ইঁদুর
আমাদের
বাসায় ইঁদুর এত বেড়ে গেছে যে আর কিছুতেই টেকা যাচ্ছে না। তাদের সাহস দেখে অবাক হতে
হয়। চোখের সামনেই, যুদ্ধক্ষেত্রে
সৈন্যদলের সুচতুর পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়ার মতো ওরা ঘুরে বেড়ায়, দেয়াল আর মেঝের
কোণ বেয়ে-বেয়ে তর্-তর্ করে ছুটোছুটি
করে। যখন সেই নির্দিষ্ট পথে আকস্মিক কোনো বিপদ এসে হাজরি হয়, অর্থাৎ কোনো
বাক্স বা কোনো ভারি জিনিসপত্র সেখানে পথ আগলে বসে, তখন সেটা অনায়াসে টুক্ করে
বেয়ে তারা চলে যায়। কিন্তু রাত্রের আরও ভয়ংকর। এই বিশেষ সময়টাতে তাদের কার্যকলাপ আমাদের
চোখের সামনে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুরু হয়ে যায়। ঘরের যে কয়েকখানা ভাঙা কেরোসিন কাঠের বাক্স, কেরোসিনের
অনেক পুরোনো টিন, কয়েকটা
ভাঙা পিঁড়ি আর কিছু মাটির জিনিসপত্র আছে, সেখান থেকে অনবরতই খুট্-খুট্ টুং-টুং ইত্যাদি
নানা রকমের শব্দ কানে আসতে থাকে। তখন এটা অনুমান করে নিতে আর বাকি থাকে না যে, ঝাঁক ন্যুব্জদেহ
অপদার্থ জীব ওই কেরোসিন কাঠের বাক্সের ওপরে এখন রাতের আসর খুলে বসেছে।
যাই
হোক, ওদের
তাড়নায় আমি উক্ত্যক্ত হয়েছি,
আমার চোখ কপালে উঠেছে। ভাবছি ওদের আক্রমণ করার এমন কিছু অস্ত্র
থাকলেও সেটা এখনও কেন যথাস্থানে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। একটা ইঁদুর মারা কলও কেনার পয়সা
নেই? আমি
আশ্চর্য হব না, নাও
থাকতে পারে।
আমার
মা কিন্তু ইঁদুরকে বড়ো ভয় করেন। দেখেছি একটি ইঁদুরের বাচ্চাও তাঁর কাছে একটা ভালুকের
সমান। পায়ের কাছ দিয়ে গেলে তিনি ভয়ে চার হাত দূর দিয়ে সরে যান। ইঁদুরের গন্ধ পেলে তিনি
সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন, ওদের
যেমনি ভয় করেন, তেমনি
ঘৃণাও করেন। এমন অনেকের থাকে। আমি এমন একজনকে জানি যিনি সামান্য একটা কেঁচো দেখলেই
ভয়ানক শিউরে ওঠেন; আবার
এমন একজনকেও জানি যাঁর একটা মাকড়সা দেখলেই
ভয়ের আর অন্ত থাকে না। আমি নিজেও জোঁক দেখলে দারুণ ভয় পাই। ছোটোবেলায় আমি যখন গরুর
মতো শান্ত এবং অবুঝ ছিলাম, তখন
প্রায়ই মামা বাড়ি যেতুম, বিশেষত
গভীর বর্ষার দিকটায়। তখন সমুদ্রের মতো বিস্তৃত বিলের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে বর্ষার জলের
গন্ধে আমার বুক ভরে এসেছে, ছই-এর বাইরে
এসে জলের সীমাহীন বিস্তার দেখে আমি অবাক হয়ে চেয়ে রয়েছি, শাপলা ফুল
হাতের কাছে পেলে নির্মমভাবে টেনে তুলেছি, কখনও উপুড় হয়ে হাত ডুবিয়ে দিয়েছি জলে, কিন্তু তখনই
আবার কেবলই মনে হয়েছে, এই
বুঝি কামড়ে দিল !—আর ভয়ে-ভয়ে অমনি হাত তুলে নিয়েছি। সেখানে গিয়ে যাদের সঙ্গে আমি মিশেছি, তারা আমার
স্বশ্রেণীর নয় বলে আপত্তি করবার কোনো কারণ ছিল না, অন্তত সেরকম আপত্তি, আশঙ্কা বা প্রশ্ন আমার মনে কখনও জাগেনি।
সেই
ছেলেবেলার বন্ধুরা মাঠে গরু চরাতো।
তাদের মাথার চুলগুলি জলজ ঘাসের মতো দীর্ঘ এবং লালচে, গায়ের রং বাদামি, চোখের রংও তাই,
পা-গুলি অস্বাভাবিক সরু-সরু, মাঝখান দিযে ধনুকের মতো বাঁকা, পরনে একখানা গামাছা, হাতে একটা বাঁশের লাঠি, আঙুলগুলি লাঠির ঘর্ষণে শক্ত হয়ে গেছে। তাদের মুখ এমন খারাপ, আর ব্যবহার
এমন অশ্লীল ছিল যে আমার ভিতর যে সুপ্ত যৌনবোধ ছিল, তা অনেক সময় উত্তেজিত হয়ে উঠত, অথচ আমি আমার স্বশ্রেণীর সংস্কারে তা মুখে প্রকাশ করতে পারতুম না।
তারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করত,
আমার মুখ লাল হয়ে যেতো।
তাদের মধ্যে একজন ছিল যার নাম ভীম,
সে একদিন খোলা মাঠের নতুন জল থেকে একটা প্রকাণ্ড জোঁক তুলে সেটা
হাতে করে আমার দিয়ে চেয়ে হাসতে-হাসতে বললে, ‘সুকু, তোমার
গায়ে ছুঁড়ে মারব?’
আমি
ওর সাহস দেখে অবাক হয়ে গেলাম,
ভয়ে আমার গা শিউরে উঠল, আস্তে-আস্তে বুদ্ধিমানের মতো দূরে গিয়ে বললাম, ‘দ্যাখ
ভীম, ভালো
হবে না বলছি, ভালো
হবে না! ইয়ার্কি না?’
ভীম
হি-হি করে বোকার মতো হাসতে-হাসতে বললে, ‘এই দিলাম,
দিলাম—’
সেদিনের
কথা আজও মনে পড়ে, ভীমের
সাহসের কথা ভাবতে আজো অবাক
লাগে। অনেকের এমন স্বভাব থাকে—যেমন অনেকের কেঁচো দেখলেও ভয় পায়।
আমি কেঁচো দেখলে ভয় পাইনে বটে,
কিন্তু জোঁক দেখলে ভয়ে শিউরে উঠি। এসব ছোটোখাটো ভয়ের মূলে বুর্জোয়া
রীতিনীতির কোনে প্রভাব আছে কি না বলতে পারিনে।
একথা
আগেই বলেছি যে আমার মা-ও ইঁদুর দেখলে দারুণ ভীত হয়ে পড়েন, তখন তাঁকে
সামলানোই দায় হয়ে ওঠে। ইঁদুর যে কাপড় কাটবে সেদিকে নজর না দিয়ে তখন তাঁর দিকেই নজর
দিতে হয় বেশি। একবার তাঁরই একটা কাপড়ের নিচে কেমন করে জানিনে একটা ইঁদুর আটকে গিয়েছিল।
সে থেকে-থেকে কেবল পালাবার চেষ্টা করছিল, ছড়ানো কাপড়ের ওপর দিয়ে সেই প্রয়াস স্পষ্ট চোখে পড়ে না। মা পাঁচ
হাত দূরে সরে গিয়ে ভাঙা গলায় চিৎকার করে বললেন, ‘সুকু, সুকু।’
প্রথম ডাকে উত্তর না দেওয়া আমার একটা অভ্যাস। তাই উত্তর দিয়েছি এই ভেবে চুপ করে রইলাম।
‘সুকু, সুকু।’
এবার
উত্তর দিলাম, ‘কেন?’
মা
তাঁর হলুদ-বাটায় রঙিন শীর্ণ হাতখানা ছড়ানো কাপড়ের দিকে ধরে চোখ বড়ো করে বললেন— ‘ওই দ্যাখ!’
আমি বিরক্ত হলুম। ইঁদুরের জ্বালায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে আর কী ! এত ইঁদুর কেন? পরম শত্রু কি কেবল আমরাই। আমি কাপড়টা ধরে সরাতে যাচ্ছি,
অমনি মা চেঁচিয়ে উঠলেন,
‘আহা, ধরিসনে,
ওটা ধরিস নে।’
‘খেয়ে
খেলবে না তো।’
‘আহা, বাহাদুরি দেখানো
চাই-ই।’
‘মা, তুমি যা ভিতু।’—ইঁদুরটা
অনবরত পালাবার চেষ্টা করছিল। বললাম,
‘আচ্ছা মা,
বাবাকে একটা কল আনতে বলতে পার না? কোনোদিন দেখবে
আমাদের পর্যন্ত কাটতে শুরু করে দিয়েছে।’
‘আহা, মেরে কী হবে? আবোধ প্রাণ, কথা বলতে পারে
না তো। আর কল আনতে পয়সাই বা পাবেন কোথায়?’ মা’র গলার স্বর কিছুমাত্র কাতর হল না, কোনো বিশেষ
কথা বলতে হলেও তাঁর গলার স্বর এমনি অকাতর থাকেন না। তিনি অমনি চলে গেলেন।
একটা
ইঁদুর-মারা কল কিনতে পয়সা লাগবে,
এটা আমার আগে মনে ছিল না। তা হ’লে আমি বলতুম না। কারণ এই ধরনের
কথায় এমন একটা বিশেষ অবস্থার ছবি মনে জাগে যা কেবল একটি সীমাহীন মরুভূমির মতন। মরুভূমিতেও
অনেক সময় জল মেলে, কিন্তু
এ-মরুভূমিতে জল মিলবে, এমন
আশাও করিনে। এই মরুভূমির ইতিহাস আমার অজানা নয়। আমার পায়ের নিচে যে বালি চাপা পড়েছে, যে বালিকণা
আশেপাশের ছড়িয়ে আছে, তারা
ফিস্-ফিস্ করে সেই ইতিহাস
বলে। আমি মন দিয়ে শুনি। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আঠারো বছর বয়স অবধি এ নিয়ে আবোল-তাবোল
অনেক ভেবেছি, কিন্তু
আবোল-তাবোল ভাবনা মস্তিষ্কের হাটে কখনও বিক্রি হয় না। ঈশ্বরের প্রতি সন্দেহ এবং বিশ্বাস, দুই-ই প্রচুর
ছিল, তাই
ঈশ্বরকে কৃষ্ণ বলে নামকরণ করে ডেকেছি, হে কৃষ্ণ,
এ পৃথিবীর সবাইকে যাতে একেবারে বড়োলোক করে দিতে পারি তেমন বর আমাকে
দাও। রবীন্দ্রনাথের ‘পরশ
পাথর’ কবিতা পড়ে
ভেবেছি, ইস্, একটা পরশমণি
যদি পেতুম। সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোককে সত্যিই জিগ্যেস করে বসেছি, ‘আচ্ছা, পরশমণি পাথর
আজকালও লোকে পায়? কোথায়
পাওয়া যায় বলবে?’
আমি
যখন ছোটো ছিলুম, আমাদের
বৃহৎ পরিবারের লোকগুলির নির্মল দেহে তখনও অর্থহীনতার ছায়াটুকু পড়েনি। বুর্জোয়ারাজের
ভাঙনের দিন তখনও ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে যায়নি। শুরু না হওয়ায় আমি এই মানে করেছি যে, তখনো অনেক জনকের
প্রসারিত মনের আকাশে তার ছেলের ভবিষ্যৎ স্মরণ করে গভীর সন্দেহের উদ্রেক হয়নি। আমাকে
আশ্রয় করেই কম আশা জন্ম নিয়েছিল ! অথচ সে সব আশার শাখা-প্রশাখা এখন কোথায় ? আমি বলতে দ্বিধা
করব না, সে
সব শাখা-প্রশাখা তো ছড়ায়ইনি,
বরং মাটির গর্ভের স্থান নিয়েছে। একটা সুবিধে হয়েছে এই যে, পারিবারিক
স্বেচ্ছারিতার অক্টোপাস থেকে রেহাই পাওয়া গেছে, আমি একটু নিরিবিলি
থাকতে পেরেছি।
কিন্তু
নিরিবিলি থাকতে চাইলেই কি আর থাকা যায়? ইঁদুররা আমায় পাগল করে তুলবে না? আমি রোজ দেখতে পাই একটা কেরোসিন কাঠের বাক্স বা ভাঙা টিনের ভিতর
ঢুকে ওরা অনবরত টুং-টাং শব্দ করতে থাকে, ক্ষীণ হলেও অবিরত এমন আওয়াজ করতে থাকে যে অনতিকাল পরেই বিরক্তির
কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটা কুকুর যখন কঁকিয়ে কঁকিয়ে আস্তে আস্তে কাঁদতে থাকে, তখন সেটা কেউ সহ্য করতে
পারে ? আমি
অন্তত করিনে। অমন হয়। যখন একটা বিশ্রী শব্দ ধীরে ধীরে একটা বিশ্রী সংগীতের আকার ধারণ
করে তখন সেটা অসহ্য না হয়ে যায় না ! ইঁদুরগুলির
কার্যকলাপও আমার কাছে সেরকম
একটা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আর
একদিন মা চিৎকার করে ডেকে উঠলেন, ‘সুকু ! সুকু !’
বলেছি
তো প্রথম ডাকেই উত্তর দেওয়ার মতো কঠিন তৎপরতা আমার নেই।
মা
আবার আর্তস্বরে ডাকলেন, ‘সুকু?’
আর
তৃতীয় ডাকের অপেক্ষা না-করে নিজেকে মা’র কাছে যথারীতি স্থাপন করে তাঁর
অঙ্গুলিনির্দেশে যা দেখলুম তাতে যদি বিস্মিত হবার কারণ থাকে তবুও বিস্মিত হলুম না।
দেখলুম, আমাদের ক্বচিৎ-আনা দুধের ভাঁড়টি একপাশে হাঁ করে আমার
দিকে চেয়ে আছে আর তারই পাশ দিয়ে একটা শাদা
পথ তৈরি করে এক প্রকাণ্ড ইঁদুর দ্রুত চলে গেল। এখানে একটা কথা বলে রাখি, কোনো বিশেষ
খবর শুনে কোনো বিশেষ উত্তেজনা বা ভাবান্তর প্রকাশ করা আমার স্বভাবে নেই বলেই বারবার
প্রমাণিত হয়ে গেছে। কাজেই এখানেও তার অভিনয় হবে না, এ কথা বলাই বাহুল্য। দেখতে পেলুম, আমার মা'র
পাতলা কোমল মুখখানি কেমন এক গভীর শোকে পাণ্ডুর হয়ে গেছে, চোখ দুটি গরুর
চোখের মতো করুণ, আর
যেন পদ্মপত্রে কয়েক ফোঁটা জল টল্ টল্ করছে, এখুনি কেঁদে
ফেলবেন।
দুধ
যদি বিশেষ একটা খাদ্য হয়ে থাকে এবং তা যদি নিজেদের আর্থিক কারণে কখনও দুর্লভ হয়ে দাঁড়ায়
এবং সেটা যদি অকস্মাৎ কোনো কারণে পাকস্থলীতে প্রেরণ করার অযোগ্য হয়, তবে অকস্মাৎ
কেঁদে ফেলা খুব আশ্চর্যের ব্যাপার নয়। মা অমনি কেঁদে ফেললেন আর আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে
রইলুম, এমন
একটা অবস্থায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায়ই নেই। মা’র
ছেলেমানুষের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না আর বিনিয়ে-বিনিয়ে কথা আমার চোখের দৃষ্টিপথকে
অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত করে দিলো, আরও গভীর করে
তুললো। আমি দেখতে
পেলুম আকাশে মধ্যাহ্নের সূর্য প্রচুর অগ্নিবর্ষণ করছে, নিচে পৃথিবীর
ধূলিকণা আরও বেশি অগ্নিবর্ষী। আমার হৃদয়ের ক্ষেতও
পুড়ে-পুড়ে খাক হয়ে গেল। একটি নীল উপত্যকাও দেখা যায় না, দূরে জলের
চিহ্নমাত্র নেই, জলস্তম্ভও নেই,
মরীচিকাও দিয়েছে ফাঁকি। ভাবলুম স্বামী বিকেকানন্দের অমূল্য গ্রন্থরাজি
কোথায় পাওয়া যায় ? শ্রীরামকৃষ্ণের
উপদেশাবলি অমূল্য (তখনো ভাবতুম
না দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ কখনো শুরু
হবে।) আমার মুখভঙ্গি চিন্তাকুল হয়ে এলো, হাঁটু দুটি
পেটের কাছে এনে কুকুরের মতো শুয়ে আমি ভাবতে লাগলুম—ঘরের সমস্ত
দরজা-জানালা বন্ধ করে নিয়েছি ভালো করে ভাবার জন্যে—ভাবতে লাগলুম, এমন কোনো উপায়
নেই যাতে এই বিকৃতি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ?
