অ ভি ভা ষ ণ
৩
আমি যে আপনাদের ডাক শুনে এখানে ছুটে এসেছি, সে কেবল
বিদেশে বঙ্গসরস্বতীর পূজার নিমন্ত্রণ রক্ষা করবার জন্য এবং তার উৎসবে যোগদান করবার
জন্য। বাঙ্গালা সাহিত্যের লম্বা ইতিহাস আমাদের পিছনে পড়ে নেই— পড়ে আছে আমাদের সুমুখে। এ সাহিত্যের স্মৃতিতে
মগ্ন থাকার সুযোগ আমাদের নেই,
এর ভবিষ্যৎ নিয়েই আমাদের কারবার। কারণ, বঙ্গ-সরস্বতীর
মন্দির আমাদের নিজ হাতে কায়ক্লেশে গড়ে তুলতে হবে— আর তার জন্য
চাই বহু শিল্পী এবং এ যুগে বহু স্বেচ্ছাসেবক। যেমন পুরাকালের ধর্মমন্দির
সব ভক্তের দল গড়ে তুলেছে, এ যুগের সরস্বতীর মন্দিরও তাঁরাই গড়ে তুলবেন, যাঁদের বাঙ্গালা
ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রতি পরাপ্রীতি অর্থাৎ অহৈতুকী প্রতি আছে। বঙ্গ-সাহিত্যের ভাবী
উন্নতি ও ঐশ্বর্যের উজ্জ্বল রূপ আমি কল্পনার চক্ষুতে বরাবরই দেখে আসছি। এ মন্দির অবশ্য মেঘরাজ্যে
প্রতিষ্ঠিত নয়। এর গোড়াপত্তন বাঙ্গালিরা বঙ্গভাষার জমিতেই করেছে। সুতরাং একে সুগঠিত
করে তুলবার কোনই অন্তরায় নেই— একমাত্র আমাদের ঔদাসীন্য ব্যতীত। বহু লোকের মনে যদি
এই নবভক্তি স্থান পেয়ে থাকে,
তা হলে বঙ্গসাহিত্য যে অচিরে অপূর্ব শ্রী ধারণ করবে, সে বিষয়ে
তিল মাত্র সন্দেহ নেই। এত দিন আমরা বাঙ্গালাদেশে জন-কতক মিলে এই সাধনায় ব্যাপৃত ছিলুম। বাঙ্গালার বাহিরেও
যে বঙ্গ-সরস্বতীর এত ভক্ত আছে, দু’দিন আগে সে জ্ঞান আমাদের
ছিল না। আমার নিজের মনে একটা ধারণা ছিল যে, প্রবাসী
বাঙ্গালিরা শুধু দেশ হিসেবে প্রবাসী হননি, মনেও প্রবাসী হয়েছেন। এ ধারণার মূলে একটা
ছোট্ট ঘটনা আছে। কত ছোটখাটো ঘটনার বীজ থেকে কত বড়-বড় ভুল ধারণা আমাদের মনে
বদ্ধমূল হয়, তারই পরিচয় দেবার জন্য এই ভুল ধারণার মূলস্বরূপ একটি অকিঞ্চিৎকর
ঘটনার উল্লেখ করছি।
8
এ ঘটনা এত দিন পূর্বে
ঘটেছিল যে, সেটিকে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বললেও অত্যুক্তি হয় না। উনবিংশ শতাব্দীতে ইংলন্ডে
এক দিন একটি ভারতবষীয় যুবকের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনিও বিদ্যার্থী হিসেবেই
সে দেশে গিয়েছিলেন, আর আমরা দু’জনেই একই বিদ্যা অর্জন
করতে সমুদ্র লঙ্ঘন করেছিলুম। তাঁর নামরূপের পরিচয় থেকে বুঝলুম যে, তিনি আমারই
স্বজাতি— অর্থাৎ বাঙ্গালি। তিনি যে বাঙ্গালি নন, এমন ভুল করা কোন বাঙ্গালির পক্ষে অসম্ভব ছিল; কারণ, তাঁর দেহযন্ত্রটি
মামুলি বাঙ্গালি ছাঁচেই ঢালাই করা হয়েছিল। সে মূর্তির রেখা ও বর্ণ আমাদের অনুরূপই ছিল। প্রথম-প্রথম আমরা উভয়ে
ইংরাজি ভাষায় কথোপকথন আরম্ভ করি— কারণ, অপরের কাছে শুনেছিলুম যে, তিনি বাঙ্গালি
হলেও একজন প্রবাসী বাঙ্গালি। শেষটা তাকে মুখ ফুটে বাঙ্গালায় জিজ্ঞাসা করলুম— ‘আপনি বাঙ্গালা
