভাষা কখনোই
সত্যকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে না, বরং শব্দের
অর্থের অন্তর্গত স্ববিরোধ, অস্পষ্টতা, বহু-ব্যঞ্জনা ইত্যাদি সত্যের চারদিকে আড়াল রচনা করে। এই দূরত্ব
বা দূরে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে দেরিদা একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করেছেন 'দুরান্তর' (différance) তাই দেরিদা
পাঠ্যবস্তুর বাইরে কোনও অর্থের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। তিনি পাঠককে
স্বাধীনভাবে ব্যাখ্যা করতে আহ্বান জানিয়েছেন। দেরিদার
অনুগামী সাহিত্যসমালোচকরা এমন এক সমালোচনাপদ্ধতির প্রবর্তন করেছেন যার উদ্দেশ্য হল 'অবিনির্মাণ' করা অর্থাৎ যেটি বিনাশ না-করে বিশ্লেষণ করে। স্ববিরোধী
উপাদানের নিবিড় ব্যাখ্যা, অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, কেন্দ্রীয় শব্দগুলির বহুস্তরী অর্থের উম্মোচন এমনকী শব্দের
ব্যুৎপত্তি অনুধাবনও এই 'অবিনির্মাণ' সমালোচনা-পদ্ধতির
বৈশিষ্ট্য। এই পদ্ধতির চূড়ান্ত পর্যায়ে সাহিত্য
ও সমালোচনার মধ্যে কোনও বিভাজন-রেখা থাকে না। সাহিত্য-সমালোচনায়
অবিনির্মাণ পদ্ধতি যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁরা পাঠ্যবিষয়কে
একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক বস্তু রূপে বিবেচনা করে থাকেন। ফলে অনেকসময়
বাচন (discourse) অভিপ্রায়
(intention) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই কারণে
এই পদ্ধতিকে 'নন্দনতাত্ত্বিক' দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন
নেহাত পণ্ডিতি চর্চাও বলা হয়েছে।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন