রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট গদ্য সাহিত্যের সমালোচনার
ভার আমার হস্তে ন্যস্ত করায় আপনি একটু অন্যমনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে
পারবেন যে রবীন্দ্রনাথের উপযুক্ত সমালোচক বাঙলাদেশে আর যিনিই ইউন, বীরবল কখনও হতে পারেন না।
প্রথমেই একটি অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে নিই। যে-ভাষায় আমি লিখি, অনেকে তার নাম দিয়েছেন বীরবলী ভাষা। বলা বাহুল্য, কিন্তু বলা আবশ্যক যে 'বীরবলী ভাষা' নামক কোন সৃষ্টিছাড়া ভাষা নেই। যে-ভাষায় আর-পাঁচ জন লেখেন, সেই ভাষাতেই আমি লিখি, এবং সে ভাষার নাম হচ্ছে বাঙলা ভাষা। অবশ্য আমার ভাষার সঙ্গে অপরের ভাষার অল্পবিস্তর প্রভেদ আছে। সে কারণ যদি আমার ভাষার পৃথক নামকরণ করতে হয়, তা হলে কোন ভাষাকেই আর বাঙলা ভাষা বলা চলে না। লেখার কথা ছেড়ে দিন, যদি মন দিয়ে পাঁচ জন বাঙালির মুখের কথা শোনেন, তা হলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে এক জন বাঙালির মুখের ভাষা আর-এক জন বাঙালির মুখের ভাষা যমজ নয়। তা সত্ত্বেও বাঙলা ভাষা বলে একটা ভাষা আছে, যেমন দুটি বাঙালির চেহারা ঠিক এক নয়, তা সত্ত্বেও বাঙালি জাতি বলে একটা জাতি আছে।
কেন যে আমার ভাষাকে লোকে বীরবলী ভাষা বলে, তা আমি সম্পূর্ণ জানি। পৃথিবীতে এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা একটা নাম না পেলে কোন জিনিসই বুঝতে পারে না। বোঝা তো মাথায় থাক, চিনতেও পারে না। এই শ্রেণীর লোকেরাই সব নতুন জিনিসের নূতন নামকরণ করতে সদাই ব্যস্ত। আর এই নামকরণের ব্যবসা যে সমাজে চলে, তার কারণ ছোট ছেলেরা যেমন চুষিকাঠি পেলে খুশি হয়, লোকসমাজও তেমনি 'নাম' পেলেই খুশি হয়। ঐ নাম চুষেই তারা সাহিত্যরস আস্বাদন করে। ইতিহাসের কাছে জানা যায় যে, কালের গতিকে মানুষের আর যে-ব্যবসাই থাক আর যাক, খেলনার ব্যবসা কখনও যায়নি ও কখনও যাবে না। যা চিরকাল আছে, তা নিশ্চয়ই চিরকাল থাকবে। কাশীর বৌদ্ধধর্ম গত হয়েছে, কিন্তু কাশীর খেলনা আজও বাজারে সমান কাটছে।
প্রথমেই একটি অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে নিই। যে-ভাষায় আমি লিখি, অনেকে তার নাম দিয়েছেন বীরবলী ভাষা। বলা বাহুল্য, কিন্তু বলা আবশ্যক যে 'বীরবলী ভাষা' নামক কোন সৃষ্টিছাড়া ভাষা নেই। যে-ভাষায় আর-পাঁচ জন লেখেন, সেই ভাষাতেই আমি লিখি, এবং সে ভাষার নাম হচ্ছে বাঙলা ভাষা। অবশ্য আমার ভাষার সঙ্গে অপরের ভাষার অল্পবিস্তর প্রভেদ আছে। সে কারণ যদি আমার ভাষার পৃথক নামকরণ করতে হয়, তা হলে কোন ভাষাকেই আর বাঙলা ভাষা বলা চলে না। লেখার কথা ছেড়ে দিন, যদি মন দিয়ে পাঁচ জন বাঙালির মুখের কথা শোনেন, তা হলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে এক জন বাঙালির মুখের ভাষা আর-এক জন বাঙালির মুখের ভাষা যমজ নয়। তা সত্ত্বেও বাঙলা ভাষা বলে একটা ভাষা আছে, যেমন দুটি বাঙালির চেহারা ঠিক এক নয়, তা সত্ত্বেও বাঙালি জাতি বলে একটা জাতি আছে।
কেন যে আমার ভাষাকে লোকে বীরবলী ভাষা বলে, তা আমি সম্পূর্ণ জানি। পৃথিবীতে এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা একটা নাম না পেলে কোন জিনিসই বুঝতে পারে না। বোঝা তো মাথায় থাক, চিনতেও পারে না। এই শ্রেণীর লোকেরাই সব নতুন জিনিসের নূতন নামকরণ করতে সদাই ব্যস্ত। আর এই নামকরণের ব্যবসা যে সমাজে চলে, তার কারণ ছোট ছেলেরা যেমন চুষিকাঠি পেলে খুশি হয়, লোকসমাজও তেমনি 'নাম' পেলেই খুশি হয়। ঐ নাম চুষেই তারা সাহিত্যরস আস্বাদন করে। ইতিহাসের কাছে জানা যায় যে, কালের গতিকে মানুষের আর যে-ব্যবসাই থাক আর যাক, খেলনার ব্যবসা কখনও যায়নি ও কখনও যাবে না। যা চিরকাল আছে, তা নিশ্চয়ই চিরকাল থাকবে। কাশীর বৌদ্ধধর্ম গত হয়েছে, কিন্তু কাশীর খেলনা আজও বাজারে সমান কাটছে।
আমাদের দেশের দর্শনশাস্ত্র দুটি কথার উপর
গড়ে উঠেছে। সে দুটি কথা হচ্ছে 'নাম' ও 'রূপ'। সংস্কৃত ভাষার ও-দুটি শব্দের যা-ই মানে হোক
না কেন, বাঙলা ভাষার ও দু-কথার মানে স্পষ্ট। 'নাম' হচ্ছে যা কানে শোনা যায়, আর 'রূপ' হচ্ছে যা চোখে দেখা যায়। এই চক্ষু-কর্ণের বিবাদের নামই হচ্ছে দর্শনশাস্ত্রের
বিচার। আর এ বিবাদ যে কত কাল
ধরে কত সরবে চলেছিল। তার পরিচয় যাঁরা নিতে চান, তাঁরা সর্বাস্তিবাদ
থেকে শুরু করে সর্বনাস্তিবাদ পর্যন্ত আদ্যোপান্ত দর্শনশাস্ত্র একাগ্রচিত্তে আলোচনা
করুন। তারপর তাঁরা দেখতে
পাবেন যে তাঁরা গোড়ায় যেখানে ছিলেন, শেষেও সেইখানে আছেন, লাভের মধ্যে এ দীর্ঘ আলোচনার ফলে তাঁদের মাথার কালো চুল সাদা
হয়ে গিয়েছে। এ বিবাদ যে কস্মিনকালে মেটেনি, তার কারণ তা মিটতে
পারে না। 'নাম' ও 'রূপ' জিনিস-দুটি শুধু বিভিন্ন
নয়, পরস্পর পরস্পরের সম্পূর্ণ বিরোধী। যাঁরা 'নাম' শুনেই নিশ্চিন্ত হন, তাঁরা 'রূপ' কখনও চোখে দেখতে পান না, কেননা দেখতে চান না। অপর পক্ষে রূপ যাদের
চোখে পড়ে না, তাঁরাই হন নামভক্ত। আমার এ মত যদি ঠিক হয়, তা হলে আমি নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি যে, বীরবলী ভাষা বলে কোন ভাষা নেই, কিন্তু বীরবলী ঢং বলে একটা জিনিস আছে। আমার লেখার যে-গুণে পাঠকরা সে লেখার প্রতি
অনুরক্ত ও বিরক্ত— সে গুণ হচ্ছে তার রূপ। ইংরাজি ভাষায় তার
নাম হচ্ছে manner অথবা mannerism। আমার কথার ভিতর আর যে-রসই থাক, একটি রস নেই, এবং সে রসের নাম ভক্তিরস। এখন জিজ্ঞাসা করি, যে-লেখকের বাণীকে আমি সকল মন দিয়ে ভক্তি করি— অর্থাৎ যাঁর প্রতিভার প্রতি আমার পরাপ্রীতি আছে,— তাঁর কাব্যের সমালোচনা কি বীরবলী ভঙ্গিতে করা সঙ্গত, না সম্ভব? আর বীরবলী, ঢং বাদ দিয়ে বীরবলের লেখার কী সার্থকতা ! এ কার্যের ভার আপনার
দেওয়া উচিত ছিল আমার alter ego প্রমথ চৌধুরীর উপর। কেননা কোন খ্যাতনামা
বঙ্গ-সাহিত্যিক তাকে 'রবিকুল ধুরন্ধর', এই উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
কিন্তু তিনিও এ কার্যে ব্ৰতী হতে সাহসী হতেন
কি না, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। তাঁর হাতে একখানা পুরনো দলিল আছে, যার থেকে তিনি মনে করেন যে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের সংক্ষিপ্ত
সমালোচনা করবার অধিকার তাঁর কোন অনুরক্ত ভক্তের নেই। বত্রিশ বৎসর পূৰ্ব্বে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জনৈক
বন্ধুকে লেখেন যে— "আপনার সমালোচনার কথাটা
শুনে আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হয়েছে। সংক্ষিপ্ত সমালোচনার একটা ডেফিনিশন তৈরি করেছি,— যে সমালোচনা সম্যক্রূপে ক্ষিপ্ত হলে গ্রন্থকারকে সম্যক্রূপে ক্ষিপ্ত
করে তোলে,
তাকেই বলে সংক্ষিপ্ত সমালোচনা।"
রবীন্দ্রনাথের কোন অনুরক্ত ভক্ত যদি তাঁর কাব্যের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা করতে উদ্যত হন তা হলে উপরোক্ত কথা কটি শুনলে তাঁর হৃৎকম্প উপস্থিত হয় কি না, বলুন তো ?
রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ও-কথা কটি রসিকতাচ্ছলে বলেছেন। কিন্তু রসিকতার ভিতর যে সত্য কথা থাকতে পারে না, এমন কথা আর যার মুখ দিয়েই বেরুক, আমার মুখ দিয়ে কখনও বেরুবে না।
একবার ভেবে দেখুন তো, রবীন্দ্রনাথের গদ্য সাহিত্য বলতে কী বোঝায় ? সাহিত্যের কোন বিশেষ অংশ নয়, সমগ্র সাহিত্য তার গদ্যের দখলে রয়েছে। নাটক, নভেল, প্রহসন, ছোটগল্প, জীবনচরিত, ভ্রমণবৃত্তান্ত, খেয়াল সাহিত্য, সমালোচনা, ধর্মনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ তাঁর হাত দিয়ে আজীবন অনর্গল বেরিয়েছে, এমনকী prosody, philology-ও তাঁর হাত এড়িয়ে যায়নি। আর তাঁর প্রতিভা যে-বস্তুকেই স্পর্শ করেছে, তাকেই জীবন্ত করেছে। আমি যখন রবীন্দ্রনাথের এই জগৎজোড়া মনের কথা ভাবি, তখন Faust-এর কথা চুরি করে বলতে ইচ্ছা যায়— 'Infinite Nature, where shall I grasp thee.'
শুনতে পাই যে চীন দেশীয় লেখকেরা একটি পত্রকে একটি ছত্রে, এবং একটি ছত্রকে একটি পদে সংহত করবার কৌশল জানেন। বাঙলা দেশের লেখকদের রচনারীতি ঠিক এর বিপরীত। একটুখানি কথাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে যিনি যত বড় করতে পারেন, তিনি তত বড় লেখক। তাই শকুন্তলা-তত্ত্ব ওজনে শকুন্তলার চাইতে দশ গুণ ভারি— আর সে তত্ত্বের লেখকও সাহিত্যিক হিসেবে মহা ভারিক্কে বলে গণ্য। আমার অবশ্য অস্তরে ততটা সাহিত্যিক গ্যাস নেই, যার কৃপায় মনোজগতে ওরূপ বেলুন ওড়াতে পারি। অপর পক্ষে, কী আমার, কী প্রমথ চৌধুরীর, রচনারীতির চৈনিক হিক্মতও জানা নেই। ফলে রবীন্দ্রনাথের গদ্য সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা আমাদেরও কারও কলম থেকে বেরুবে না।
আপনি যে আমার স্কন্ধে উক্ত ভার ভুল করে চাপিয়েছেন, সে কথাটা বোধ হয় এত ক্ষণে বুঝতে পেরেছেন। এ ভুল যে আপনি কেন করেছেন তা আমি জানি। আপনি চেয়েছিলেন প্রথমত আমার একটি লেখা এবং দ্বিতীয়ত রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আর-একটি লেখা। এই দুটি ইচ্ছার যোগ দিয়ে যে-ইচ্ছাটি তৈরি হয়েছিল, আপনার অনুরোধটি হচ্ছে সেই যুক্ত ইচ্ছাটিরই বাহ্য প্রকাশ। আপনার মনে এ দুটি স্বতন্ত্র ইচ্ছার কী করে যোগাযোগ ঘটেছে, তা-ও আমি আন্দাজ করতে পারি।
দশ বৎসর পূর্বে বাঙলায় 'বস্তুতন্ত্রতা' কথাটা নিয়ে একটা হুজুগ ওঠে এবং অনেক পণ্ডিত সাহিত্যিক তৎকালে এই বলে গৌড়ীয় রীতিতে চিৎকার করতে আরম্ভ করেন যে, রবীন্দ্রনাথের লেখায় বস্তুতন্ত্রতা নেই। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্বোল্লিখিত বন্ধুটিকে লেখেন যে— "আমার পালা ত প্রায় শেষ করিবার সময় হইল— এখন বকশিষ পাই আর নাই পাই আপনাদের সকলকে সেলাম করিয়া এবারকার সভা হইতে বিদায় লইব। সকল শ্রোতার মধ্যে একটি শ্রোতা অদৃশ্য হইয়া বসিয়া আছেন, তিনি যদি খুসি হইয়া থাকেন ত নিত্যকালের কাছে আমার দাবী রহিয়া গেল— কোনো প্রচণ্ড পণ্ডিত বা কোনো দাম্ভিক মূর্খ তাহা মারিতে পারিবে না।"
'আমার পালা ত প্রায় শেষ করিবার সময় হইল'— রবীন্দ্রনাথের সে কালের এ ধারণাটি যে অলীক তার প্রমাণ, এ চিঠি লেখবার পরেই তিনি পদ্যে 'বলাকা' ও গদ্যে 'ঘরে বাইরে' লিখেছেন। তাঁর পালা শেষ করবার সময় দশ বৎসর পূর্বেও আসেনি, আজও আসেনি, আশা করি আর দশ বৎসর পরেও আসবে না।
তারপর তিনি যে-অদৃশ্য শ্রোতাটির কথা বলেছেন, যিনি খুশি হলে নিত্য কালের কাছে তাঁর দাবি রয়ে যাবে, সে অদৃশ্য শ্রোতাটি ভৌতিক জগতের কোন অজানা দেশে বসে নেই, কিন্তু তিনি বসে আছেন প্রত্যেক যথার্থ শ্রোতার অন্তরে। আর আবহমানকাল শ্রোতা-পরম্পরার অন্তরে সে শ্রোতাটি অদৃশ্য ভাবে অধিষ্ঠান করবেন এবং রবীন্দ্রনাথের বাণী শুনে তিনি নিত্যকাল খুশি হবেন।
প্রচণ্ড পণ্ডিত ও দাম্ভিক মুর্খেরা যে তাহা মারিতে পারবে না, এ কথা এতই সত্য যে তা বলাই বাহুল্য। ও-জাতীয় বীরপুরুষরা যদিচ কিছুই মারতে পারে না, তা হলেও জীবনে ও মনে যা কিছু সত্য ও সুন্দর, তাকে মারতে তারা নিয়ত ঘোর চেষ্টা করে। বোধ হয় তাদের স্বধর্মমত হচ্চে এই, ফলে তাদের কদাচন অধিকার না থাকলেও কর্মে তো আছে।
মরুকগে ফল, সকলেরই সকল কর্মে যে অধিকার আছে, এমন কথা আর যে-শাস্ত্রেই বলুক, গীতায় বলে না। এ মতটা হচ্চে একেলে ডিমোক্রাটিক এবং এই ডিমোক্রাটিক যুগে এ হেন কথার প্রতিবাদ করা কঠিন। তবে সত্যের খাতিরে এ কথাটা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্চি যে কাউকে প্রচণ্ড ভাবে ও দাম্ভিকতা সহকারে অনধিকারচর্চা করতে দেখলে আমার হাসিও পায়, বিরক্তিও ধরে। এই হাসি, এই বিরক্তিই হচ্চে বীরবলী লেখার প্রাণ। এই বিরক্ত হাসি হচ্চে এক রকম সাহিত্যিক অস্ত্র। সে অস্ত্র যার গায়ে পড়ে, তার পাণ্ডিত্য ও মূর্খতা অক্ষুণ্ণ থাকলেও তার প্রচণ্ডতা ও দাম্ভিকতা কতক পরিমাণে নিস্তেজ হয়।
আপনার জানা আছে যে, রবীন্দ্রনাথের কাব্যের আততায়ীদের দেহে এ অস্ত্র নিক্ষেপ করতে আমি কখনও কুষ্ঠিত হই না। আপনার পূর্বোক্ত ইচ্ছাদ্বয়ের সংপ্লবের অন্তর্নিহিত কারণ হচ্চে আপনার এই পূর্বজ্ঞান। যাঁরা রবীন্দ্রনাথের বাণীযজ্ঞের বিঘ্নকারী, যে-অস্ত্র দিয়ে তাঁদের উপদ্রব শান্ত করা যায়, সেই অস্ত্র কি ইচ্ছামতো বীণাযন্ত্রে পরিণত করা যায় ? বীণার তার অবশ্য লোকের গায়ে ফোটানো যায় অর্থাৎ সে তারকে ছুঁচ করা যায়; কিন্তু ছুঁচকে বীণার তার কিছুতেই করা যায় না। আমার মতে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের আলোচনা তিনিই করতে পারেন, যিনি সাহিত্যে বীণার আলাপ করতে জানেন। বীরবলের 'অঙ্গুলি বীণাগুণে তরল' নয়।
বীরবলের কথা ছেড়ে দিন, আমার বিশ্বাস প্রচণ্ড পণ্ডিত ও দাম্ভিক মূর্খ ব্যতীত বাঙলার কোন সাহিত্যিকই রবীন্দ্রনাথের সমালোচক হতে পারেন না। কারণ আমরা পদ্যই লিখি আর গদ্যই লিখি, আমরা সকলেই রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ না করি, তাকে সকলেই অনুসরণ করছি। প্রথমত, ভাষার কথাটাই ধরা যাক। আমি এ যুগের এমন কোন কবিকে জানিনে, যিনি হেম-নবীনের ভাষাতে কবিতা লেখেন। অপর পক্ষে আমি এমন কোন গদ্য-লেখককেও জানিনে, যিনি বিদ্যাসাগরী অথবা বঙ্কিমী ভাষায় গদ্য লেখেন। এর কারণ, ভাষার রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের মুক্তি দিয়েছেন। সে মুক্তিলাভ করে আমরা তার সদ্ব্যবহার করি কি অসদ্ব্যবহার করি, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আমাদের মনের শক্তি ও চরিত্রের উপর। সে যা-ই হোক, রবীন্দ্রনাথের দৌলতে আমরা যে বাঙলা ভাষার স্বরাজ্য লাভ করেছি, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। শুধু তা-ই নয়, বাঙলার নব কবিদের কণ্ঠে নুতন সুর ও নুতন ছন্দ রবীন্দ্রনাথই দান করেছেন। আর আমাদের গদ্য-লেখকদের বুকে ও মুখে নূতন প্রাণ ও নূতন স্ফূর্তি তিনিই এনে দিয়েছেন। আমাদের পক্ষে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার অর্থ আত্মবিচার। আমরা যদি মনশ্চক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারি যে, আমাদের মন ও ভাষার উপর রবীন্দ্রনাথের মন ও ভাষার একটা প্রভাব আছে, আর সেই আবিষ্কৃত সত্য স্পষ্ট করে বলতে পারি, তা হলে তা-ই হবে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের যথার্থ সমালোচনা। রবীন্দ্রনাথের এ জাতীয় সমালোচনা করবার অধিকার আমার আছে এবং ভবিষ্যতে তা করবার ইচ্ছাও আছে। অবশ্য সে সমালোচনা পড়ে অনেকে বলবেন, এ তো রবীন্দ্রনাথের আলোচনা নয়, বীরবলের আত্মকথা। যে-ব্যক্তি নিজের মন জানে, সে-ই জানে যে মানুষের 'স্ব' পদার্থটি কত পরপদার্থ দিয়ে গড়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই সত্য সম্বন্ধে অন্ধতাকেই লোকে 'নিজত্ব' বলে মনে করে।
আর একটি কথা। আমি পূর্বে বলেছি যে, আমরা সকলে তাঁর অনুকরণ না করি, তাঁর অনুসরণ করছি। অনুসরণ করছি বটে, কিন্তু তাঁর কত পিছনে যে পড়ে আছি, সে জ্ঞানও আমাদের থাকা প্রয়োজন, নচেত আমাদের অস্তরে দাম্ভিকতা ঢুকে যাবে। কথাটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
সংস্কৃত ভাষায় অলঙ্কারের একখানি গ্রন্থ আছে, যার নাম 'ধ্বন্যালোক'। এই নামের গুণেই আমি ও-গ্রন্থের মহাভক্ত। উক্ত গ্রন্থের রচয়িতা আনন্দবৰ্দ্ধনাচার্য ধ্বনি ও আলোক, এ দুটি শব্দ যে-অর্থেই ব্যবহার করুন না কেন, আমি ওদের সোজা মানে বুঝি, sound and light। অলঙ্কারশাস্ত্রকে কলমের এক টানে Physics-এর ভিতরে এনে ফেলাটা একটি অপূর্ব কীর্তি। জড় বৈজ্ঞানিক ইউরোপও কখনও এমন কাজ করতে সাহসী হয়নি।
এখন আমার বক্তব্য এই যে, আমাদের মতো লেখকদের পদ্যে যদি 'ধ্বনি' থাকে আর গদ্যে যদি 'আলোক' থাকে, তা হলেই আমরা পরম কৃতার্থ হই। রবীন্দ্রনাথের লেখায় যুগপৎ দুটি জিনিসই সমান থাকে।
এখন যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন যে, heat গেল কোথায় ? আমি বলব, সে বস্তু গেছে তার স্বস্থানে অর্থাৎ পলিটিকসের ভিতর, অতএব সাহিত্যের বহির্ভূত লেখায় অর্থাৎ সংবাদপত্রের ভিতর। বলা বাহুল্য যে, যার নাম পলিটিকস, তার নামই সংবাদপত্র। ওর একটির বিরহে অপরটি বাঁচে না। ওর একটি অপরটির সহমরণে যায়।
Physics আর দুটি শক্তির সন্ধান দেয়, যা আনন্দবৰ্দ্ধনের সময় আবিষ্কৃত হয়নি, যথা Electricity ও Magnetism. এ দুটি শক্তিও রবীন্দ্রনাথের লেখায় একসঙ্গে বিরাজ করছে। তাঁর গদ্য ও পদ্যের ভিতর প্রভেদ এই যে, তাঁর পদ্যে magnetism প্রধান, আর তাঁর গদ্যে Electricity.
রবীন্দ্রনাথের কোন অনুরক্ত ভক্ত যদি তাঁর কাব্যের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা করতে উদ্যত হন তা হলে উপরোক্ত কথা কটি শুনলে তাঁর হৃৎকম্প উপস্থিত হয় কি না, বলুন তো ?
রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ও-কথা কটি রসিকতাচ্ছলে বলেছেন। কিন্তু রসিকতার ভিতর যে সত্য কথা থাকতে পারে না, এমন কথা আর যার মুখ দিয়েই বেরুক, আমার মুখ দিয়ে কখনও বেরুবে না।
একবার ভেবে দেখুন তো, রবীন্দ্রনাথের গদ্য সাহিত্য বলতে কী বোঝায় ? সাহিত্যের কোন বিশেষ অংশ নয়, সমগ্র সাহিত্য তার গদ্যের দখলে রয়েছে। নাটক, নভেল, প্রহসন, ছোটগল্প, জীবনচরিত, ভ্রমণবৃত্তান্ত, খেয়াল সাহিত্য, সমালোচনা, ধর্মনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ তাঁর হাত দিয়ে আজীবন অনর্গল বেরিয়েছে, এমনকী prosody, philology-ও তাঁর হাত এড়িয়ে যায়নি। আর তাঁর প্রতিভা যে-বস্তুকেই স্পর্শ করেছে, তাকেই জীবন্ত করেছে। আমি যখন রবীন্দ্রনাথের এই জগৎজোড়া মনের কথা ভাবি, তখন Faust-এর কথা চুরি করে বলতে ইচ্ছা যায়— 'Infinite Nature, where shall I grasp thee.'
শুনতে পাই যে চীন দেশীয় লেখকেরা একটি পত্রকে একটি ছত্রে, এবং একটি ছত্রকে একটি পদে সংহত করবার কৌশল জানেন। বাঙলা দেশের লেখকদের রচনারীতি ঠিক এর বিপরীত। একটুখানি কথাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে যিনি যত বড় করতে পারেন, তিনি তত বড় লেখক। তাই শকুন্তলা-তত্ত্ব ওজনে শকুন্তলার চাইতে দশ গুণ ভারি— আর সে তত্ত্বের লেখকও সাহিত্যিক হিসেবে মহা ভারিক্কে বলে গণ্য। আমার অবশ্য অস্তরে ততটা সাহিত্যিক গ্যাস নেই, যার কৃপায় মনোজগতে ওরূপ বেলুন ওড়াতে পারি। অপর পক্ষে, কী আমার, কী প্রমথ চৌধুরীর, রচনারীতির চৈনিক হিক্মতও জানা নেই। ফলে রবীন্দ্রনাথের গদ্য সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা আমাদেরও কারও কলম থেকে বেরুবে না।
আপনি যে আমার স্কন্ধে উক্ত ভার ভুল করে চাপিয়েছেন, সে কথাটা বোধ হয় এত ক্ষণে বুঝতে পেরেছেন। এ ভুল যে আপনি কেন করেছেন তা আমি জানি। আপনি চেয়েছিলেন প্রথমত আমার একটি লেখা এবং দ্বিতীয়ত রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আর-একটি লেখা। এই দুটি ইচ্ছার যোগ দিয়ে যে-ইচ্ছাটি তৈরি হয়েছিল, আপনার অনুরোধটি হচ্ছে সেই যুক্ত ইচ্ছাটিরই বাহ্য প্রকাশ। আপনার মনে এ দুটি স্বতন্ত্র ইচ্ছার কী করে যোগাযোগ ঘটেছে, তা-ও আমি আন্দাজ করতে পারি।
দশ বৎসর পূর্বে বাঙলায় 'বস্তুতন্ত্রতা' কথাটা নিয়ে একটা হুজুগ ওঠে এবং অনেক পণ্ডিত সাহিত্যিক তৎকালে এই বলে গৌড়ীয় রীতিতে চিৎকার করতে আরম্ভ করেন যে, রবীন্দ্রনাথের লেখায় বস্তুতন্ত্রতা নেই। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্বোল্লিখিত বন্ধুটিকে লেখেন যে— "আমার পালা ত প্রায় শেষ করিবার সময় হইল— এখন বকশিষ পাই আর নাই পাই আপনাদের সকলকে সেলাম করিয়া এবারকার সভা হইতে বিদায় লইব। সকল শ্রোতার মধ্যে একটি শ্রোতা অদৃশ্য হইয়া বসিয়া আছেন, তিনি যদি খুসি হইয়া থাকেন ত নিত্যকালের কাছে আমার দাবী রহিয়া গেল— কোনো প্রচণ্ড পণ্ডিত বা কোনো দাম্ভিক মূর্খ তাহা মারিতে পারিবে না।"
