:::: সূচীপত্র ::::
অগ্রন্থিত-রচনা-১ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অগ্রন্থিত-রচনা-১ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ন ব - সা হি ত্যে র আ গ ম ন



এই সব সমালোচনা পড়ে-শুনে আমার মনে হয় যে, যাঁরা জোর-গলায় নবসাহিত্যকে আবাহন করেছেন, তাঁরা সব তরুণ পাঠক, তরুণ লেখক নয়, কারণ, যে যথার্থ লেখক, সে তো সাহিত্যসৃষ্টিই করছে, সে আবার আহ্বান করবে কাকে সাহিত্য তো বাইরের জিনিস নয়, যাকে নানা রূপ স্তব-স্তুতির দ্বারা ঘরে আনতে হবেসাহিত্য-বস্তু নিজ শক্তিতে নিজের অন্তর থেকে গড়ে তুলতে হয়সাহিত্যের স্বরাজ্য কোন দেশি-বিলেতি কমিশনের প্রসাদে পাওয়া যাবে না

অপর পক্ষে যে পূর্বজন্মের কর্মফলে জন্মেছে শুধু পাঠক হবার জন্য, সে যদি লেখক হতে চায় তো তার সমালোচক হওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর নেইউদাহরণ স্বয়ং আমিসমালোচক জানেন শুধু পূর্ব-সাহিত্য, সুতরাং ভবিষ্যৎ-সাহিত্য সম্বন্ধে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী চিরকাল ভবিষ্যদ্বাণীই রয়ে যাবে
ন ব - সা হি ত্যে র আ গ ম ন


বহু কাল পূর্বে আমি একটি হিন্দি গান শুনি, যার কথাগুলো আজও আমার মনে আছে যদিচ সে গান একবার ছাড়া দু'বার শোনবার সৌভাগ্য আমার অদ্যাবধি হয়নি

সে গানের প্রথম কথা ক'টি এই
'নয়ী আয়ি পুরানীকে দূর করো রে।'

গায়ক ছিলেন জাতে হিন্দুস্থানি এবং এতাদৃশ 'তন্‌দুরস্ত' যে, হঠাৎ দেখলে তাঁকে কুস্তিগির পালোয়ান বলে ভুল হত, মনে হত, ওস্তাদজি জীবনে ততটা গলা ভাঁজেননি যতটা ভেঁজেছেন মুগুর; এবং তিনি এতটা ফুর্তি করে এতটা তারস্বরে এমন ভাব বাৎলে অর্থাৎ ঘুসো পাকিয়ে 'দূর করো রে, দূর করো রে, দুর করো রে' এ ক'টি কথা এত বার আবৃত্তি করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে তাঁর স্বজাতীয় সঙ্গতী ডাইনে-বাঁয়াকে এমন নির্মম ভাবে পিটছিলেন যে, সে গান-বাজনা ব্যাপারটিতে মজাও লাগছিল
অ ভি ভা ষ ণ
৯ম খণ্ড

২০

এ সত্ত্বেও আমি এই গল্প-সাহিত্যের আতিশয্য বঙ্গ-সাহিত্যের একটা সুলক্ষণ বলে মনে করিদশে মিলে যে-জমি তৈরি করে যাচ্ছেন, তার উপরেই ভবিষ্যতে কাব্যের যথার্থ ফুল ফুটবেআজকের দিনে বহু লেখকের রচিত গল্প যে কাব্য নয়, তার কারণ তাদের কল্পনা তেমন পরিস্ফুট ও পরিচ্ছিন্ন নয়কিন্তু এই নব সাহিত্যকে আর এক হিসাবে দেখা যেতে পারেগল্প-সাহিত্য থেকে জাতির নব মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়
অ ভি ভা ষ ণ
৮ম খণ্ড

১৬

আমি এখন বঙ্গ-সাহিত্যের যথার্থ কাব্যাংশের কথা ছেড়ে দিয়ে তার অপরাংশের প্রতি আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইবঙ্গ-সাহিত্য শুধু উঁচু দিকে বাড়ছে না, সেই সঙ্গে তার সর্বাঙ্গীণ উন্নতি হচ্ছে

আমি অবশ্য এ কথা বলতে চাইনে যেইতিমধ্যেই আমাদের দেশে হেরডোটাসথুসিডিডিসলিভিট্যাসিটাস প্রভৃতির আবির্ভাব হয়েছে। আমার বক্তব্য এই যেবাঙ্গালিতে যখন ইতিহাস রচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছেতখন ভবিষ্যতে বাঙ্গালায় নব গিবন-মমসেনের জন্মের আশা আমরা করতে পারি


এ ভাষায় বহু লোক আজ ইতিহাস রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছেনআজকের দিনে দেশের ইতিহাসের পরিচয় লাভ করতে হলে আমাদের আর পরের ভাষার দ্বারস্থ হতে হয় না, আমি অবশ্য এ কথা বলতে চাইনে যে, ইতিমধ্যেই আমাদের দেশে হেরডোটাস, থুসিডিডিস, লিভি, ট্যাসিটাস প্রভৃতির আবির্ভাব হয়েছেআমার বক্তব্য এই যে, বাঙ্গালিতে যখন ইতিহাস রচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছে, তখন ভবিষ্যতে বাঙ্গালায় নব গিবন-মমসেনের জন্মের আশা আমরা করতে পারি
অ ভি ভা ষ ণ
৭ম খণ্ড


১8

আমি এতক্ষণ ধরে আপনাদের কাছে ভাষার বিষয় যে বক্তৃতা করলুম, তার কারণ মানুষের ভাষা তার মনের পরিচয় দেয়আমরা যাকে ভাষার উন্নতি-অবনতি বলি, তা মনের উন্নতি-অবনতির বাহ্য নিদর্শন মাত্রকোন জাতির ভাষা যখন নবরূপ ধারণ করে, তখন বুঝতে হবে যে, সে জাতির মনও নব কলেবর ধারণ করেছেতা ছাড়া ভাষার আলোচনা করা সহজভাষা ভাবের স্থূল দেহ, সূক্ষ্ম শরীর নয়; আর সকলেই জানেন যে, পৃথিবীর সব জিনিসের স্থূল দেহ নিয়েই নাড়াচাড়া করা সহজ, কারণ তা ধরাছোঁয়ার বস্তুকোন পদার্থের সূক্ষ্ম শরীর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, মনোগ্রাহ্যতাই কাব্যবস্তু কী, তার বিচার করতে হলে দর্শনের রাজ্যে ঢুকতে হয়এ ক্ষেত্রে সে আলোচনায় হস্তক্ষেপ করা আমার পক্ষে অনধিকারচর্চা হবে; কারণ আমি এ সভার দার্শনিক শাখার সভাপতি নইআর যদি বিদ্যা দেখাবার লোভে সে আলোচনায় প্রবৃত্ত হই, তা হলেও ধৈর্য ধরে আপনারা তা শুনতে পারবেন নাবাজারে গুজব এই যে, হিন্দু মাত্রেই দার্শনিকযদি এ কথা সত্য হয়, তা হলে তার অর্থ আমরা জাতকে জাত স্বভাব-দার্শনিক, স-তর্ক দার্শনিক নইকিন্তু এ যুগের দর্শনের টানা-পড়েন দুই সমান তর্কে বোনা
অ ভি ভা ষ ণ
৬ষ্ঠ খণ্ড

১২

শ্রীমান্‌ সুনীতিকুমার গণনা করে দেখেছেন যেআমাদের ভাষার অন্তরে অন্তত ২ হাজার ৫ শত ফার্সি শব্দ আর শ-দুয়েক য়ুরোপীয় শব্দ বেমালুম ঢুকে গিয়েছে। এতে যদি সে ভাষা যবনদোষে দুষ্ট হয়ে থাকেতাকে সে দোষ হতে মুক্ত করবার কোন উপায় নেই


এই মাগধী ভাষা বহু কাল যাবত আর্যাবর্তের প্রাচ্য ভাষা অর্থাৎ পূর্ব অঞ্চলের ভাষা বলে পরিচিত ছিলচৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েনং সাং খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে নিজ কানে শুনে গিয়েছেন যে, বঙ্গ বিহার উড়িষ্যা এই তিন সুবায় একই ভাষা প্রচলিত ছিল
অ ভি ভা ষ ণ
৫ম খণ্ড

