সমালোচনা
আমরা যারা লিখি, আমরা সকলেই
চাই যে আমাদের লেখার অপরে সমালোচনা করুক। এর কারণও অতি স্পষ্ট। লেখক মাত্রেই লেখেন পাঠকের জন্য। যদি আমাদের লেখা সম্বন্ধে সকলে নীরব থাকেন
তো বুঝতে পারি নে যে, সে লেখা কেউ পড়েছেন কি না। অপর পক্ষে তার সমালোচনার
সাক্ষাৎ পেলেই আমরা এই মনে করে কতকটা স্বস্তি অনুভব করি যে, অন্তত একজন পাঠকও তা পড়েছেন।
সমালোচনা মাত্রেই যে স্তুতিবাচক হবে এমন কোন কথা নেই,
বরং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তার ঠিক উলটো হয়। কিন্তু সত্য কথা বলতে
গেলে, তাতে লেখকদের বড় বেশি আসে যায় না।
আমরা সকলেই অবশ্য প্রশংসালোভী। এবং একজন পাঠকও যদি
আমাদের রচনার সুখ্যাতি করেন, তা হলেই আমরা হাতে
স্বৰ্গ পাই। কিন্তু সমালোচকের মুখে প্রশংসার মতো নিন্দারও একটা বিশেষ মূল্য আছে। নিন্দার প্রসাদেও আমাদের
লেখা জনসমাজে সুপরিচিত হয়ে উঠে। বিজ্ঞাপন হিসেবে কোন বইয়ের নিন্দা ও প্রশংসার মধ্যে কোন্টি বেশি
মূল্যবান, বলা কঠিন। অনেক সমালোচক-নিন্দিত সাহিত্যও যে সমাজে দিব্যি
চলে যায়, তার প্রমাণ দেদার আছে। একখানি সেকেলে কাব্যের
নাম করলেই বুঝতে পারবেন যে, আমার কথা ঠিক। বিদ্যাসুন্দরকে অনেক
দিন থেকেই লোকে অপাঠ্য বলে আসছে। অথচ আমার বিশ্বাস, বিদ্যাসুন্দরের
প্রচলন বাঙালি সমাজে মোটেই কম নয়। ইংরেজি শিক্ষিত সমাজে ও-কাব্যের নিন্দা তো বহুকালাবধি সকল শিক্ষিত
লোকের মুখেই শোনা গিয়েছে, তৎসত্ত্বেও ভারতচন্দ্রকে
কবি বলতে আজকের দিনে আমরা ভয় পাইনে। যে-কারণে ভারতচন্দ্র নিন্দিত, সে কারণে আজকের দিনে যদি কোন লেখক নিন্দিত হন, তা হলে সে নিন্দা তার পক্ষে একটা মত্ত বিজ্ঞাপন হবে।
সে যা-ই হোক, এ কথা নির্ভুল যে, আমরা লেখকরা চাই সমালোচকদের
কাছ থেকে নিন্দা নয়— প্রশংসা। এ আমাদের জাতিধর্ম। লেখকেরা আবহমান কাল প্রশংসার ভিখারি ছিলেন,
আজও আছেন। ‘গুণী গুণং বেত্তি’,
‘মধুমিচ্ছন্তি ষট্পদা', এ সকল সংস্কৃত বচন লেখকদের হাত থেকে বেরিয়েছে, সমালোচকদের
হাত থেকে নয়।
সাহিত্যিকদের এ প্রবৃত্তির সঙ্গে ঝগড়া করে কোন ফল নেই। এ প্রবৃত্তিকে দুর্বলতা বললেও সে দুর্বলতা
আমরা ত্যাগ করতে পারব না, আর যিনি পারেন তাঁর পত্রপাঠ সমালোচকদের দলে গিয়ে ভর্তি হওয়া
উচিত।
কে না জানে যে বাহবা
না পেলে গাইয়ে-বাজিয়েরা আসর জমাতে পারে না। এবং যে-শ্রোতা যত বেশি বার 'কিয়াবাৎ' 'কিয়াবাৎ' বলে, ওস্তাদেরা তাকেই তত বড় সমঝদার বলে মেনে নেন। এর কারণও স্পষ্টই। সাহিত্যের ফুল অনুকুল
জলবায়ু না পেলে স্ব-রূপে ফুটে উঠতে পারে না। এই প্রশংসা জিনিসটে হচ্চে সাহিত্যের শ্ৰীবৃদ্ধির
একটি প্রধান সহায়। কাব্যের রস উপভোগ করবার অক্ষমতা সমালোচকদের একটা ক্ষমতার মধ্যে গণ্য নয়।
ইংলন্ডের সর্বাগগণ্য
মনীষী Bertrand Russell তাঁর শিক্ষা সম্বন্ধে নতুন বইয়ে লিখেছেন যে— “Praise is less harmful. But it
should not be given so easily as to lose its value, nor should it be used to
over-stimulate a child.”