সন্ধ্যার
পর বাবা এলেন, খবরটা
শুনে এমন ভাব দেখালেন না যাতে মনে হয় তিনি হতভম্ব হয়ে গেছেন অথবা কিছুমাত্র দুঃখিত
হয়েছেন, বরং
তাড়াতাড়ি বলতে আরম্ভ করলেন—যদিও তাড়াতাড়ি কথা বলাটা তাঁর
অভ্যাস নয়,— ‘বেশ হয়েছে, ভাল হয়েছে ! আমি আগে থেকেই
ভেবে রেখেছিলুম এমন একটা কিছু হবে। আরে, মানুষের জান নিয়েই টানাটানি, দুধ খেয়ে আর কী হবে বলো !’
দেখতে
পেলুম, বাবা
মুখটি যদিও শুকনো তবু প্রচুর ঘামে তৈলাক্ত দেখাচ্ছে, গায়ের ভারী জামাটিও ঘামে ভিজে ঘরের ভিতর গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। এমন
একটা বিপর্যয়ের পরেও তাঁর এই অবিকৃত-প্রায় ভাব দেখে আমি আশ্বস্ত হলুম এই ভেবে যে, ক্ষতি যা হয়েছে
হয়েছেই, তার
আলোচনায় এমন একটা অবস্থা যার কোনো পরিবর্তন নেই বরং একটা মস্ত গোলযোগের সূত্রপাত হবে, তা থেকে রেহাই
পাওয়া গেল, খুব
শিগ্গির আর আমার
মানসিক অবনতি ঘটবে না।
কিন্তু
বাবা কিছুক্ষণ পরেই সুর বদলালেন : ‘তোমরা
পেলে কী? কেবল
ফুর্তি আর ফুর্তি! দয়া করে আমার দিকে একটু চাও। আমার শরীরটা কি আমি পাথর দিয়ে তৈরি
করেছি ? আমি
কি মানুষ নই ? আমি
এত খেটে মরি আর তোমরা ওদিকে মেতে আছো ! সংসারের
দিকে একবার চোখ খুলে চাও ? নইলে
টিকে থাকাই দায় হবে !’
আমার
কাছে বাবার এই ধরনের কথা মারাত্মক মনে হয়। তাঁর এই ধরনের কথা পেছনে অনেক রাগ ও অসহিষ্ণুতা
সঞ্চিত হয়ে আছে ব’লে আমি মনে করি।
সময়ের
পদক্ষেপের সঙ্গে স্বরের উত্তাপও বেড়ে যেতে লাগল। আমি শঙ্কিত হয়ে উঠলুম। আর কয়েক মিনিটের
মধ্যেই এই কঠিন উত্তপ্ত আবহওয়ায় যে অদ্ভুত নগ্নতা প্রকাশ পাবে, তাতে আমার
লজ্জার আর সীমা-পরিসীমা থাকবে না। এমন অবস্থার সঙ্গে আমার একাধিকবার পরিচয় হলেও আমার
গায়ের চামড়া তাতে পুরু হয়ে যায়নি,
বরং আশঙ্কার কারণ আরও যথেষ্ট পরিমাণে বেড়েছে। যে পৃথিবীর সঙ্গে
আমার পরিচয় তার ব্যর্থতার মাঝখানে এই নগ্নতার দৃশ্য আরও একটি বেদনার কারণ ছাড়া আর কিছুই
নয়। বাবা বললেন, ‘আর
তর্ক কোরো না বলছি। এখান থেকে যাও,
আমার সুমুখ থেকে যাও, দূর হয়ে যাও বলছি।’
মা বললেন, ‘অত বাড়াবাড়ি ভালো
নয়। চেঁচামেচি করে পৃথিবী শুদ্ধ লোককে নিজের গুণপনার কথা জানানো হচ্ছে, খুব
সুখ্যাতি হবে !’
শুনতে
পেলুম, এর
পরে বাবার গলার স্বর রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে বোমার মতো ফেটে পড়ল।—‘তুমি যাবে ? এখান থেকে
কি না বলো ? গেলি
তুই আমার চোখের সামনে থেকে ? শয়তান
মাগি...।’ বাবা
বিড়বিড় করে আরো কত কী বললেন, আমি কানে আঙুল
দিলুম, বালিশের
মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে রইলুম অসাড় মৃতদেহ হয়ে, আমার চোখ ফেটে জল বেরুলো, বিপর্যয়ের
পথে বর্ধিত হয়ে আমার মনের শিশুটি আজন্ম যে শিক্ষা গ্রহণ করে এসেছে তাতে এমন কোনো কথা
লেখা ছিল না। মনে হল যেন আজ এই প্রথম বিপর্যয়ের মুহূর্তগুলি চরম প্রহরী সেজে আমার দোরগোড়ায়
কড়া নাড়ছে। আগে এমন দেখিনি বা শুনিনি। তবু আমার অনুভূতি এই শিক্ষা কোত্থেকে এলো? বলতে
পারি আমার এই শিক্ষা অতি চুপি-চুপি জন্মলাভ করেছে, মাটির পৃথিবী থেকে সে এমনভাবে শ্বাস ও রস গ্রহণ করেছে যাতে টু শব্দও
হয়নি। ফুলের সুবাস যেমন নিঃশব্দে পাখা ছড়িয়ে থাকে তেমনি ওর চোখের পাখা দুটিও নিঃশব্দে
এই অদ্ভুত খেলার আয়োজন করতে ছাড়েনি। আরও বলতে পারি, আমার মনের শিশুর বাঁচবার বা বড়ো হবার ইতিহাস যদি জানতে হয় তবে ফুলের
সঙ্গে তুলনা করা চলে। কিন্তু সেই শিক্ষা আজকাল দিলে কই ? বরং আরও কর্মহীনতার
নামান্তর হল, আমার
কাঁচা শরীরের হাত দুটি কেটে ভাসিয়ে দিল জলে, দুই চোখকে বাষ্পাকুল করে কিছুক্ষণের জন্য কানা করে দিলো। ‘আমি কী করব ?
আমার কিছু করবার আছে কি ?’
‘শয়তান
মাগি, বেরিয়ে
যা।’
আবার
ভেসে এল অদ্ভুত কথাগুলি। এসব আমি শুনতে চাইনে, তবু শুনতে হয়। বাতাসের সঙ্গে খাতির করে তা ভেসে আসবে, জোর
করে কানের ভিতর ঢুকবে; আমার
দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমার মনের মাটিতে সজোরে লাথি মারবে।
‘যা
বলছি।’
গোলমাল
আরও খানিকটা বেড়ে গেল।
কিছু
পরে মা বাষ্পাচ্ছন্ন স্বরে ডাকলেন,
‘সুকু ! সুকু !’