'আমার পালা ত প্রায় শেষ করিবার সময় হইল'— রবীন্দ্রনাথের সে কালের এ ধারণাটি যে অলীক তার প্রমাণ, এ চিঠি লেখবার পরেই তিনি পদ্যে 'বলাকা' ও গদ্যে 'ঘরে বাইরে' লিখেছেন। তাঁর পালা শেষ করবার সময় দশ বৎসর পূর্বেও আসেনি, আজও আসেনি, আশা করি আর দশ বৎসর পরেও আসবে না।
তারপর তিনি যে-অদৃশ্য শ্রোতাটির কথা বলেছেন, যিনি খুশি হলে নিত্য কালের কাছে তাঁর দাবি রয়ে যাবে, সে অদৃশ্য শ্রোতাটি ভৌতিক জগতের কোন অজানা দেশে বসে নেই, কিন্তু তিনি বসে আছেন প্রত্যেক যথার্থ শ্রোতার অন্তরে। আর আবহমানকাল শ্রোতা-পরম্পরার অন্তরে সে শ্রোতাটি অদৃশ্য ভাবে অধিষ্ঠান করবেন এবং রবীন্দ্রনাথের বাণী শুনে তিনি নিত্যকাল খুশি হবেন।
প্রচণ্ড পণ্ডিত ও দাম্ভিক মুর্খেরা যে তাহা মারিতে পারবে না, এ কথা এতই সত্য যে তা বলাই বাহুল্য। ও-জাতীয় বীরপুরুষরা যদিচ কিছুই মারতে পারে না, তা হলেও জীবনে ও মনে যা কিছু সত্য ও সুন্দর, তাকে মারতে তারা নিয়ত ঘোর চেষ্টা করে। বোধ হয় তাদের স্বধর্মমত হচ্চে এই, ফলে তাদের কদাচন অধিকার না থাকলেও কর্মে তো আছে।
মরুকগে ফল, সকলেরই সকল কর্মে যে অধিকার আছে, এমন কথা আর যে-শাস্ত্রেই বলুক, গীতায় বলে না। এ মতটা হচ্চে একেলে ডিমোক্রাটিক এবং এই ডিমোক্রাটিক যুগে এ হেন কথার প্রতিবাদ করা কঠিন। তবে সত্যের খাতিরে এ কথাটা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্চি যে কাউকে প্রচণ্ড ভাবে ও দাম্ভিকতা সহকারে অনধিকারচর্চা করতে দেখলে আমার হাসিও পায়, বিরক্তিও ধরে। এই হাসি, এই বিরক্তিই হচ্চে বীরবলী লেখার প্রাণ। এই বিরক্ত হাসি হচ্চে এক রকম সাহিত্যিক অস্ত্র। সে অস্ত্র যার গায়ে পড়ে, তার পাণ্ডিত্য ও মূর্খতা অক্ষুণ্ণ থাকলেও তার প্রচণ্ডতা ও দাম্ভিকতা কতক পরিমাণে নিস্তেজ হয়।
আপনার জানা আছে যে, রবীন্দ্রনাথের কাব্যের আততায়ীদের দেহে এ অস্ত্র নিক্ষেপ করতে আমি কখনও কুষ্ঠিত হই না। আপনার পূর্বোক্ত ইচ্ছাদ্বয়ের সংপ্লবের অন্তর্নিহিত কারণ হচ্চে আপনার এই পূর্বজ্ঞান। যাঁরা রবীন্দ্রনাথের বাণীযজ্ঞের বিঘ্নকারী, যে-অস্ত্র দিয়ে তাঁদের উপদ্রব শান্ত করা যায়, সেই অস্ত্র কি ইচ্ছামতো বীণাযন্ত্রে পরিণত করা যায় ? বীণার তার অবশ্য লোকের গায়ে ফোটানো যায় অর্থাৎ সে তারকে ছুঁচ করা যায়; কিন্তু ছুঁচকে বীণার তার কিছুতেই করা যায় না। আমার মতে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের আলোচনা তিনিই করতে পারেন, যিনি সাহিত্যে বীণার আলাপ করতে জানেন। বীরবলের 'অঙ্গুলি বীণাগুণে তরল' নয়।
বীরবলের কথা ছেড়ে দিন, আমার বিশ্বাস প্রচণ্ড পণ্ডিত ও দাম্ভিক মূর্খ ব্যতীত বাঙলার কোন সাহিত্যিকই রবীন্দ্রনাথের সমালোচক হতে পারেন না। কারণ আমরা পদ্যই লিখি আর গদ্যই লিখি, আমরা সকলেই রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ না করি, তাকে সকলেই অনুসরণ করছি। প্রথমত, ভাষার কথাটাই ধরা যাক। আমি এ যুগের এমন কোন কবিকে জানিনে, যিনি হেম-নবীনের ভাষাতে কবিতা লেখেন। অপর পক্ষে আমি এমন কোন গদ্য-লেখককেও জানিনে, যিনি বিদ্যাসাগরী অথবা বঙ্কিমী ভাষায় গদ্য লেখেন। এর কারণ, ভাষার রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের মুক্তি দিয়েছেন। সে মুক্তিলাভ করে আমরা তার সদ্ব্যবহার