১০

সংস্কৃত নাটকের সঙ্গে যাঁর চাক্ষুষ পরিচয় আছে, তিনিই লক্ষ করেছেন যে, ও-নাটকের নায়ক-নায়িকা সকলেই সংস্কৃতে কথা কন না, স্ত্রী-শূদ্রের ও-ভাষায় অধিকার নেইএর কারণ, ও-দেবভাষা আয়ত্ত করতে শাস্ত্রমার্গে ক্লেশ করতে হতসে ক্লেশ যাঁরা করতে নারাজ ছিলেন, তাঁরা সে কালের প্রচলিত মৌখিক ভাষাতেই কথোপকথন করতেনএ কালে স্ত্রী শূদ্ররা যেমন ইংরাজি ভাষায় গুফ্‌তগু না করে দেশভাষাতেই কথাবার্তা কয়তবে এ কালে যেমন জন-কতক বিদুষী মহিলা ইংরাজি ভাষাকে মাতৃভাষা করে তুলেছেন, সে কালেও তেমনই জন-কতক বিদূষী মহিলা সংস্কৃত ভাষাকে সমান কণ্ঠস্থ করেছিলেনবৌদ্ধ পরিব্রাজিকারা রঙ্গমঞ্চে আরোহণ করলে সংস্কৃত ছাড়া আর কিছু বলতেন নামৌখিক ভাষা প্রাকৃত জনের মুখের ভাষা বলে তার নাম হয়েছিল প্রাকৃত
অ ভি ভা ষ ণ
৪র্থ খণ্ড


মাতৃভাষার মাহাত্ম্যের বিষয়ে আপনাদের কাছে বেশি কিছু বলা নিম্প্রয়োজনকারণ, আপনাদের সঙ্গে আমাদের মানসিক ঐক্যের প্রধান বন্ধনই তো এই ভাষার বন্ধনভাষাই হচ্ছে একটি জাতির পরস্পরের মনপ্রাণের অপৌরুষেয় যোগসূত্রআমি অপৌরুষেয় বিশেষণটি ব্যবহার করছি এই কারণে যে, কোন বিশেষ ব্যক্তি কর্তৃক পৃথিবীর কোন ভাষাই সৃষ্ট হয়নি, আমাদের ভাষাও হয়নিএকটা সমগ্র মানব সমাজ যুগ-যুগ ধরে অলক্ষিতে একটা ভাষা গড়ে তোলেসামাজিক মন যে-ভাবে দিনের পর দিন গড়ে উঠেছে, সঙ্গে-সঙ্গে তার ভাষাও তেমনই গড়ে উঠেছেএকটা জাতির মন যে-কারণে যে-উপায়ে সাকার হয়ে উঠেছে, সে জাতির ভাষাও সেই কারণে সেই উপায়ে সাকার হয়ে উঠেছেজাতির মন যখন একটি বিশিষ্ট ও পরিচ্ছিন্ন মূর্তি ধারণ করে, তখনই তা সাহিত্যে বিকশিত হয়সাহিত্যে দীক্ষিত হয়েই ভাষা তার দ্বিজন্ম লাভ করে, অর্থাৎ দ্বিজ হয়সাহিত্যের মূল উপাদান কী? মানুষের আশা, আকাঙক্ষা, আনন্দ, বেদনা, কল্পনা, কামনার চিত্রই তো সাহিত্যযখনই একটি জাতির ভিতর সাহিত্যের দর্শন লাভ করা যায়, তখনই বুঝতে হবে, সে জাতির মন আলোকে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে ও তার অন্তরে আত্মজ্ঞান প্রবুদ্ধ হয়েছেকারণ, সাহিত্য প্রবুদ্ধ জ্ঞানেরই সৃষ্টিমানুষের মন ও ভাষাকে দেশ ও কাল, দু'জনে দু'হাত মিলিয়ে তৈরি করেছেআমরা যদি কোন কারণে দেশের বন্ধন কাটাই, তা হলেও কালের বন্ধন ছিন্ন করতে পারিনেমানুষ উদ্ভিদের মতো জিওগ্রাফির অধীন নয়; তার মন নামক জিনিস আছে বলে সে মুখ্যত হিস্টরির অধীনসে অধীনতা-পাশ সম্পূর্ণ ছিন্ন করলে সে পশুত্ব প্রাপ্ত হয়আমরা যাকে জাতীয়তা বলি, তার মূল ভিত্তি ইতিহাসের গর্ভে নিহিত
অ ভি ভা ষ ণ
৩য় খণ্ড