জানেন?” তিনি হেসে উত্তর দিলেন, “সে হামি ভাল জানি।’ বলা বাহুল্য যে, এ উত্তর
শুনে আমি একটু চমকে উঠেছিলুম। তার মুখের ভাল জানি’ কথাটা আমি
অসন্দিগ্ধ চিত্তে গ্রাহ্য করতে অবশ্য পারিনি। আমি শুধু ভাবতে লাগলুম— দস্ত্য ‘স’ সংস্কৃত
রীতিতে উচ্চারণ করলে, আমাদের কানে তা এত বিসদৃশ ঠেকে কেন? শেষটা বুঝলুম, সংস্কৃত
শব্দ বাঙ্গালার মতো উচ্চারণ করলে তা যেমন অসংস্কৃত হয়, বাঙ্গালা
শব্দও সংস্কৃতের মতো উচ্চাবণ করলে তাদৃশ অ-বাঙ্গালা হয়। কিন্তু ‘আমি’ যে কী করে 'হামি’তে রূপান্তরিত হয়, স্বরবর্ণের আদি অক্ষর কী ফিকিরে ব্যঞ্জনবর্ণের
শেষ অক্ষরে পরিণত হয়, তার হদিস আমি দুদিন আগে পাইনি। সে যা-ই হোক, এই নব-পরিচিত
বন্ধুর সঙ্গে বাঙ্গালা ভাষায় আলাপ এক কথাতেই বন্ধ হল। অতঃপর উভয়েই ইংরাজি
ভাষার আশ্রয় নিলুম। কারণ,
ও-ভাষায় আমাদের উভয়েরই জবান যখন সমান দুরস্ত, দু’জনেই যখন ইংরাজি ব্যাকরণ ও উচ্চারণের শ্রাদ্ধ করছি, তখন কার
ভুল কে ধরবে ! আমাদের সদ্য-কল্পিত লাট-দরবারের বক্তারা কি কেউ কারও ইংরাজির
খুঁত ধরে?
৫
সেই থেকেই আমি ধরে নিই যে, প্রবাসী বাঙ্গালির মুখের বাঙ্গালা আমাদের
মুখের হিন্দির অনুরূপ। দুয়ের মধ্যে প্রভেদ এই যে, হিন্দি আমরা একদম শিখিনি, অপর পক্ষে
প্রবাসী বাঙ্গালিরা বাঙ্গালা একদম ভেলেননি। ফলে হিন্দি সাহিত্যের আদর আমাদের কাছে যদ্রুপ, বাঙ্গালা
সাহিত্যের আদর তাঁদের কাছেও তদ্রুপ।
উনবিংশ শতাব্দীতে সংগৃহীত আমার উক্ত ধারণা বিংশ শতাব্দীতে যে
সম্পূর্ণ অচল, সে সত্যের পরিচয় আমি বছর পাঁচ-ছয় আগে পাই। আমার সেই বিলাতপ্রবাসী
বাঙ্গালি বন্ধুটি সে যুগের প্রবাসী বাঙ্গালির একটি খাঁটি নমুনা কি না, জানিনে; যদি হন, তা হলে স্বীকার
করতেই হবে যে, গত ৩০ বৎসরের মধ্যে এ বিষয়ে প্রবাসী বাঙ্গালিদের মনোরাজ্যে
যুগান্তর ঘটেছে। এমনকী,
আমার সময়ে-সময়ে এ সন্দেহ হয় যে, আপনাদের
কাছে বঙ্গ-সাহিত্যের যতটা আদর আছে,
বাঙ্গালা দেশে ততটা নেই। জানিনে, এ কথা ঠিক
কি না। কিন্তু এ বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই যে, আপনারা যে-উৎসাহের
সঙ্গে আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করছেন, তা যথার্থই অপূর্ব। আর এক কথা, আপনারা এ
যুগের বাঙ্গালা সাহিত্যকে যতটা আমল দিতে প্রস্তুত, বাঙ্গালার লোক সম্ভবত ততটা নয়। এর জলজ্যান্ত প্রমাণ
এই যে, মাদৃশ লেখককেও আপনারা সাহিত্যিক বলে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হননি।
সূত্র : প্রমথ চৌধুরী || অগ্রন্থিত রচনা - ১
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ওয়েবে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন