অ ভি ভা ষ ণ
৬
অবশ্য আজ থেকে বোধ হয় ১০/১২ বৎসর আগে আমি উত্তরবঙ্গ সাহিত্য-সম্মিলনের
সভাপতির উচ্চ পদ লাভ করি। কিন্তু সে আসন গ্রহণ করে আমি নিজেকে তাদৃশ ধন্য মনে করিনি, আপনাদের
আতিথ্য গ্রহণ করে যত দূর করছি। কারণ,
উত্তরবঙ্গ আমাকে যে এতাদৃশ সম্মানিত করেন, আমার বিশ্বাস, তার ভিতর
একটু অসাহিত্যিক কারণ ছিল।
উত্তরবঙ্গ হচ্ছে আমার স্বদেশ। সুতরাং সে সভার কর্মকর্তারা 'দেশকো ভাই' বলে আমার প্রতি একটু পক্ষপাত যে দেখাননি, এমন কথা আমি জোর করে বলতে পারিনে। তৎসত্ত্বেও তাঁদের নিমন্ত্রণের
ভিতর একটু কিন্তু ছিল।
আমাকে তাঁরা আমার অভিভাষণের গায়ে পোষাকি ভাষা পরিয়ে নিযে যেতে
অনুরোধ করেন। আমি অবশ্য তাতে স্বীকৃত হই— এই ভয়ে যে, অসাধু ভাষায় লিখলে
উত্তরবঙ্গ পাছে আমার প্রতি অদক্ষিণ হয়ে ওঠেন। লোক-লাঞ্ছনা মেরে-কেটে
এক রকম সওয়া যায়, কিন্তু ঘরে গুরুগঞ্জনা অসহ্য। কাজেই সে অভিভাষণ লিখে
আমি নিয়ে যেতে পারিনি, 'তাহা আমাকে লিখিয়া
লইয়া যাইতে হইয়াছিল।' ফলে আমার বক্তব্য তাঁদের মনোমতো হয়েছিল কি না, জানিনে, কিন্তু তা তাঁদের কৰ্ণশূল
হয়নি। সে যা-ই হোক, আপনারা যে আমাকে এখানে
ভাষার সাধুবেশ ধারণ করে আসতে আদেশ করেননি, এর জন্য আমি আপনাদের
কাছে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। কারণ, সাহিত্যরাজ্যেও বার-বার
বহুরূপী সাজাটা কষ্টকর না হলেও লজ্জাকর।
এ পুরাকাহিনী শোনাবার উদ্দেশ্য আপনাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া
যে, আমরা যাকে নব-সাহিত্য বলি, তার ভাষারও একটু নবীনতা
আছে। সাহিত্যের ভাষার এই মোড়-ফেরানোর ব্যাপারে আমার কতকটা হাত আছে। আর প্রধানত সেই হিসেবেই
সাহিত্য সমাজে আমি নিন্দিত ও প্রশংসিত অর্থাৎ বিখ্যাত। আমাদের এ ভাষা চলতি
ভাষা বলেই পরিচিত। যখন এ ভাষাকে আমরা প্রথমে সাহিত্যে প্রমোশন দিই, তখন জন-কতক বাঙ্গালা সাহিত্যের দলপতি এবং তাঁদের দলবল মহা হৈ-চৈ
শুরু করেন এই বলে যে, সাহিত্য গেল, সমাজ গেল, ধর্ম গেল। 'করিয়া' 'করে' রূপ ধারণ
করলেই,
ক্রিয়াপদের লেজ কিঞ্চিৎ খর্ব হলেই, সে লেজুড়ের শক্তি যে এত দূর প্রলয়ঙ্করী হয়ে উঠে, এ কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। কোন জিনিসেরই সৃষ্টি
ও প্রলয় অত তড়িঘড়ি হয় না। কিন্তু সমালোচকের তাড়নায় আমরা পাঠকের মহামান্য উচ্চ আদালতে
সাধু ভাষা বনাম চলতি ভাষার মামলা রুজু করতে বাধ্য হই। তার পর বছর-পাঁচেক
ধরে নানা রূপ বৈজ্ঞানিক, অবৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, অদার্শনিক সওয়াল-জবাবের
ফলে এ ফেরা আমরা সে মামলায় জয়লাভ করেছি। তথাকথিত চলতি বাঙ্গালা এখন সাধু ভাষার সঙ্গে সাহিত্যক্ষেত্রে
এক পঙক্তিতে বসবার অধিকার লাভ করেছে। যা আজ হয়েছে, তাকে ভাষার dyarchy বলা যেতে পারে। এতেই আমরা কৃতাৰ্থ, কারণ, সাধু ভাষার বিরুদ্ধে উচ্ছেদের মামলা আমরা আনিনি; শুধু চলতি বাঙ্গালারও যে সাহিত্যের রাজ্যে প্রবেশের অধিকার আছে, তা-ই প্রমাণ করতে চেয়েছিলুম।
৭
আমাদের ভাষার অস্তরে
যে নবীনতা আছে, তার প্রমাণ, নবীনের দলই ছিলেন আমাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আপনাদের ঘাড়ে গতানুগতিক
মতামতের চাপ ততটা নেই, যতটা আছে আমাদের উপরে; কারণ, বাইরে যেতে হলেই অনেক
পৈতৃক আসবাবপত্র ঘরে ফেলে আসতে হয়, মনের আসবাবপত্রও। সুতরাং আশা করছি যে— ‘পুরাণমিত্যেব ন সাধু সৰ্বং', কালিদাসের এ উক্তির
সত্যতা আপনারা যত সহজে হৃদয়ঙ্গম করবেন, যে-সব বাঙ্গালির কাছে 'ঘর থেকে আঙিনা বিদেশ', তারা তত সহজে করবে না।
ভাষার গুণাগুণ প্রয়োগসাপেক্ষ। একটি উদ্ভট সংস্কৃত
শ্লোক বলে যে— ‘বীণা বাণী অসি ও নারী'র
নিজস্ব কোন গুণ নেই; যার হাতে তা পড়ে, তার উপরই তার গুণাগুণ নির্ভর করে। ও-শ্লোকের অন্তর থেকে
নারীকে সসম্মানে মুক্তি প্রদান করলে বাদবাকি কথা আমরাও নির্ভয়ে গ্রাহ্য করতে পারি, বিশেষত বাণী সম্বন্ধে। কারণ, ভাষা জিনিসটি অসি হিসাবেও ব্যবহার করা যায়, বীণা হিসাবেও ব্যবহার করা যায়। তা যে যায়, তা তিনিই জানেন, যাঁর রবীন্দ্রনাথের
গদ্যপদ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে। রবীন্দ্রনাথের পদ্য যাঁদের হৃদয় স্পর্শ করতে না পারে, তাঁর গদ্য হেলায় তাদের হৃদয় বিদ্ধ করতে পারে।
আসল কথা এই যে, সাধু ভাষার সঙ্গে আমাদের ভাষার বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। তাঁরাও যে সর্গম নিয়ে
করবার করেন, আমরাও সেই সর্গম নিয়ে কারবার করি। প্রভেদ এই যে, সাধু ভাষার অচল ঠাটের পরিবর্তে আমরা সচল ঠাটে সাধনা করছি। তবে এ তর্ক যে বাঙ্গালা
দেশে উঠেছিল, সেটি এক হিসেবে আমাদের সৌভাগ্যের কথা। কারণ, এ আলোচনার ফলে সকলেরই বঙ্গভাষার উপর দৃষ্টি পড়েছে; এবং ইংরাজি-শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অনেকেই তাঁদের মাতৃভাষার অস্তিত্ব
সম্বন্ধে সজ্ঞান হয়েছেন। যেমন বাঙ্গালা দেশে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার ফলে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের
অনেকে হিন্দু ধর্মের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সজ্ঞান হয়েছেন।
সূত্র : প্রমথ চৌধুরী || অগ্রন্থিত রচনা - ১
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ওয়েবে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন