যক্ষের নিবেদন
পিঙ্গল বিহ্বল্ ব্যথিত নভতল্, কই গো কই মেঘ উদয় হও,
সন্ধ্যার তন্দ্রার মূরতি ধরি' আজ মন্দ্র-মন্থর বচন কও;
সূর্য্যের রক্তিম নয়নে তুমি মেঘ ! দাও হে
কজ্জল পাড়াও ঘুম,
বৃষ্টির চুম্বন বিথারি' চলে যাও—অঙ্গে হর্ষের পড়ুক
ধুম।
বৃক্ষের গর্ভেই রয়েছে আজো যেই—আজ নিবাস যার গোপনলোক
সেই সব পল্লব সহসা ফুটিবার হৃষ্ট চেষ্টায়
কুসুম হোক্।
গ্রীষ্মের হোক্ শেষ, ভরিয়া সানুদেশ স্নিগ্ধ গম্ভীর উঠুক্ তান,
যক্ষের দুঃখের কর হে অবসান, যক্ষ-কান্তার জুড়াও প্রাণ !
শৈলের পইঠায় দাঁড়ায়ে আজি হায় প্রাণ উধাও
ধায় প্রিয়ার পাশ,
মূর্চ্ছার মন্তর ভরিছে চরাচর, ছায় নিখিল কার আকুল শ্বাস!
ভরপুর অশ্রুর বেদনা-ভারাতুর মৌন কোন্ সুর
বাজায়ে মন,
বক্ষের পঞ্জর কাঁপিছে কলেবর, চক্ষে দুঃখের নীলাঞ্জন!
রাত্রির উৎসব জাগালে দিবসেই, তাই সে তন্দ্রায় ভুবন ছায়,
রাত্রির গুণ সব দিনেরে দিলে দান, তাই সে বিচ্ছেদ দ্বিগুণ, হায়;
ইন্দ্রের দক্ষিণ বাহু সে তুমি দেব! পূজ্য !
লও মোর পূজার ফুল,
পুষ্কর বংশের চূড়া যে তুমি মেঘ ! বন্ধু ! দৈবের ঘুচাও
ভুল !
নিষ্ঠুর যক্ষেশ, নাহিক কৃপালেশ, রাজ্যে আর তাঁর বিচার নেই,
আজ্ঞার লঙ্ঘন করিল একে, আর শাস্তি ভুঞ্জান্ দুজনকেই !
হায় মোর কান্তার না ছিল অপরাধ, মিথ্যা সয় সেই কতই ক্লেশ,
দুর্ভর বিচ্ছেদ অবলা বুকে বয়, পাংশু কুন্তল, মলিন বেশ !
বন্ধুর মুখ চাও, সখা হে সেথা যাও, দুঃখ দুস্তর তরাও ভাই,
কল্যাণ-সংবাদ কহিয়ো কানে তার, হায়, বিলম্বের সময় নাই;
বৃন্তের বন্ধন আশাতে বাঁচে মন, হায় গো, বল্ তার কতই আর?
বিচ্ছেদ-গ্রীষ্মের তাপেতে সে শুকায়,
যাও হে দাও তায় সলিল্-ধার।
নির্ম্মল হোক্ পথ,—শুভ ও নিরাপদ, দূর-সুদুর্গম
নিকট হোক্,
হ্রদ, নদ, নির্ঝর, নগরী মনোহর, সৌধ সুন্দর জুড়াক্ চোক্;
চঞ্চল খঞ্জন্-নয়না নারীগণ বর্ষা-মঙ্গল করুক্
গান,
বর্ষার সৌরভ, বলাকা-কলরব, নিত্য উৎসব ভরুক্ প্রাণ !
পুষ্পের তৃষ্ণায় করহে অবসান, হোক্ বিনিঃশেষ যূথীর ক্লেশ,
বর্ষায়, হায় মেঘ ! প্রবাসে নাই সুখ, —হায় গো নাই নাই সুখের
লেশ;
যাও ভাই একবার মুছাতে আঁখি তার, প্রাণ বাঁচাও মেঘ ! সদয় হও,
"বিদ্যুৎ-বিচ্ছেদ জীবনে না ঘটুক্" বন্ধু ! বন্ধুর আশিষ লও।
সূত্র : কুহু ও কেকা — সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত [চতুর্থ সংস্করণ/১৯২৯]