অবশ্য আজ থেকে বোধ হয় ১০/১২ বৎসর আগে আমি উত্তরবঙ্গ সাহিত্য-সম্মিলনের সভাপতির উচ্চ পদ লাভ করিকিন্তু সে আসন গ্রহণ করে আমি নিজেকে তাদৃশ ধন্য মনে করিনি, আপনাদের আতিথ্য গ্রহণ করে যত দূর করছিকারণ, উত্তরবঙ্গ আমাকে যে এতাদৃশ সম্মানিত করেন, আমার বিশ্বাস, তার ভিতর একটু অসাহিত্যিক কারণ ছিল

উত্তরবঙ্গ হচ্ছে আমার স্বদেশসুতরাং সে সভার কর্মকর্তারা 'দেশকো ভাই' বলে আমার প্রতি একটু পক্ষপাত যে দেখাননি, এমন কথা আমি জোর করে বলতে পারিনেতৎসত্ত্বেও তাঁদের নিমন্ত্রণের ভিতর একটু কিন্তু ছিল

আমাকে তাঁরা আমার অভিভাষণের গায়ে পোষাকি ভাষা পরিয়ে নিযে যেতে অনুরোধ করেনআমি অবশ্য তাতে স্বীকৃত হই এই ভয়ে যে, অসাধু ভাষায় লিখলে উত্তরবঙ্গ পাছে আমার প্রতি অদক্ষিণ হয়ে ওঠেনলোক-লাঞ্ছনা মেরে-কেটে এক রকম সওয়া যায়, কিন্তু ঘরে গুরুগঞ্জনা অসহ্যকাজেই সে অভিভাষণ লিখে আমি নিয়ে যেতে পারিনি, 'তাহা আমাকে লিখিয়া লইয়া যাইতে হইয়াছিল।' ফলে আমার বক্তব্য তাঁদের মনোমতো হয়েছিল কি না, জানিনে, কিন্তু তা তাঁদের কৰ্ণশূল হয়নিসে যা-ই হোক, আপনারা যে আমাকে এখানে ভাষার সাধুবেশ ধারণ করে আসতে আদেশ করেননি, এর জন্য আমি আপনাদের কাছে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছিকারণ, সাহিত্যরাজ্যেও বার-বার বহুরূপী সাজাটা কষ্টকর না হলেও লজ্জাকর
অ ভি ভা ষ ণ
২য় খণ্ড

আমি যে আপনাদের ডাক শুনে এখানে ছুটে এসেছি, সে কেবল বিদেশে বঙ্গসরস্বতীর পূজার নিমন্ত্রণ রক্ষা করবার জন্য এবং তার উৎসবে যোগদান করবার জন্যবাঙ্গালা সাহিত্যের লম্বা ইতিহাস আমাদের পিছনে পড়ে নেই পড়ে আছে আমাদের সুমুখেএ সাহিত্যের স্মৃতিতে মগ্ন থাকার সুযোগ আমাদের নেই, এর ভবিষ্যৎ নিয়েই আমাদের কারবারকারণ, বঙ্গ-সরস্বতীর মন্দির আমাদের নিজ হাতে কায়ক্লেশে গড়ে তুলতে হবে আর তার জন্য চাই বহু শিল্পী এবং এ যুগে বহু স্বেচ্ছাসেবকযেমন পুরাকালের ধর্মমন্দির সব ভক্তের দল গড়ে তুলেছে, এ যুগের সরস্বতীর মন্দিরও তাঁরাই গড়ে তুলবেন, যাঁদের বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রতি পরাপ্রীতি অর্থাৎ অহৈতুকী প্রতি আছেবঙ্গ-সাহিত্যের ভাবী উন্নতি ও ঐশ্বর্যের উজ্জ্বল রূপ আমি কল্পনার চক্ষুতে বরাবরই দেখে আসছিএ মন্দির অবশ্য মেঘরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত নয়এর গোড়াপত্তন বাঙ্গালিরা বঙ্গভাষার জমিতেই করেছেসুতরাং একে সুগঠিত করে তুলবার কোনই অন্তরায় নেই একমাত্র আমাদের ঔদাসীন্য ব্যতীতবহু লোকের মনে যদি এই নবভক্তি স্থান পেয়ে থাকে, তা হলে বঙ্গসাহিত্য যে অচিরে অপূর্ব শ্রী ধারণ করবে, সে বিষয়ে তিল মাত্র সন্দেহ নেইএত দিন আমরা বাঙ্গালাদেশে জন-কতক মিলে এই সাধনায় ব্যাপৃত ছিলুমবাঙ্গালার বাহিরেও যে বঙ্গ-সরস্বতীর এত ভক্ত আছে, দুদিন আগে সে জ্ঞান আমাদের ছিল নাআমার নিজের মনে একটা ধারণা ছিল যে, প্রবাসী বাঙ্গালিরা শুধু দেশ হিসেবে প্রবাসী হননি, মনেও প্রবাসী হয়েছেনএ ধারণার মূলে একটা ছোট্ট ঘটনা আছেকত ছোটখাটো ঘটনার বীজ থেকে কত বড়-বড় ভুল ধারণা আমাদের মনে বদ্ধমূল হয়, তারই পরিচয় দেবার জন্য এই ভুল ধারণার মূলস্বরূপ একটি অকিঞ্চিৎকর ঘটনার উল্লেখ করছি
অ ভি ভা ষ ণ
১ম খণ্ড