ঠিক
তখুনি উত্তর দিতে লজ্জা হল, ভয়
করল, তবু
আস্তে বললাম, ‘বলো?’
মা
বললেন, ‘দরজা
খোল্।’
ভয়ে
ভয়ে দরজা খুলে দিলুম, ভয়
হলো এই ভেবে যে, এবার অনেক
বিচারের সম্মুখীন হতে হবে, যা
শুনতেও ভয় পাই ঠিক তারই সামনে এক গম্ভীর বিচারপতি হয়ে সমস্ত উত্তেজনাকে শূন্যে বিসর্জন
দিয়ে রায় দিতে হবে।
কিন্তু
যা ভেবেছিলুম তা আর হল না। মা ঘরের ভিতর ঢুকেই ঠান্ডা মেঝের ওপর আঁচলখানা পেতে শুয়ে
পড়লেন। পাতলা পরিচ্ছন্ন শরীরখানি বেঁকে একখানা কাস্তের আকার ধারণ করলো। কেমন অসহায় দেখাল ওঁকে। ছোটোবেলায় যাঁকে
পৃথিবীর মতো বিশাল ভেবেছি, তাঁকে
এমনভাবে দেখে কত ক্ষীণজীবী ও অসহায় মনে হচ্ছে। যাকে বৃহত্তম ভেবেছি, সে এখন কতো ক্ষুদ্র, সে এখনো শৈশব অতিক্রম
করতে পারেনি বলে মনে হচ্ছে। আর আমি কত বৃহৎ; রক্তের চঞ্চলতায়, মাংসপেশির দৃঢ়তায়, বিশ্বস্ত পদক্ষেপে কত উজ্জ্বল ও মহৎ, ওই হরিণের
মতো ভীরু ছোটো দেহের রক্ত পান করে একদিন জীবন গ্রহণ করলেও আজ আমি কতো শক্তিমান ! আমাকে
কেউ জানে ? এমনও
তো হতে পারতো, আজ লন্ডনের কোনো ইতিহাস-বিখ্যাত য়ুনিভাসির্টির করিডরের বুকে বিশ
বছরের যুবক সুকুমার গভীর চিন্তায় পায়চারি করছে, অথবা খেলার মাঠে প্রচুর নাম করে সকল সহপাঠিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, অথবা ত্রিশ
বছরের নীলনয়না কোনো খাঁটি ইংরেজ মহিলার ধীর গম্ভীর পদক্ষেপ ভীরুর মতো অনুসরণ করে একদিন তাঁর দেহের ছায়ায়
বসে প্রেম যাচ্ঞা করছে ! এমন
তো হতে পারত, তার
সোনালি চুল, দীর্ঘ
পক্ষাবৃত চোখ, দেহের সৌরভ—আহা, কে সেই ইংরেজ
মহিলা ? সে
এখন কই... আর সেই স্বর্ণাভ রাজকুমার সুকুমারের মা ওই ঠান্ডা মেঝের ওপর সামান্য কাপড়
বিছিয়ে শুয়ে ! এখান
থেকে কত ছোটো আর কত অসহায় মনে হয়। এক অর্থহীন গর্বে বুকটা প্রশস্ততর করে আমি একবার
মা’র
দিকে তাকালুম।
ডাকলুম, ‘মা? ও মা?’
কোনো
উত্তর নেই। গভীর নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে কোনো ভগ্ন নারীকণ্ঠ আমার কানের দরজায় এসে আঘাত করলো না। ঘুমিয়ে পড়েন নি তো?
পরদিন আবহাওয়া গভীরতা কিছুমাত্র দূর হলো না। মা’র এমন অস্বাভাবিক নীরবতা দেখে আমার ছোট ভাই-বোনরা প্রচুর আস্কারা পেয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি। তারা নগ্নগাত্র হয়ে যথেচ্ছ বিচরণ করতে লাগলো। স্কুলহীন ছোটো বোনটি তার নিত্যকার অভ্যাস মতো প্রেমকুসুমান্তীর্ণ এক প্রকাণ্ড উপন্যাস নিয়ে বসেছে,
অন্যদিকে চাইবারও সময় নেই।
সেদিন
অনেক রাতে সারা বাড়ি গভীর ধোঁয়ায় ভেসে গেল, সকলের নাক-মুখ দিয়ে জল বেরুতে লাগল, দম বন্ধ হয়ে
এলো। ছোটো ভাই-বোনদের খালি মাটিতে পড়ে ঘুমুতে দেখে রান্নাঘরে গিয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘এখনও রান্না
হয়নি, মা?’
চোখের জলে ভিজে উনানের ভিতর প্রাণপণে ফুঁ দিতে দিতে মা
বললেন, ‘না। এখন চড়াচ্ছি।’
‘এত
দেরি হল কেন?’
মা
চুপ করে রইলেন।
বুঝতে
পারলুম। সেই পুরোনো কাসুন্দি। বুঝতে পারলুম এ জিনিস সহজে এড়াতে চাইলেও সহজে এড়াবার
নয়—ঘুরে-ফিরে
এসে চোখের সামনে দাঁড়ায়, পাশ
কাটাতে চাইলে হাত চেপে ধরে, কোনো
রকমে এড়িয়ে গেলেও হাত তুলে ডাকতে থাকে। এই ডাকাডাকির ইতিহাসকে যদি আগাগোড়া লিপিবদ্ধ
করি তবে সারাজীবন লিখেও শেষ করতে পারবো না, কেউ পারবে
না, তাতে
কতগুলি একই রকমের চিত্র গলাগলি করে পাশাপাশি এসে দাঁড়াবে, আর সৌখিন পাঠকের বিরক্তিভাজন হবে। আমি তো জানি পাঠকশ্রেণী কারা ? তাঁদের মনোরঞ্জন করতে হলে
কান্নাকাটির ন্যাকামি চলবে না, কিংবা কিছু লিখলেও টাকার হিসাবটাকে সযত্মে এড়িয়ে
যতে হবে বা হাসিমুখে বরণ করতে হবে। যেমন আমার
বাবা অনেক সময় করেন—প্রচুর অভাবের
চিত্রকেও এক দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়ে পরম আনন্দে ঘাড় বাঁকিয়ে হাসতে থাকেন। কিংবা যেমন
আমাদের পাড়ার প্রকাণ্ড গোঁফওয়ালা রক্ষিতমশায় করেন— ঘরে
অতি শুকনো স্ত্রী আর একপাল ছেলেমেয়েকে অভুক্ত রেখেও পথে-ঘাটে রাজা-উজির মেরে আসেন।
বা আমাদের প্রেস-কর্মচারী মদন—শূন্যতার দিনটিকে উপবাসের তিথি
বলে গণ্য করে, কখনো পদ্মাসন কেটে
বসে নিমীলিত চোখে দুই
শক্ত দীর্ঘ বাহু দিকে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে ঈশ্বরকে সশরীরে ডেকে আনে। এমন হয়। এছাড়া
আর উপায় কী ? স্বর্গের
পথ রুদ্ধ হলে মধ্যপথে এসে দাঁড়াই,
জীবন আমাদের কুক্ষিগত
করলেও জীবনকে প্রচুর অবহেলা করি,
প্রকৃতির করাঘাতে ডাক্তারের বদনাম গাই, অথবা ঊর্ধ্ববাহু
সন্ন্যাসী হয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করি। এসব দেখে আমি একদিন সিদ্ধান্ত করেছিলুম যে, দুঃখের সমুদ্রে
যদি কেউ গলা পর্যন্ত ডুবে থাকে তবে তা এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী। মধ্যবিত্তের নাম করতে গিয়ে
যাদের জিহ্বায় জল আসে সেদিন আমি তাদেরই একজন হয়েছিলুম। বন্ধুকে এক ধোঁয়াটের রহস্যময়
ভাষায় চিঠি লিখলুম :
‘এরা কে জানো?
এরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বটে, কিন্তু না-খেয়ে মরে। যে ফুল অনাদরে শুকিয়ে ঝরে পড়ে মাটিতে,
এরা তাই। এরা তৈরি করেছে বাগান,
অথচ ফুলের শোভা দেখে না ! পেটের ভিতর সুঁচ বিঁধছে প্রচুর,
কিন্তু ভিক্ষাপাত্রও নেই। পরিহাস ! পরিহাস !...’
ঐতিহাসিক
ব্যাখ্যার অজ্ঞতায় নিজের মনে যে কল্পনার সৌধ গড়ে তুললুম, তাতে নিজের
মনে-মনে প্রচুর পরিতৃপ্ত হলুম। যে উপবাসকৃশ বিধবারা তাদের সক্ষম মেয়েদের দৈহিক প্রতিষ্ঠায়
সংসার যাত্রার পথ
বেয়ে বেয়ে কোনো রকমে কালাতিপাত করছেন, তাদের জন্য করুণা যেমন হলো, মনে-মনে
পূজো করতে লাগলুম আরও বেশী।
কিন্তু
সে সব ক্ষণিকের ব্যাপার। শরতের মেঘের মতো যেমনি এসেছিল তেমনি মিশে গেল। মগজের মধ্যে
জায়গা যদিও একটু পেয়েছিল, বেশি
দিন থাকবার ঠাঁই হলো না। আজ ভাবছি
আমাকে মুক্তি দিয়ে গেছে। নইলে এক অসম্পূর্ণ সংকীর্ণ পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে থাকতো, তখন
সে ভাবনা নিয়ে মনে-মনে পরিতৃপ্ত থাকতুম বটে, কিন্তু গতির বিরুদ্ধে চলতুম, এক ভীষণ প্রতিক্রিয়ার বিষে জর্জরিত হতুম।
এমন
দিনে এক অলস মধ্যাহ্নের সঙ্গে আমি সাংঘাতিক প্রেমে পড়ে গেলাম। সেই দুপুরটিকে যা ভালো
লেগেছিলো কেবল মুখে
বললে তা যথেষ্ট বলা হবে না। সেদিন যতটুকু আকাশকে দেখতে পেলুম তার নীলকে এত গভীর মনে
হল যে চোখের ওপর কে যেন কিছু শীতল জলের প্রলেপ দিয়ে দিল। ভাবনার রাজ্যে পায়চারি করে
আমি আমার মীমাংসার সীমান্তে এসে পৌঁছলুম সেই মধ্যাহ্নে, সেখানে রাখলুম
দৃঢ় প্রত্যয়। আকাশের নীলিমায় দুই চোখকে সিক্ত করে আমি দেখতে পেলুম চওড়া রাস্তার পাশে
সারি-সারি প্রকাণ্ড দালান, তার
প্রতি কক্ষে সুস্থ সবল মানুষের পদক্ষেপ, সিঁড়িতে নানারকম জুতোর আওয়াজ, মেয়ে-পুরুষের মিলিত চিৎকার-ধ্বনি পৃথিবীর পথে-পথে বলিষ্ঠ দুয়ারে
হানা দেয়, বলিষ্ঠ
মানুষ প্রসব করে, আমি
দেখতে পেলুম ইলেকট্রিক আর টেলিগ্রাফ তারের অরণ্য, ট্রাকটর চলেছে মাঠের পর মাঠ পার হয়ে—অবাধ্য জমিকে ভেঙে-চুরে দলে-মুচ্ড়ে, সোনার ফসল আনন্দের গান গায়, আর যন্ত্রের ঘর্ষণে ও মানুষের হর্ষধ্বনিতে এক অপূর্ব সংগীতের সৃষ্টি
হলো। একদা যে বাতাস মাটির মানুষের প্রতি উপহাস
করে বিপুল অট্টহাসি হেসেছে, সেই
বাতাসের হাত আজ করতালি দেয় গাছের পাতায় পাতায়। কেউ শুনতে পায় ? যারা শোনে
তাদের নমস্কার।—তাই অলস মধ্যাহ্নকে মধুরতর মনে হলো। দেখলুম এক নগ্নদেহ বালক রাস্তার মাঝখানে
বসে এক ইটের টুকরো নিয়ে গভীর মনোযোগে আঁক কষছে। কোন বাড়ি থেকে পচা মাছের রান্নার গন্ধ
বেরিয়েছে বেশ, সংগীত-পিপাসুর
বেসুরো গলায় গান শোনা যাচ্ছে হারমোনিয়াম সহযোগে এই অসময়ে, রৌদ্র প্রচণ্ড
হলেও হাওয়া দিচ্ছে প্রচুর, ও
বাড়ির এক বধূ রাস্তার কলে এইমাত্র স্নান করে নিজ বুকের তীক্ষ্মতাকে প্রদর্শনের প্রচুর
অবকাশ দিয়ে সংকুচিত দেহে বাড়ির ভিতর ঢুকল, দু’টি মজুর কোন রকমে খাওয়া-দাওয়া সেরে কয়লামলিন
বেশে আরো দৌড় দিচ্ছে।
এ দৃশ্য বড়ো মধুর লেগেছে—অবশ্য কোনো বুর্জোয়া চিত্রকরের
চিরন্তনী চিত্র বলে নয়। চিত্র যেমন আরাম দেয়, তেমনি পীড়াও দেয়। আমার ভালো লেগেছে এই স্মরণীয় দিনটিতে এক বৈজ্ঞানিক
বুদ্ধির রাজত্বে খানিকটা পায়চারি করতে পেরেছিল বলে। চমৎকার ! চমৎকার !
অনেক
রাত্রে ইঁদুরের উৎপাত আবার শুরু হলো।
ওরা টিন আর কাঠের বাক্সে দাপাদাপি শুরু করে দিলো, বীর
দর্পে চোখের সামনে দিয়ে ঘরের মেঝে অতিক্রম করে দারুণ উপহাস করতে লাগলো।
রান্না
শেষ করে মা সকলকে ডাকাডাকি শুরু করে দিলেন, ‘ওরে মন্টু,
ওরে ছবি,
ওরে নারু,
ওঠ্ বাবা, ওঠ্ !’
মন্টু
উঠেই প্রাণপণে চিৎকার আরম্ভ করে দিলো।
ছবি যদিও এতক্ষণ তার উপন্যাসের ওপর উপুর হয়ে পড়েছিলো, এখন
বই-টই ফেলে চোখ বুজে শুয়ে পড়লো।
‘ওরে
ছবি, খেতে
আয়, খাবি
আয়।’
বার
বার ডাকেও ছবি টুঁ শব্দটি করে না।
মা
ভগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘আমার
কী দোষ বল? আমার
ওপর রাগ করিস কেন? গরিব
হয়ে জন্মালে...’
মা’র
চোখ ছল ছল করে উঠল, গলা
কেঁপে গেল। আমি রাগ করে
বললুম, ‘আহা, ও না খেলে
না খাবে, তুমি
ওদের দাও না ?’
মধ্যরাত্রির
ইতিহাস আরও বিস্ময়কর।
এক
অনুচ্চ কণ্ঠের শব্দে হঠাৎ জেগে উঠলুম। শুনতে পেলুম বাবা অতি নিম্নস্বরে ডাকছেন, ‘কনক, ও কনক, ঘুমুচ্ছো?’
বাবা
মাকে ডাকছেন নাম ধরে। ভারি চমৎকার মনে হল, মনে মনে বাবাকে আমার বয়স ফিরিয়ে দিলুম; আর আমার প্রতি
ভালোবাসা কামনা করতে লাগলুম তাঁর কাছ থেকে। যুবক সুকুমার তার বউকেও এমনি করে ডাকবে, চিৎকার করে
ডেকে প্রত্যেকটি ঘর এমনি সংগীতের প্রতিধ্বনিত করে তুলবে।
‘কনক? ও কনক?’
