:::: সূচীপত্র ::::
মাইকেল মধুসূদন দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মাইকেল মধুসূদন দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অসম্পূর্ণ দ্বিতীয় সর্গ
[ বিহার ]


সাজ, সাজ ব্রজাঙ্গনে, রঙ্গে ত্বরা করি
মণি, মুক্ত পর কেশে,
মেখলা লো কটিদেশে,
বাধঁ লো নুপুর পায়ে, কুমুমে কবরী
লেপ সুচন্দন দেহে,
কি সাধে রহিবে গেহে ?
ওই শুন, পুনঃ পুনঃ বাজিছে বাঁশরী

নাচিছে লো নিতস্বিনি, কদম্বের তলে
শিখগু-মণ্ডিত-শির,
ধীরে ধীরে শ্যাম ধীর,
দুলিছে লো, বরগুঞ্জমালা বর-গলে
মেঘ সনে সৌদামিনী
সম রূপে, লো কামিনি,
ঝলে পীতধড়া-রূপে ঝল ঝল ঝলে ।
১৮
বসন্তে

১ 
সখি রে,—
বন অতি রমিত হইল ফুল ফুটনে !
পিককুল কলকল, চঞ্চল অলিদল
উছলে সুরবে জল,
চল লো বনে !
চল লো, জুড়াব অাঁখি দেখি ব্রজরমণে !
১৭
বসন্তে

ফুটিল বকুলকুল কেন লো গোকুলে আজি,
              কহ তা, স্বজনি ?
আইলা কি ঋতুরাজ ?     ধরিলা কি ফুলসাজ,
              বিলাসে ধরণী ?
মুছিয়া নয়ন-জল,          চল লো সকলে চল,
      শুনিব তমাল তলে বেণুর সুরব ;—
      আইল বসন্ত যদি, আসিবে মাধব !

১৬
সখী

      কি কহিলি কহ, সই, শুনি লো আবার—
                   মধুর বচন !
সহসা হইনু কালা;        জুড়া এ প্রাণের জ্বালা,
    আর কি এ পোড়। প্রাণ পাবে সে রতন ?
হ্যাদে তোর পায় ধরি, কহ না লো সত্য করি,
    আসিবে কি ব্রজে পুনঃ রাধিকারমণ ?


   কহ, সখি, ফুটিবে কি এ মরুভূমিতে
                   কুমুমকানন ?
জলহীনা স্রোতস্বতী,        হবে কি লো জলবতী,
পয়ঃ৪৭ সহ পয়োদে৪৮ কি বহিবে পবন ?
হ্যাদে তোর পায় ধরি, কহ না লো সত্য করি,
    আসিবে কি ব্রজে পুনঃ রাধিকারঞ্জন ?
১৫
নিকুঞ্জবন

যমুনা পুলিনে আমি ভ্ৰমি একাকিনী,
           হে নিকুঞ্জবন,
না পাইয়া ব্রজেশ্বরে,      আইনু হেথা সত্বরে,
    হে সখে, দেখাও মোরে ব্রজের রঞ্জন !
সুধাংশু সুধার হেতু,       বাঁধিয়া আশার সেতু,
   কুমুদীর মনঃ যথা উঠে গো গগনে,
হেরিতে মুরলীধর রূপে যিনি শশধর
   আসিয়াছি আমি দাসী তোমার সদনে
তুমি হে অম্বর, কুঞ্জবর, তব চাঁদ নন্দের নন্দন !
১৪
কৃষ্ণচূড়া

   এই যে কুসুম শিরো পরে, পরেছি যতনে,
   মম শ্যাম-চূড়া-রূপ ধরে এ ফুল রতনে !
বসুধা নিজ কুন্তলে       পরেছিল কুতুহলে
              এ উজ্জ্বল মণি,
রাগে তারে গালি দিয়া, লয়েছি আমি কাড়িয়া
মোর কৃষ্ণ-চূড়া কেনে পরিবে ধরণী?
১৩
সারিকা

ওই যে পাখিটি, সখি, দেখিছ পিঞ্জরে রে,
         সতত চঞ্চল,—
কভু কাঁদে, কভু গায়, যেন পাগলিনী-প্রায়,
    জলে যথা জ্যোতিবিম্বতেমতি তরল !
    কি ভাবে ভাবিনী যদি বুঝিতে, স্বজনি,
    পিঞ্জর ভাঙিয়া ওরে ছাড়িতে অমনি !