চিঠি লিখতে বসলেই, সর্বাগ্রে তার পাঠ লিখতে হয়এ পাঠ অবশ্য নিজে রচনা করতে হয় নাতা পূর্ব থেকেই সমাজ কর্তৃক রচিত হয়ে রয়েছে, সেই বিধিবদ্ধ বাক্যসমূহ আমরা নির্বিচারে মুখস্থ করে পত্রস্থ করিএ পাঠ অবশ্য সকল ভাষায় সকল সমাজে এক নয়দেশভেদে, কালভেদে, সম্প্রদায়ভেদে, পত্রের মুখপত্র নানা আকার নানা রূপ ধারণ করে

কিন্তু এ সকলের বাহ্য আকারে যে-প্রভেদই থাকুক না কেন, সকলেরই বক্তব্য একসকলেরই উদ্দেশ্য লেখকের হীনতা ও দীনতা প্রকাশ করাযিনি যে-ভাষাই ব্যবহার করুন, যতই না কেন শ্রুতিমধুর বাক্য প্রয়োগ করুন, সকল পাঠেরই নির্গলিতাৰ্থ হচ্ছে সবিনয় নিবেদনঅর্থাৎ নিবেদনটা আসে পরে, তার আগে আসে বিনয়,— এই আশায় যে, লেখকের নিবেদনটা যদিও পাঠকের মনঃপূত না হয়, বিনয়টুকু তো হবেইবিনয় ঘুষ দিয়ে পাঠকের মেজাজ খুশ করাই এর ধর্ম

বক্তৃতা অর্থাৎ লোকসমাজে মৌখিক নিবেদনটাও এই একই নিয়মের অধীনসভা মাত্রেই সভাপতির পক্ষে প্রথমেই বিনয় প্রকাশ করাটা একটা অবশ্যকর্তব্যের ভিতর দাঁড়িয়ে গিয়েছে এবং এ কর্তব্য পালন করবার উপযুক্ত বাঁধি গতেরও সৃষ্টি হয়েছে
সমালোচনা

আমরা যারা লিখি, আমরা সকলেই চাই যে আমাদের লেখার অপরে সমালোচনা করুকএর কারণও অতি স্পষ্টলেখক মাত্রেই লেখেন পাঠকের জন্যযদি আমাদের লেখা সম্বন্ধে সকলে নীরব থাকেন তো বুঝতে পারি নে যে, সে লেখা কেউ পড়েছেন কি নাঅপর পক্ষে তার সমালোচনার সাক্ষাৎ পেলেই আমরা এই মনে করে কতকটা স্বস্তি অনুভব করি যে, অন্তত একজন পাঠকও তা পড়েছেন

সমালোচনা মাত্রেই যে স্তুতিবাচক হবে এমন কোন কথা নেই, বরং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তার ঠিক উলটো হয়কিন্তু সত্য কথা বলতে গেলে, তাতে লেখকদের বড় বেশি আসে যায় না