উপরোক্ত child কথা থেকেই বুঝতে পারছেন যে,
এ হচ্চে শিশুশিক্ষার ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা সাহিত্যিকরা উকিল-মোক্তার-পলিটিসিয়ান-দোকানদারদের মতে কি সব শিশু নই? অন্তত সমাজ
উপরিউক্ত সেয়ানাদের তুলনায় আমাদের কি ছেলেমানুষ হিসেবে দেখেন না? অতএব Russell-এর মতানুসরণ করে সমালোচকদের আমাদের প্রশংসা করাই কর্তব্য।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমালোচকদের একটু বিপদ আছে। তাঁরা যদি রামের প্রশংসা
করেন তো শ্যাম মনঃক্ষুন্ন হবে এবং এ অবস্থায় শ্যামচন্দ্রকে কিছুতেই বোঝানো যাবে না
যে, রামচন্দ্রের প্রশংসার অর্থ শ্যামচন্দ্রের নিন্দা নয়। একটি উদাহরণের সাহায্যে কথাটা আর একটু পরিষ্কার
করছি। গত মাসের কল্লোল-এ
শ্রীযুক্ত ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তিনখানি বইয়ের গুণ গেয়েছেন। তার মধ্যে একখানি হচ্ছে
'গড্ডলিকা'। কিছু দিন পূর্বে আমিও এ বইয়ের মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেছি। আমার যত দূর মনে পড়ে, ঐ প্রশংসাসূত্রে এক
জায়গায় বলেছিলাম যে, বঙ্গসাহিত্যে এর তুলনা নেই। এই কথা শুনে বীরবল যদি ব্যাজার হতেন তো ভেবে
দেখুন, কী মুশকিলেই পড়তুম। তখন তাঁকে গিয়ে বলতে হত যে, 'গডডলিকার হাস্যরস আর তোমার হাস্যরস এক জাতীয়
নয়।' এ কথা শুনে তিনি যদি প্রশ্ন করতেন যে, ও-দুয়ের প্রভেদটা
কী? তা হলে উত্তরে আলঙ্কারিকদের এই বচন আওড়াতে বাধ্য হতুম—
ইক্ষুক্ষীর গুড়াদীনাং মাধুৰ্য স্যান্তরং মহৎ ।
তথাপি ন তদাখ্যাতুঃ সরস্বতাপি শক্যতে ।।
বীরবলের উদাহরণ দিচ্ছি এই কারণে যে, তিনি আমার ঘরের লোক, সুতরাং তাঁর নাম করায়
আমার বিশেষ কোন ভয়ের কারণ নেই। কিন্তু বীরবল না হয়ে যদি কোন নির্বল রসিক আমার উপর নারাজ হতেন, সেটা অবশ্য নিতান্ত আক্ষেপের কারণ হত। শ্ৰীযুক্ত ধূর্জটিপ্রসাদের সমালোচনার উপর
আপনারা যে মন্তব্য প্রকাশ করেছেন, তা-ই পড়েই আমার মনে
এই কথা উদয় হয়েছে যে, সমালোচকের পক্ষে এ
যুগে কারও প্রশংসা করা তার নিন্দা করার চাইতেও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। এ যুগ তো আর বঙ্গদর্শন-এর
যুগ নয়, যখন বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্যের রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হয়ে লেখকদের
সরাসরি বিচার করতেন ও খুশিমতো তাদের তিরস্কৃত ও পুরস্কৃত করতেন ও পাঠকসমাজ তার কথাই
