:::: সূচীপত্র ::::
গ্রীষ্মের সুর

                            হায়!
                        বসন্ত ফুরায়!
                  মুগ্ধ মধু মাধবের গান
            ফল্গু সম লুপ্ত আজি, মুহ্যমান প্রাণ
      অশোক নির্ম্মাল্য-শেষ, চম্পা আজি পাণ্ডু হাসি হাসে,
ক্লান্ত কণ্ঠে কোকিলের যেন মুহুর্মুহু কুহুধ্বনি নিবে নিবে আসে!
দিবসের হৈম জ্বালা দীপ্ত দিকে দিকে, উজ্জ্বল-জাজ্জ্বল-অনিমিখ্‌,
      নিঃশ্বসিছে নিঃস্ব হাওয়া, হুতাশে মূর্চ্ছিত দশদিক্!
            রৌদ্র আজি রুদ্র ছবি, আকাশ পিঙ্গল,
                  ফুকারিছে চাতক বিহ্বল,—
                        খিন্ন পিপাসায়;
                             হায়!


                         হায়!
                      আনন্দ ধরায়
               নাহি আজ আনন্দের লেশ,
          চতুর্দ্দিকে ক্রুদ্ধ আঁখি, চারিদিকে ক্লেশ!
      সংবর ও মূর্ত্তি, ওগো একচক্র-রথের ঠাকুর!
অগ্নি-চক্ষু অশ্ব তব মূর্চ্ছি বুঝি পড়ে,—আর সে ছুটাবে কত দূর?
  সপ্ত সাগরের বারি সপ্ত অশ্বে তব করিছে শোষণ তৃষ্ণাভরে,
      তবু নাহি তৃপ্তি মানে, পিয়ে নদ, নদী, সরোবরে ;—
           পঙ্কিল পল্বলে পিয়ে গোষ্পদে ও কূপে,
                 পুষ্পে রসতাও পিয়ে চুপে!
                        তৃপ্তি নাহি পায়!
                              হায়!

                              হায়!
                        সান্ত্বনা কোথায়?
                  রৌদ্রের সে রুদ্র আলিঙ্গনে
             জগতের ধাত্রী ছায়া আছে উষ্মা-মনে;
          আশাহত ক্ষুব্ধ লোক,—আকাশের পানে শুধু চায়,
      ময়ূরের বর্হ সম ময়ূখের মালা বহ্নিতেজে চৌদিকে বিছায়!
হর্ম্ম্যতলে, জলে, স্থলে, স্নিগ্ধ পুষ্পদলে আজ শুধু অগ্নি-কণা ক্ষরে,
        হাতে মাথে ধুনী জ্বালি বসুন্ধরা কৃচ্ছ্র ব্রত করে;
            ওঠে না অনিন্দ্য চরু অমোঘ প্রসাদ,—
                  দেবতার মূর্ত্ত আশীর্ব্বাদ,—
                        দীর্ঘ দিন যায়,
                             হায়!

                         হায়!
                      হৃদয় শুকায়!
                 নাহি বল, নাহিক সম্বল,
             অন্তরে আনন্দ নাই, চক্ষে নাহি জল!
        মূক হয়ে আছে মন, দীর্ঘশ্বাসে অবসান গান,
  বিস্মৃত সুখের সাধ হৃদি অনুৎসুক,—ধুক্‌ ধুক্ করে শুধু প্রাণ
কে করিবে অনুযোগ? দেবতার কোপ; কোথা বা করিবে অনুযোগ?
      চারিদিকে নিরুৎসাহ, চারিদিকে নিঃস্ব নিরুদ্‌যোগ!
          নাহি বাষ্প-বিন্দু নভে,—বরষা সুদূর;
                দগ্ধ দেশ তৃষ্ণায় আতুর,
                      ক্লান্ত চোখে চায়;
                          হায়!


কুহু ও কেকা — সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত [চতুর্থ সংস্করণ/১৯২৯]