আমরা সকলেই অবশ্য প্রশংসালোভীএবং একজন পাঠকও যদি আমাদের রচনার সুখ্যাতি করেন, তা হলেই আমরা হাতে স্বৰ্গ পাইকিন্তু সমালোচকের মুখে প্রশংসার মতো নিন্দারও একটা বিশেষ মূল্য আছেনিন্দার প্রসাদেও আমাদের লেখা জনসমাজে সুপরিচিত হয়ে উঠেবিজ্ঞাপন হিসেবে কোন বইয়ের নিন্দা ও প্রশংসার মধ্যে কোন্‌টি বেশি মূল্যবান, বলা কঠিনঅনেক সমালোচক-নিন্দিত সাহিত্যও যে সমাজে দিব্যি চলে যায়, তার প্রমাণ দেদার আছেএকখানি সেকেলে কাব্যের নাম করলেই বুঝতে পারবেন যে, আমার কথা ঠিকবিদ্যাসুন্দরকে অনেক দিন থেকেই লোকে অপাঠ্য বলে আসছেঅথচ আমার বিশ্বাস, বিদ্যাসুন্দরের প্রচলন বাঙালি সমাজে মোটেই কম নয়ইংরেজি শিক্ষিত সমাজে ও-কাব্যের নিন্দা তো বহুকালাবধি সকল শিক্ষিত লোকের মুখেই শোনা গিয়েছে, তৎসত্ত্বেও ভারতচন্দ্রকে কবি বলতে আজকের দিনে আমরা ভয় পাইনেযে-কারণে ভারতচন্দ্র নিন্দিত, সে কারণে আজকের দিনে যদি কোন লেখক নিন্দিত হন, তা হলে সে নিন্দা তার পক্ষে একটা মত্ত বিজ্ঞাপন হবে
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট গদ্য সাহিত্যের সমালোচনার ভার আমার হস্তে ন্যস্ত করায় আপনি একটু অন্যমনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবেন যে রবীন্দ্রনাথের উপযুক্ত সমালোচক বাঙলাদেশে আর যিনিই ইউন, বীরবল কখনও হতে পারেন না।

প্রথমেই একটি অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে নিই। যে-ভাষায় আমি লিখি, অনেকে তার নাম দিয়েছেন বীরবলী ভাষা। বলা বাহুল্য, কিন্তু বলা আবশ্যক যে 'বীরবলী ভাষা' নামক কোন সৃষ্টিছাড়া ভাষা নেই। যে-ভাষায় আর-পাঁচ জন লেখেন, সেই ভাষাতেই আমি লিখি, এবং সে ভাষার নাম হচ্ছে বাঙলা ভাষা। অবশ্য আমার ভাষার সঙ্গে অপরের ভাষার অল্পবিস্তর প্রভেদ আছে। সে কারণ যদি আমার ভাষার পৃথক নামকরণ করতে হয়, তা হলে কোন ভাষাকেই আর বাঙলা ভাষা বলা চলে না। লেখার কথা ছেড়ে দিন, যদি মন দিয়ে পাঁচ জন বাঙালির মুখের কথা শোনেন, তা হলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে এক জন বাঙালির মুখের ভাষা আর-এক জন বাঙালির মুখের ভাষা যমজ নয়। তা সত্ত্বেও বাঙলা ভাষা বলে একটা ভাষা আছে, যেমন দুটি বাঙালির চেহারা ঠিক এক নয়, তা সত্ত্বেও বাঙালি জাতি বলে একটা জাতি আছে।

কেন যে আমার ভাষাকে লোকে বীরবলী ভাষা বলে, তা আমি সম্পূর্ণ জানি। পৃথিবীতে এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা একটা নাম না পেলে কোন জিনিসই বুঝতে পারে না। বোঝা তো মাথায় থাক, চিনতেও পারে না। এই শ্রেণীর লোকেরাই সব নতুন জিনিসের নূতন নামকরণ করতে সদাই ব্যস্ত। আর এই নামকরণের ব্যবসা যে সমাজে চলে, তার কারণ ছোট ছেলেরা যেমন চুষিকাঠি পেলে খুশি হয়, লোকসমাজও তেমনি 'নাম' পেলেই খুশি হয়। ঐ নাম চুষেই তারা সাহিত্যরস আস্বাদন করে। ইতিহাসের কাছে জানা যায় যে, কালের গতিকে মানুষের আর যে-ব্যবসাই থাক আর যাক, খেলনার ব্যবসা কখনও যায়নি ও কখনও যাবে না। যা চিরকাল আছে, তা নিশ্চয়ই চিরকাল থাকবে। কাশীর বৌদ্ধধর্ম গত হয়েছে, কিন্তু কাশীর খেলনা আজও বাজারে সমান কাটছে।