নিজে যে দুঃখিনী,    পরদুঃখ বুঝে সেই রে,
         কহিনু তোমারে ;
জি ও পাখীর মনঃ বুঝি আমি বিলক্ষণ
   আমিও বন্দী লো আজি ব্রজ-কারাগারে !
   সারিকা অধীর ভাবি কুসুম-কানন,
   রাধিকা অধীর ভাবি রাধা-বিনোদন !
১২
গোবৰ্দ্ধন গিরি

নমি আমি, শৈলরাজ, তোমার চরণে
রাধা এ দাসীর নামগোকুল গোপিনী ;
কেনে যে এসেছি আমি তোমার সদনে
শরমে মরমকথা কহিব কেমনে,
আমি, দেব, কুলের কামিনী !
কিন্তু দিবা অবসানে, হেরি তীরে কে না জানে,
নলিনী মলিনী ধনী কাহার বিহনে
কাহার বিরহানল তাপে তাপিত সে সরঃ
সুশোভিনী৩৭ ?

হে গিরি, যে বংশীধর ব্রজ-দিবাকর,
ত্যজি আজি ব্ৰজধাম গিয়াছেন তিনি ;
নলিনী নহে গো দাসী রূপে, শৈলেশ্বর,
তবুও নলিনী যথা ভজে প্রভাকর,
ভজে শ্যামে রাধা অভাগিনী !
হারায়ে এ হেন ধনে,      অধীর হইয়া মনে,
এসেছি তব চরণে কাঁদিতে, ভূধর,
কোথা মম শ্যাম গুণমণি ? মণিহারা
আমি গো ফণিনী !
১১
গোধূলি

কোথা রে রাখাল-চূড়ামণি ?
গোকুলের গাভীকুল, দেখ, সখি, শোকাকুল,
না শুনে সে মুরলীর ধ্বনি !
ধীরে ধীরে গোষ্ঠে সবে পশিছে নীরব,—
আইল গোধুলি, কোথা রহিল মাধব !

আইল লো তিমির যামিনী ;
তরুডালে চক্রবাকী বসিয়া কাঁদে একাকী
কাঁদে যথা রাধা বিরহিণী !
কিন্তু নিশা অবসানে হাসিবে সুন্দরী ;
আর কি পোহাবে কভু মোর বিভাবরী৩০ ?
মলয় মারুত

শুনেছি মলয় গিরি তোমার আলয়
          মলয় পবন !
বিহঙ্গিনীগণ তথা     গায়ে বিদ্যাধরী যথা,
সঙ্গীত সুধায় পূরে নন্দন কানন ;
কুসুমকুলকামিনী,     কোমলা কমলা জিনি,
সেবে তোমা, রতি যথা সেবেন মদন!

হায়, কেনে ব্রজে আজি ভ্ৰমিছ হে তুমি
     মন্দ সমীরণ ?
যাও সরসীর কোলে, দোলাও মৃদু হিল্লোলে
    সুপ্রফুল্ল নলিনীরেপ্রেমানন্দ মন !
ব্ৰজ-প্রভাকর যিনি,   ব্ৰজ আজি ত্যজি তিনি,
    বিরাজেন অস্তাচলেনন্দের নন্দন!
কুসুম


কেনে এত ফুল তুলিলি, স্বজনি
           ভরিয়া ডালা ?
মেঘাবৃত হলে, পরে কি রজনী
           তারার মালা ?
আর কি যতনে, কুসুম রতনে
           ব্রজের বালা ?

আর কি পরিবে           কভু ফুলহার
           ব্ৰজকামিনী ?
কেনে লো হরিলি          ভূষণ লতার
           বনশোভিনী ?
অলি বঁধু তার ;           কে আছে রাধার
           হতভাগিনী ?

উষা

কনক উদয়াচলে তুমি দেখা দিলে,
হে সুর-সুন্দরি !
কুমুদ মুদয়ে আঁখি, কিন্তু সুখে গায় পাখী,
গুঞ্জরি নিকুঞ্জে ভ্ৰমে ভ্রমর ভ্রমরী ;
বরসরোজিনী২৩ ধনী, তুমি হে তার স্বজনী,
নিত্য তার প্রাণনাথে আন সাথে করি !

তুমি দেখাইলে পথ যায় চক্রবাকী
যথা প্রাণপতি !
ব্ৰজাঙ্গনে দয়া করি, লয়ে চল যথা হরি,
পথ দেখাইয়া তারে দেহ শীঘ্ৰগতি !
কাঁদিয়া কাঁদিয়া আঁধা,২৪ আজি গো শ্যামের রাধা
ঘুচাও আঁধার তার, হৈমবতি সতি !
প্রতিধ্বনি

কে তুমি, শ্যামেরে ডাক রাধা যথা ডাকে
               হাহাকার রবে ?
কে তুমি, কোন্‌ যুবতী, ডাক এ বিরলে, সতি,
অনাথা রাধিকা যথা ডাকে গো মাধবে ?
অভয় হৃদয়ে তুমি কহ অসি মোরে
কে না বাঁধা এ জগতে শ্যাম-প্রেম-ডোরে !

কুমুদিনী কায়, মনঃ সঁপে শশধরে
              ভুবনমোহন !
চকোরি শশীর পাশে, আসে সদা সুধা আশে,
নিশি হাসি বিহারয়ে লয়ে সে রতন ;
এ সকলে দেখিয়া কি কোপে কুমুদিনী ?
স্বজনী উভয় তারচকোরী, যামিনী !

পৃথিবী

হে বসুধে, জগৎজননি।
দয়াবতী তুমি, সতি, বিদিত ভুবনে।
যবে দশানন অরি,
বিসর্জ্জিলা হুতাশনে জানকী সুন্দরী,
তুমি গো রাখিলা বরাননে।
তুমি, ধনি, দ্বিধা হয়ে, বৈদেহীরে কোলে লয়ে,
জুড়ালে তাহার জ্বালা বা বাসুকি-রমণি!

হে বসুধে, রাধা বিরহিণী।
তার প্রতি আজি তুমি বাম কি কারণে ?
শ্যামের বিরহানলে, সুভগে, অভাগা জ্বলে,
তারে যে কর না তুমি মনে ?
পুড়িছে অৰলা বালা, কে সম্বরে তার জ্বালা,
হায়, এ কি রীতি ভব, হে ঋতু কামিনি।
ময়ূরী

 
           তরুশাখা উপরে, শিখিনি,
       কেনে লো বসিয়া তুই বিরস বদনে ?
না হেরিয়া শ্যামচাঁদে, তোরও কি পরাণ কাঁদে,
           তুইও কি দুঃখিনী !
       আহা ! কে না ভালবাসে রাধিকারমণে ?
       কার না জুড়ায় আঁধি শশী, বিহঙ্গিনি ?
যমুনাতটে (২)

কি আশ্চৰ্য্য ! এত করে করিনু মিনতি,
তবু কি আমার কথা শুনিলে না, ধনি ?
এ সকল দেখে শুনে, রাধার কপাল-গুণে,
তুমিও কি ঘৃণিলা গো রাধায়, স্বজনি ?
এই কি উচিত তব, ওহে স্রোতস্বতি ?

হায় রে তোমারে কেন দোষি, ভাগ্যবতি ?
ভিখারিণী রাধা এবেতুমি রাজরাণী।
হরপ্রিয়া মন্দাকিনী,১৮ সুভগে, তব সঙ্গিনী,
অর্পেণ সাগর-করে তিনি তব পাণি ! ১৯
সাগর-বাসরে তব তাঁর সহ গতি !
যমুনাতটে

মৃদু কলরবে তুমি, ওহে শৈবলিনি,১২
কি কহিছ ভাল করে কহ না আমারে।
সাগর-বিরহে যদি, প্রাণ তব কাঁদে, নদি,
তোমার মনের কথা কহ রাধিকারে
তুমি কি জান না, ধনি, সেও বিরহিণী ?

জলধর-২

8
হায় রে কোথায় আজি শ্যাম জলধর
      তব প্রিয় সৌদামিনী,
            কাঁদে নাথ একাকিনী
রাধারে ভুলিলে কি হে রাধামনোহর ?
      রত্মচূড়া শিরে পরি
            এস বিশ্ব আলো করি,
কনক উদয়াচলে যথা দিনকর।

জলধর - ১

চেয়ে দেখ, প্রিয়সখি, কি শোভা গগনে !
      সুগন্ধ-বহ-বাহন,
            সৌদামিনী সহ ঘন
ভ্ৰমিতেছে মন্দগতি প্রেমানন্দ মনে !
      ইন্দ্র-চাপ রূপ ধরি,
            মেঘরাজ ধ্বজোপরি,
শোভিতেছে কামকেতু খচিত রতনে !


বংশী-ধ্বনি - ২

8
ফুটিছে কুসুমকুল
মঞ্জু কুঞ্জবনে, রে,
যথা গুণমণি !
পাতে লো ধরণী !
কি লজ্জা ! হা ধিক্‌ তারে,
ছয় ঋতু বরে যারে,
আমার প্রাণের ধন লোভে সে রমণী ?
চল, সখি, শীঘ্ৰ যাই,
পাছে মাধবে হারাই,—
মণিহারা ফণিনী কি বাঁচে লো স্বজনি ?