প্রৌঢ়া
কনকলতা অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনো উত্তর দিলেন না, কোনবার কঁকিয়ে উঠলেন, কোনবার উঃ-আঃ করলেন। আমি এদিকে রুদ্ধ নিশ্বাসে নিম্নগামী হলুম।
বালিশের ভিতর মুখ গুঁজে হারিয়ে যাবার কামনা করতে লাগলুম। লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠলুম। লজ্জায়
আরক্ত হয়ে উঠলুম, শরীর
দিয়ে ঘামের বন্যা ছুটলো।
ওদিকে
মধ্যরাত্রির চাঁদ উঠেছে আকাশে,
পৃথিবীর গায়ে কে এক শাদা
মসলিনের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে,
সঙ্গে এনেছে ঠাণ্ডা জলের স্রোতের মতো বাতাস, আমার ঘরের সামনে ভিখিরি কুকুরদের সাময়িক নিদ্রাময়তায়
এক শীতল নিস্তবদ্ধতা বিরাজ করছে। কিন্তু মাঝে মাঝে ও বাড়ির ছাদে নিদ্রাহীন বানরদের
অস্পষ্ট গোঙানি শোনা যায়। মধ্যরাত্রের প্রহরী আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে কখন?
অবশেষে
প্রৌঢ়া কনকলতার নীরবতা ভাঙল,
তিনি আবার আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন, অল্প একটু
ঘোমটা টেনে কাপড়ের প্রচুর দৈর্ঘ্য দিয়ে নিজেকে ভালোভাবে আচ্ছাদিত করলেন, তারপর এক অশিক্ষিতা
নববধূর মতো ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হতে লাগলেন। অঙ্গভঙ্গির সঞ্চালনে যে সংগীতের সৃষ্টি
হয়, সেই
সংগীতের আয়নায় আমার কাছে সমস্ত স্পষ্ট হয়ে উঠলো। আমি লক্ষ করলুম দুই জোড়া পায়ের ভীরু অথচ স্পষ্ট আওয়াজ আস্তে আস্তে বাতাসের
সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
অনেক
রাত্রে বাবা গুন্ গুন্ সুরে গান গাইতে লাগলেন; চমৎকার মিষ্টি গলা বেহালার মতো শোনা যাচ্ছে। সেই গানের খেলায় আলোর
কণাগুলি আরও শাদা হয়ে গেছে, মনে হয় এক
বিশাল অট্টলিকার সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে-বেয়ে সেই গানের রেখা পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষ রাত্রির বাতাস অপূর্ব স্নেহে
মন্থর হয়ে এসেছে। একটা কাক রোজকার মতো ডেকে উঠেছে। বাবাকে গান গাইতে আরও শুনেছি বটে, কিন্তু আজকের
মতো এমন মধুর ও গভীর আর কখনও শুনিনি। তাঁর মৃদু-গম্ভীর গানে আজ রাত্রির পৃথিবী যেন
আমার কাছে নত হয়ে গেলো।
তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়লুম।
পরদিন
কার প্রাণখোলা হাসিতে ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠলুম। হাসির ঐশ্বর্যে বাড়ির ইটগুলিও কাঁপছে।
বাবা
বললেন, ‘পণ্ডিত মশাই, ও পণ্ডিত মশাই, উঠুন? আর কত ঘুমুবেন? সকালে না উঠলে
বড়োলোক হওয়া যায় কী? উঠুন?’
আমি
অনেক কষ্টে চোখ মেলে দেখলুম,
কখন ভোর হয়ে গেছে। বাবা স্নেহময় কথায় আমি কখনও হাসিনে, কেমন বাধে, যথেষ্ট বয়স
হয়েছে কিনা, এক
কুড়ি বছর তো পেরিয়ে চললুম।
মশারির
দড়ি খুলতে খুলতে বাবা বললেন,
‘পৃথিবীতে এত গ্রেটম্যান দেখতে পাচ্ছো, সকলের ভোরে ওঠবার অভ্যেস ছিল। আমার বাবা, মানে তোমার
ঠাকুরদারও এমনি অভ্যেস ছিল। আমরা যত ভোরেই উঠি না কেন, উঠেই শুনতে
পেতুম বাইরের ঘরে তামাক খাওয়ার শব্দ হচ্ছে। অমন অধ্যবয়সী না হলে আর একটা জীবনে অত জমি-জমা
অত টাকা পয়সা করে যেতে পারেন ! তিনি তো সবই রেখে গিয়েছিলেন। আমরাই কিছু
রাখতে পারলুম না। কিন্তু উঠুন পণ্ডিত মশাই, যারা ঘুম থেকে দেরি করে ওঠে জীবনে তারা কক্ষনো উন্নতি করতে পারে
না।’
অতটা
মাতব্বরি সহ্য হয় না, জীবনে
একদিন মাত্র সকালে উঠেই বাড়ি-সুদ্ধ লোক মাথায় তুলেছেন।
সমস্ত
বাড়িটা খুশির বাজনায় মুখরিত হয়ে উঠল।
ওদিকে
মন্টু সেলুনে চুল ছাঁটাবার জন্য পয়সা চাইতে শুরু করেছে, ঘন্টাখানেক
পরেও পয়সা না-পেলে মেঝেতে আছাড় খেয়ে তারস্বরে কাঁদবে। নারু পক্ক-পক্ক বাক্য বর্ষণ করে সকলের মনোরঞ্জন করবার চেষ্টায়
আছে ! ছবি
এইমাত্র তার উপন্যাসের পৃষ্ঠায় নায়িকার শয়নঘরে নায়কের অভিযান দেখে মনে-মনে পুলকিত হয়ে
উঠেছে।
বাবা
দারুণ কর্মব্যস্ত হয়ে উঠলেন,
এঘর-ওঘর পায়চারি করতে লাগলেন।
একসময়
আমার কাছে এসে বললেন, ‘তোমরা
থিয়োরিটা বার করেছ ভালোই, কিন্তু
কার্যকরী হবে না, আজকাল
ওসব ভালোমানুষি আর চলবে না। এখন কাজ হল লাঠির। হিটলারের লাঠি, বুঝলে পণ্ডিত মশাই?’
আমি
মনে-মনে হাসলুম। বাবা যা বলেন তা এমনভাবে বলেন যে মনে-মনে বেশ আমোদ অনুভব করা যায়।
তাঁর কি জানি কেন ধারণা হয়েছে,
আমরা সব ভালোমানুষের দল। নিজের খেয়ে পরের চিন্তা করি, শুষ্কমুখ হয়ে
শীতল জল বিতরণ করতে চাই, নিজেরা
স্বর্গচ্যুত, অথচ
পরের স্বর্গলাভের পথ-আবিষ্কার মত্ত !
আবার
বললেন : ‘তোমাদের রাশিয়া কেবল সাধুরই জন্ম দিয়েছে, অসাধু দেয়নি, কেবল মার খেয়ে
মরবে। লেনিন তো মস্ত বড়ো সাধু ছিলেন, যেমনি টলস্টয় ছিলেন। কিন্তু ওঁরা লাঠির সঙ্গে পারবেন কি? কক্ষনো নয় !’
বলতে
ইচ্ছা হয়, চমৎকার ! এমন স্বকীয়তা, এমন নতুনত্ব
আর কোথাও চোখে পড়েছে? এমন
করে আমার বাবা ছাড়া আর কেউ বলতে পারেন না, এটা জোর করে বলতে পারি। তিনি একবার যা বললেন তা ভুল হলেও তা থেকে
একচুল কেউ তাঁকে সরাবে, এমন
বঙ্গ-সন্তান ভূ-ভারতে দেখিনে। এক হিটলারি দম্ভে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
কিন্তু
একমাত্র আশার কথা এই যে, এসব
ব্যাপারে তিনি মোটেই সিরিয়াস নন,
একবার যা বলেন দ্বিতীয়বার তা বলতে অনেক দেরি করেন। নইলে আমার জীবন
অতিষ্ঠ হয়ে উঠত। পৈত্রিক অধিকারে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তাঁর অপব্যবহার করতেন সন্দেহ
নেই।
ওদিকে
কর্মব্যস্ত মাকে দেখতে পাচ্ছি। গভীর মনোযোগে তিনি তাঁর কাজ করে যাচ্ছেন, কোথাও এতটুকু
দৃষ্টিপাত করবার সময় নেই যেন। কাঁধের ওপর দুই গাছি খড়ের মতো চুল এলিয়ে পড়েছে, তার ওপর দিয়েই
ঘন-ঘন ঘোমটা টেনে দিচ্ছেন, পরনে
একখানা জীর্ণ মলিন কাপড়, ফর্সা
পা-দুটি জলের অত্যাচারে ক্ষত-বিক্ষত বিশীর্ণ হয়ে এসেছে। পেছনে নারু ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আন্তর্জাতিক
রাজনীতি ছেড়ে বাবা এবার ঘরোয়া বৈঠকে যোগ দিলেন। নারুকে ডেকে বললেন, ‘নারু, বাবা, তোমার কী চাই
বলো ?’
নারু
তার ছোটো-ছোটো ভাঙা দাঁতগুলি বের করে অনায়াসে বলে ফেলল, ‘একটা মোটর-বাইক।
সার্জেন্টরা কেমন সুন্দর ভট্ ভট্ করে ঘুরে বেড়ায়, না বাবা ?’
কিন্তু
মন্টুর কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি হয়েছে। সে হঠাৎ পেছনে ফিরে মুখটা নিজের দিকে নিয়ে কামানের
মতো হয়ে বললে, ‘বাবা, এই দ্যাখো ?’
দেখতে
পাওয়া গেল, তার
পেছনটা ছিঁড়ে একেবারে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে। বাবা হো হো করে হেসে উঠলেন, বললেন, ‘বাঃ, বেশ তো হয়েছে, মন্টুবাবুর
যা গরম, এবার
দুটো জানালা হয়ে গেল, বেশ
তো হল। এবার থেকে হু হু করে কেবল বাতাস আসবে আর যাবে, চমৎকার, না ?’
মন্টু
সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি ভুলে বুদ্ধিমানের মতো হেসে উঠল; নারু তার ভাঙা দাঁত বের করে আরও বেশি করে হাসতে লাগল, বাবাও সে হাসিতে
যোগ দিলেন। আমাদের সামান্য বাসা এক অসামান্য হাসিতে নেচে উঠল, গুম্ গুম্ করতে লাগল।
হাসলুম
না কেবল আমি। শুধু মনে-মনে উপভোগ করলুম। ভাবলুম আনন্দের এই নির্মল মুহূর্তগুলি যদি
দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে খুশির আর অন্ত থাকে না। মানুষ মানুষ হয়ে ওঠে।
বাবা
পরবর্তী অভিযান হল রান্নাঘরে। একখানা পিঁড়ি পেতে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে হাসিমুখে বাবা
বললেন, ‘আজ
কী রাঁধবে গো ?’
মুখ
ফিরিয়ে অজস্র হেসে মা বললেন,
‘তুমি যা বলবে !’
বাবাকে
এবার ছেলেমানুষিতে পেয়ে বসল,
‘আমি যা বলবো,
ঠিক তো ? বলি, রাঁধবে মাংস, পোলাও, দই, সন্দেশ ? রাঁধবে চাটনি, চচ্চড়ি, রুই মাছের
মুড়ো ? রাঁধবে ? রাঁধবে আরও
আমি যা বলব ?’
‘ও
মাগো, থাক্ থাক্, আর
বলতে হবে না।’ মা
দুই হাত তুলে মাথা নাড়তে লাগলেন,
খিল্-খিল্ করে হেসে উঠলেন।
ব্যাপার
দেখে নারু দৌড়ে গেল, দুজনের
দিকে দুইবার চেয়ে তারপর মাকে মুচকি হাসতে দেখে বললে, ‘মাগো কী হয়েছে ?
অমন করে হাসছ কেন ? বাবা তোমায় কাতুকুতু দিয়েছে ?’
‘আরে, নারে না, অত পাকামি
করতে হবে না। খেলগে যা—’
বাঁ হাত মা বাইরের দিক দেখিয়ে দিলেন।
একটু
প্রকৃতিস্থ হয়ে বাবা আবার বললেন,
‘আচ্ছা, তোমাকে
যেদিন প্রথম দেখতে গিয়েছিলাম সেদিনের কথা মনে পড়ে ?’
একটুও
চিন্তা না করে মা
বললেন, ‘আমার
ওসব মনে-টনে নেই।’
‘আহা, বিলের ধারে
মাঠে সেই যে গরু চরাচ্ছিলে?’
মা’র
চোখ বড়ো হয়ে গেল ‘ওমা, আমি কী ভদ্দরলোক
নই গো যে মেয়েলোক হয়েও মাঠে-মাঠে গরু চরাবো?’
‘গরু
চরানোটা কি অপরাধ? দরকার
হলেও এখানে-সেখানে একটু নেড়ে-চেড়ে দিলে দোষ হয়? আসল কথা তোমার সবই মনে আছে, ইচ্ছে করেই কেবল যা-তা বলছ।’
‘হ্যাঁ
গো হ্যাঁ, সব মনে আছে,
সব মনে আছে !’
মৃদু
মৃদু হেসে বাবা বললেন, ‘নৌকো থেকেই দেখতে পেলুম বিলের ধারে কে একটি
মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকার রাত্রে একটি মাত্র দীপশিখার মতো; নৌকো থেকে
নেমেও দেখলুম, সেই
মেয়ে তার জায়গা থেকে এতটুকুও সরে দাঁড়াচ্ছে না বা পাখির মতো বাড়ি দিকে উড়ে চলে যাচ্ছে
না, বরং
আমাদের দিকে সোজাসুজি চেয়ে আছে,
অপরিচিত বলে এতটুকু লজ্জা নেই, কাছে গিয়ে দেখলুম ঠিন যেন দেবীপ্রতিমা, খোলা মাঠে
জলের ধারে, মানিয়েছে
বেশ, গভীর
বর্ষার আরও মানাবে। তারপর এক ভাঙা চেয়ারে বসে ভাঙা পাখার বাতাস খেয়ে যাকে দেখলুম সে-ও
সেই একই মেয়ে। কিন্তু এবার বোবা,
লজ্জাবতী লতার মতো লজ্জায় একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।’
বাবা
হা-হা করে প্রাণ খুলে হাসতে লাগলেন। কতক্ষণ পরে বললেন, ‘তোমার কী চাই—বললে
না ?’
‘আমার
জন্যে একখানা রান্নার কাপড় এনো।’
‘লাল
রঙের।’
‘হ্যাঁ।’
তারপর
কার জন্যে কী এনেছিলেন খবর রাখিনি,
কিন্তু নিজের জন্যে ছ’আনা দামের এক জোড়া চটি এনেছিলেন
দেখেছি। মাত্র ছ’আনা দাম। বাবা এ নিয়ে অনেক গর্ব করেছেন, কিন্তু একেবারে
কাঁচা চামড়া বলে কুকুরের আশঙ্কাও করেছেন।
কুকুরের কথা জানিনে,
তবে কয়েকদিন পরেই জুতো জোড়ার এক পাটি কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল কেউ বলতে পারে না। আশ্চর্য !