করি কি অসদ্ব্যবহার করি, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আমাদের মনের শক্তি ও চরিত্রের উপর। সে যা-ই হোক, রবীন্দ্রনাথের দৌলতে আমরা যে বাঙলা ভাষার স্বরাজ্য লাভ করেছি, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। শুধু তা-ই নয়, বাঙলার নব কবিদের কণ্ঠে নুতন সুর ও নুতন ছন্দ রবীন্দ্রনাথই দান করেছেন। আর আমাদের গদ্য-লেখকদের বুকে ও মুখে নূতন প্রাণ ও নূতন স্ফূর্তি তিনিই এনে দিয়েছেন। আমাদের পক্ষে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার অর্থ আত্মবিচার। আমরা যদি মনশ্চক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারি যে, আমাদের মন ও ভাষার উপর রবীন্দ্রনাথের মন ও ভাষার একটা প্রভাব আছে, আর সেই আবিষ্কৃত সত্য স্পষ্ট করে বলতে পারি, তা হলে তা-ই হবে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের যথার্থ সমালোচনা। রবীন্দ্রনাথের এ জাতীয় সমালোচনা করবার অধিকার আমার আছে এবং ভবিষ্যতে তা করবার ইচ্ছাও আছে। অবশ্য সে সমালোচনা পড়ে অনেকে বলবেন, এ তো রবীন্দ্রনাথের আলোচনা নয়, বীরবলের আত্মকথা। যে-ব্যক্তি নিজের মন জানে, সে-ই জানে যে মানুষের 'স্ব' পদার্থটি কত পরপদার্থ দিয়ে গড়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই সত্য সম্বন্ধে অন্ধতাকেই লোকে 'নিজত্ব' বলে মনে করে।
আর একটি কথা। আমি পূর্বে বলেছি যে, আমরা সকলে তাঁর অনুকরণ না করি, তাঁর অনুসরণ করছি। অনুসরণ করছি বটে, কিন্তু তাঁর কত পিছনে যে পড়ে আছি, সে জ্ঞানও আমাদের থাকা প্রয়োজন, নচেত আমাদের অস্তরে দাম্ভিকতা ঢুকে যাবে। কথাটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
সংস্কৃত ভাষায় অলঙ্কারের একখানি গ্রন্থ আছে, যার নাম 'ধ্বন্যালোক'। এই নামের গুণেই আমি ও-গ্রন্থের মহাভক্ত। উক্ত গ্রন্থের রচয়িতা আনন্দবৰ্দ্ধনাচার্য ধ্বনি ও আলোক, এ দুটি শব্দ যে-অর্থেই ব্যবহার করুন না কেন, আমি ওদের সোজা মানে বুঝি, sound and light। অলঙ্কারশাস্ত্রকে কলমের এক টানে Physics-এর ভিতরে এনে ফেলাটা একটি অপূর্ব কীর্তি। জড় বৈজ্ঞানিক ইউরোপও কখনও এমন কাজ করতে সাহসী হয়নি।
এখন আমার বক্তব্য এই যে, আমাদের মতো লেখকদের পদ্যে যদি 'ধ্বনি' থাকে আর গদ্যে যদি 'আলোক' থাকে, তা হলেই আমরা পরম কৃতার্থ হই। রবীন্দ্রনাথের লেখায় যুগপৎ দুটি জিনিসই সমান থাকে।
এখন যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন যে, heat গেল কোথায় ? আমি বলব, সে বস্তু গেছে তার স্বস্থানে অর্থাৎ পলিটিকসের ভিতর, অতএব সাহিত্যের বহির্ভূত লেখায় অর্থাৎ সংবাদপত্রের ভিতর। বলা বাহুল্য যে, যার নাম পলিটিকস, তার নামই সংবাদপত্র। ওর একটির বিরহে অপরটি বাঁচে না। ওর একটি অপরটির সহমরণে যায়।
Physics আর দুটি শক্তির সন্ধান দেয়, যা আনন্দবৰ্দ্ধনের সময় আবিষ্কৃত হয়নি, যথা Electricity ও Magnetism. এ দুটি শক্তিও রবীন্দ্রনাথের লেখায় একসঙ্গে বিরাজ করছে। তাঁর গদ্য ও পদ্যের ভিতর প্রভেদ এই যে, তাঁর পদ্যে magnetism প্রধান, আর তাঁর গদ্যে Electricity.
সূত্র : প্রমথ চৌধুরী || অগ্রন্থিত রচনা -
১
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ওয়েবে প্রকাশের সুবিধার্থে
এমন করা।