বেদবাক্য বলে মেনে নিত। এ যুগ যে সাহিত্যেরও ডিমোক্রাটিক যুগ। আপনারা জানিয়ে রেখেছেন যে, শ্ৰীযুক্ত ধূর্জটিপ্রসাদের
প্রবন্ধের সপক্ষে-বিপক্ষে কোন কথাই আপনারা প্রকাশ করবেন না। তবুও আমি যে এ বিষয়ে দু-চার কথা বলছি, তার কারণ উক্ত প্রবন্ধ আমার আলোচ্য বিষয় নয়, শুধু আলোচনার উপলক্ষ্য মাত্র। কোন সমালোচকের কোন মতামতের প্রতিবাদ কিম্বা
সমর্থন করবার দিন এখন চলে গিয়েছে। কেননা এ যুগে সাহিত্য সম্বন্ধে শুধু ব্যক্তিগত মতামতেরই অর্থ
ও সার্থকতা আছে।
এ যুগে নিজের মন ছাড়া অপর কোন রকম কষ্টিপাথর লোকের হাতে নেই, যার সাহায্যে সে সাহিত্যের দর কষে দেবে। ইংরেজিতে যাকে বলে
cannons
of critricism— এ যুগে সে সব বিলকুল বাতিল হয়ে গিয়েছে। অলঙ্কারশাস্ত্রের বিধি
অনুসরণ করে কেউ কস্মিন কালেও কাব্যরচনা করতে পারেননি এবং সেকালেও কবিরা সে শাস্ত্রের
নিষেধও পদে-পদে লঙ্ঘন করতে বাধ্য হয়েছেন। সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্রে কাব্যদেহের দোষের একটা লম্বা ফর্দ আছে, অথচ আলঙ্কারিকরাই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, দোষ হয়ে গুণ হল কবির বিদ্যায়। 'দৈব বিধান' যে 'শাস্ত্রবিধানে'র চাইতে প্রবল, এ কথাও তাঁরা স্পষ্টাক্ষরে বলে গিয়েছেন।
এ যুগে আমরা এ ক্ষেত্রে কোন রূপ শাস্ত্রবিধান গ্রাহ্য করতে পারিনে, ফলে উক্ত বিধান অনুসারে এ কাব্য, ও নয়, এমন কথাও বলতে অধিকারী
নই। কারণ দেখতে পাওয়া
যায় যে, নিত্য নতুন সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে যা কোন পুরনো নিয়মের অধীন
নয়। ফলে সাহিত্য-সমালোচনার
জন্য সমালোচকেরা নিজের রুচির উপরই নির্ভর করতে বাধ্য। এক হিসেবে এটি দুঃখের বিষয়, কারণ প্রতি ব্যক্তি যদি কেবলমাত্র নিজের রুচির উপর নির্ভর করেন, তা হলে সামাজিক রুচি বলে কোন জিনিস জন্মাতে পারে না— ফলে এ ক্ষেত্রে যা জন্মায়, তারা নাম critical anarchism। কিন্তু তা সত্ত্বেও
এ যুগে সমালোচকদের মেনে নিতে হবে যে, সমালোচনা করার অর্থ
হচ্ছে আত্মপ্রকাশ করা। এতে যিনি ভয় পান, তাঁর পক্ষে সমালোচনা ত্যাগ করাই কর্তব্য। লেখকদলকে
লালন-পালন শাসন-সংরক্ষণ করবার দায়িত্ব এ যুগের সমালোচকদের নেই।
সূত্র : প্রমথ চৌধুরী || অগ্রন্থিত রচনা - ১
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ওয়েবে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।