পরদিন
দুপুরবেলা রেলওয়ে-ইয়ার্ডের ওপর দিয়ে যেতে যেতে কার ডাকে মুখ ফিরে তাকালুম। দেখি শশধর
ড্রাইভার, হাত
তুলে আমায় ডাকছে। এখানে ইউনিয়ন করতে এসে আমার একেবারে প্রথম আলাপ হয়েছিল এই শশধর ড্রাইভারের
সঙ্গে। সেদিন কমরেড বিশ্বনাথ ছিল। তখন গম্ভীরভাবে শশধর বলেছিল, ‘দেখুন বিশ্ববাবু, সায়েব সেদিন
আমায় ডেকেছিলো।’
‘কেন?’
‘শালা
বলে কিনা, ড্রাইভার
ইউনিয়ন ছেড়ে দাও, নইলে
মুশকিল হবে বলেছি’। শুনে মেজাজটা জবর খারাপ হয়ে গেল। মুখের ওপর বলে এলুম, সায়েব আমার
ইচ্ছে আমি ইউনিয়ন করব। তুমি যা করতে পারো করো।
এই বলে তখুনি ঠিক এইভাবে চলে এলুম।’ আসবার
ভঙ্গিটা দেখাবার জন্যে শশধর হেঁটে অনেক দূর পর্যন্ত গেল, তারপর আবার
যথাস্থানে ফিরে এলো।
আমার
প্রথম অভিজ্ঞতায় সেদিনের দৃশ্যটা চমৎকার লেগেছিল। আমার এই মধ্যাহ্নে ট্রাকটর-স্বপ্নে
ভিত পাকা করতে আরম্ভ করলুম সেই দিন থেকে। একথা বলাই বাহুল্য যে, ইতিহাস যেমন
আমাদের দিক নেয়, আমিও
ইতিহাসের দিক নিলুম। আমি হাত প্রসারিত করে দিলুম জনতার দিকে, তাদের উষ্ণ
অভিনন্দনের আমি ধন্য হলুম। তাদেরও ধন্যবাদ, যারা আমাকে আমার এই অসহায়তার বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়ে গেছে। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ। সেবাব্রত
নয়, মানবতা
নয়, স্বার্থপরতা
অথচ শ্রেষ্ঠ উদারতা নিয়ে এক ক্লান্তিহীন বৈজ্ঞানিক অনুশীলন।
আমি
শশধরের কাছে গেলুম। শশধর বললে,
‘উঠুন।’
সে
আমাকে তার এঞ্জিনে উঠিয়ে নিলো। তারপর একটা বিড়ি হাতে দিয়ে বললে, ‘খান, সুকুমারবাবু।’
বিকেলে
দিকে একটা গ্যাঙের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম। একটা মিটিং অ্যারেঞ্জ করবার কথা ছিল। ওরা
আমার দিকে কেউ তাকালো, কেউ তাকালো না। অদূরে
এঞ্জিনের সাঁ সাঁ শব্দ হচ্ছে। পয়েন্টস্ম্যান—গানারদের চিৎকার
আর হুইসিল শোনা যাচ্ছে।
ইয়াসিন
এতদিন পরে ছুটি থেকে ফিরেছে দেখলুম। আমাকে দেখে কাজ থামিয়ে বললে, ‘ওরা কী বলছিলো জানেন ?’
হেসে
বললুম, ‘কী?’
‘বলছিলো আপনি একটা ব্যারিস্টার হলেন না কেন?’
সকলে
হো হো করে হেসে উঠলো, আমিও
হাসতে লাগলুম।
মেট্ সুরেন্দ্র
গম্ভীরভাবে বললে, ‘তোমার
কাছে আমাদের আর একটি নিবেদন আছে,
ইয়াসিন মিঞা !
আমরা সবাই মিলে চাঁদা তুলে তোমায় ইস্কুলে পড়াতে চাই !’
এবার
হাসির পালা আরও জোরে। কাজ ফেলে সবাই বসে পড়লো।
ইয়াসিন
রেগে গেল, বললে, ‘বাঃ বাঃ বাঃ, খালি ঠাট্টা, না? চারটে পয়সা
দিয়েই খালাস, না? চারটে পয়সা
দিলেই বিপ্লব হবে, না? বিপ্লব আকাশ
থেকে পড়বে, না?’
—একটু
শান্ত হয়ে ইয়াসিন শেষে একটা গল্প বললে।
গল্পটি
হচ্ছে এই : সে এবার বাড়ি গিয়ে তার গাঁয়ের চাষীদের একটা বৈঠকে যোগ দিয়েছিলো। সেই বৈঠকে যে লোকটা বক্তৃতা করেছিল সে
হঠাৎ তার দিকে চেয়ে বললে,—ভাই
ইয়াসিন, তোমাদের
ওখানে ইউনিয়ন নেই ? ইয়াসিন
বুক ঠুকে বললে, আলবত
আছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে বুকপকেট থেকে একখানা রসিদ বের করে দিল। লোকটি ভয়ানক খুশি হয়ে
বলেছিল, তুমি
যে আমাদের কমরেড, ভাই
ইয়াসিন ! তুমি যে আমাদেরই। ইয়াসিন তখন বিচক্ষণের মতো হেসেছিল। ‘দুনিয়ার সবাই
এরকম একজোট হচ্ছে, আর
আমরাই কেবল চুপ করে বসে থাকব,
না? চারটে
পয়সা দিলেই খালাস, না’ বলতে বলতে
ইয়াসিনের ঘর্মাক্ত মুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, কিন্তু পরক্ষণেই আবার সে কাজে লেগে গেল, গভীর মনোযোগে
ঠক্ ঠক্ শব্দ করে কাজ করতে লাগলো।
আমি
ফিরে এলুম। সাম্যবাদের গর্ব,
তার ইস্পাতের মতো আশা, তার সোনার মতো ফসল বুকে করে আমি ফিরে এলুম। এখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
ঝির্ ঝির্ বাতাসের সঙ্গে
শেড-ঘর থেকে তেল আর কাঁচা কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ আসছে বেশ। আমি বাঁ দিকে শেড-ঘর রেখে পথ
অতিক্রম করতে লাগলাম। একটু এগিয়ে দেখি লাইনের ওপর অনেকগুলি এঞ্জিন দাঁড়িযে আছে, মনে হয় গভীর
ধ্যানে বসেছে যেন ! আমার কাছে ওদের মানুষের মতো প্রাণময় মনে হল। এখন বিশ্রাম করতে বসেছে।
ওদের গায়ের মধ্যে কত রকমের হাড়,
কত কলকব্জা,
মাথার ওপর ওই একটিমাত্র চোখ, কিন্তু কত উজ্জ্বল। মানুষেরা ওদের সৃষ্টিকর্তা। হাসি নেই, কান্না নেই, কেবল কর্মীর
মতো রাগ। এমন বিরাট কর্মী-পুরুষ আর আছে! সত্য কথা বলতে কী, এত কলকব্জার
মাঝে, এতগুলি
এঞ্জিনের ভিতর দিয়ে পথ চলতে চলতে আমার শরীরে কেমন একটা রোমাঞ্চ হলো। আমি হতভম্ব হয়ে
তাদের মাংসহীন শরীরের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইলুম।
তারপর
সন্ধ্যার অন্ধকারে বাসায় ফিরে এলুম।
কয়েকদিন
পরে কোনো গভীর প্রতুষ্যে একটি ইঁদুর-মার কল হাতে করে আমার বাবা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে
বোকার মতো হাসতে লাগলেন। দারুণ খুশিতে নারু আর মন্টু দুই আঙুলের ধরে বানরের মতো লাফাচ্ছিলো। কয়েক মিনিট পরে আরও অনেক ছেলেপেলে এসে
জুটলো। একটা কুকুর দাঁড়ালো এসে
পাশে। উপস্থিত ছেলেদের মধ্যে যারা সাহসী তারা কেউ লাঠি, কেউ বড়ো ইঁট
নিয়ে বসলো রাস্তার ধারে।
ব্যাপার
আর কিছুই নয়, কয়েকটা
ইঁদুর ধরা পড়েছে।
সূত্র : সংকেত ও অন্যান্য গল্প - সোমেন চন্দ (বিভাস)
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন