:::: সূচীপত্র ::::
অ ভি ভা ষ ণ
১ম খণ্ড

চিঠি লিখতে বসলেই, সর্বাগ্রে তার পাঠ লিখতে হয়এ পাঠ অবশ্য নিজে রচনা করতে হয় নাতা পূর্ব থেকেই সমাজ কর্তৃক রচিত হয়ে রয়েছে, সেই বিধিবদ্ধ বাক্যসমূহ আমরা নির্বিচারে মুখস্থ করে পত্রস্থ করিএ পাঠ অবশ্য সকল ভাষায় সকল সমাজে এক নয়দেশভেদে, কালভেদে, সম্প্রদায়ভেদে, পত্রের মুখপত্র নানা আকার নানা রূপ ধারণ করে

কিন্তু এ সকলের বাহ্য আকারে যে-প্রভেদই থাকুক না কেন, সকলেরই বক্তব্য একসকলেরই উদ্দেশ্য লেখকের হীনতা ও দীনতা প্রকাশ করাযিনি যে-ভাষাই ব্যবহার করুন, যতই না কেন শ্রুতিমধুর বাক্য প্রয়োগ করুন, সকল পাঠেরই নির্গলিতাৰ্থ হচ্ছে সবিনয় নিবেদনঅর্থাৎ নিবেদনটা আসে পরে, তার আগে আসে বিনয়,— এই আশায় যে, লেখকের নিবেদনটা যদিও পাঠকের মনঃপূত না হয়, বিনয়টুকু তো হবেইবিনয় ঘুষ দিয়ে পাঠকের মেজাজ খুশ করাই এর ধর্ম

বক্তৃতা অর্থাৎ লোকসমাজে মৌখিক নিবেদনটাও এই একই নিয়মের অধীনসভা মাত্রেই সভাপতির পক্ষে প্রথমেই বিনয় প্রকাশ করাটা একটা অবশ্যকর্তব্যের ভিতর দাঁড়িয়ে গিয়েছে এবং এ কর্তব্য পালন করবার উপযুক্ত বাঁধি গতেরও সৃষ্টি হয়েছে


সভাপতিকে কার্যানঞ্চ আগে এই কথা বলে মুখ খুলতে হয় যে, তিনি সভাপতির আসন গ্রহণ করবার যোগ্য পাত্র ননআমি কিন্তু এ ক্ষেত্রে উক্ত মামুলি বিনয়ের অভিনয় করতে পরাঙ্মুখও হচ্ছে আসলে বৃথা বাক্যব্যয়যেকথা একশো বার শুনেছি, সে কথা আবার শুনলে শ্রোতার তা এক কান দিয়ে ঢুকে আর-এক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়, তার মরমে প্রবেশ করে নাযুগ-যুগ ধরে পুনরুক্তির ফলে কথা মাত্রেই কথার কথা হয়ে যায়।

তা ছাড়া এ জ্ঞান আমার আছে যে, আমার মতো সাহিত্যিকের মুখে বিনয় শোভা পায় না, শোভা পায় শুধু সাহিত্যরাজ্যের রাজারাজড়াদের মুখেএর একটি ক্লাসিক উদাহরণ দিচ্ছিকালিদাস রঘুবংশ-এর প্রথমেই লিখেছেন
মন্দঃ কবিযশঃপ্রার্থী গমিষ্যাম্যুপহাস্যতাম্
প্রাংশু-লভ্যে ফলে লোভাদ্ধাহুরিব বামনঃ

অর্থাৎ আমি মন্দ কবিযশঃপ্রার্থী হয়ে হাস্যাস্পদ হব, কেননা আমার পক্ষে এ প্রয়াস বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবার মতো

পূর্বোক্ত উক্তি হচ্ছে সাহিত্যিক বিনয়ের পরাকাষ্ঠাকিন্তু এ কথা কালিদাস কখন বলেছিলেন যখন তিনি সেকালের বিদগ্ধমণ্ডলীর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বলে গণ্য হয়েছিলেনরঘুবংশ কালিদাসের শেষ কাব্যমেঘদূত, কুমারসম্ভব ও শকুন্তলার লব্ধপ্রতিষ্ঠ রচয়িতার মুখে এ বিনয় শোভা পায়কে না জানে যে, বড়লোক দুটি হেসে কথা কইলেই আমরা মুগ্ধ হইআভিজাত্যের সঙ্গে সৌজন্যের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের কিম্বদন্তি এই কাল্পনিক ভিত্তির উপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেঅপর পক্ষে কালিদাস তাঁর প্রথম কাব্যে যে-আত্মপরিচয় দেন, তার ভিতর বিনয় নেই যদি কিছু থাকে তো আছে স্পর্ধামালবিকাগ্নিমিত্রের প্রথমেই তিনি সূত্রধারের মুখ দিয়ে সভাসদ্‌দের শুনিয়ে দিয়েছেন যে

পুরাণমিত্যেব ন সাধু সৰ্ব্বং,
ন চাপি কাব্যং নবমিত্যবদ্যম্‌
সন্তঃ পরীক্ষ্যান্যতরদ্ভজন্তে,
মূঢ়ঃ পরপ্রত্যয়নেয়বুদ্ধিঃ ।।

 অর্থাৎ কাব্য পুরনো বলেই সাধু হয় না, আর নুতন বলেই গর্হিত হয় নাসাধু ব্যক্তিরা কাব্যের নূতনত্ব প্রাচীনত্ব নয়, তার গুণাগুণ পরীক্ষা করেই তার ভজনা করেনকেবল মূঢ় ব্যক্তিরাই পরের মুখে ঝাল খায়

 কালিদাসের প্রথম বয়েসের ও তার শেষ বয়েসের উক্তি দুটির উল্লেখ করলুম এই সত্যের পরিচয় দেবার জন্যে যে, বড় লেখকের মুখে বিনয় যেমন ভূষণ, নবীন লেখকের মুখে স্পর্ধাও তেমনই অস্ত্রকিন্তু যে-নবীন লেখকও নয়, বড় লেখকও নয়, তার মুখে ও-দুইয়ের কোনটিই শোভা পায় নাযেহেতু, লেখায় আমার হাতে-খড়ি কাল হয়নি, আর আজও পাকা লেখক হয়ে উঠিনি, সে কারণ, আমার পক্ষে আমার সাহিত্যিক গুণাগুণ সম্বন্ধে নীরব থাকাই শ্রেয়তা ছাড়া যখন ভোটের প্রসাদে এ পদ লাভ করেছি, তখন আমার যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিচারসহ নয়ইলেকশন জিনিসটিই তো যোগ্যতমের উদ্বর্তনের অভ্রান্ত বিলেতি কল

আমি যে আপনাদের কাছ থেকে নিমন্ত্রণপত্র পেয়ে মহা আনন্দিত হয়েছি তার প্রমাণ, আপনাদের আহ্বানে আমি দ্বিধা না করে একটানা ন'শো মাইল পথ অতিক্রম করে এ সভায় এসে উপস্থিত হয়েছিএ রকম দেশভ্রমণ আমার পক্ষে নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা নয়। আমি আমার বন্ধু শ্রীমান দিলীপকুমার রায়ের মতো ভ্ৰাম্যমাণ নই, অপর পক্ষে হচ্ছি বাঙ্গালায় যাকে বলে কুনোলোকএমনকী, কলকাতা শহরেও, ঘর ছেড়ে সভা-সমিতিতে উপস্থিত হতে আমি স্বতই নারাজলোকচক্ষুর অন্তরালে থাকাই আমার বদ্ধমূল অভ্যাসআর এই একঘরে হয়ে থাকবার যুগসঞ্চিত অভ্যাস এখন স্বভাবে পরিণত হয়েছেতা ছাড়া আমার এখন দেহের কলকব্জা সব ঢিলে হয়ে এসেছেআমি যে এই বিকল দেহযন্ত্রটাকে ফিনফিনে গরমের দেশ থেকে কনকনে শীতের দেশে টেনে নিয়ে এসেছি, সে দিল্লির টানে নয়, প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য-সম্মিলনের টানে

এই দিল্লি শহরটার সঙ্গে আমার মনের নাড়ির কোন যোগ নেইদিল্লি সাহিত্যের রাজধানী নয়অন্তত যে-সব ভাষার সঙ্গে আমি পরিচিত, সে সব ভাষার সাহিত্যের তো নয়ইআমি যদি সাহিত্যিক না হয়ে ঐতিহাসিক হতুম, তা হলে অবশ্য এ শহরের মায়ায় চির-আবদ্ধ হয়ে পড়তুমগত হাজার বৎসরের ইতিহাস নামক ট্রাজেডি এ নগরীর পৃষ্ঠে ক্ষোদিত পাষাণের আরক্ত অক্ষরে লিখিত রয়েছেএ শহরের আবেদন লোকের কানের কাছে নয়, চোখের কাছেArcheologist-দের কাছে, অর্থাৎ যাঁরা পাষাণের পেটের কথা জানেন, তাঁদের কাছে, দিল্লি শহর একটি বিরাট প্রস্তরলিপিসে লিপি আমার কাছে আরবি ও ফার্সি হরফের মতোই অপরিচিতআমি যখনই দিল্লির সম্মুখস্থ হই, তখনই শুনতে পাই যে, এখানকার গম্বুজে, মস্‌জেদে, মিনারে, কবরে শতমুখে একটি মাত্র বাণী ঘোষণা করছে; আর সে বাণী এই— Vanity of vanities, all is vanity.


 এ বাণীর উপর এ কালের সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত নয়আমরা এ সত্যের প্রতি বিমুখ হয়েই অগ্রসর হতে চাইতাই মানুষের বিরাট অহঙ্কারের এই স্তুপীকৃত ধ্বংসাবশেষের সাক্ষাৎ পরিচয় পেয়ে আমাদের সরস্বতী ঈষৎ ক্ষুন্ন হয়ে পড়েবাঙ্গালা দেশে আমার নিজ হাতে গড়া এবং হাত-ধরা জনৈক সাহিত্যিক আছেন, যিনি এখানে এলে সম্ভবত নানাবিধ পূর্বস্মৃতিতে উত্তেজিত হয়ে উঠতেনকিন্তু তাঁকে আমি সঙ্গে আনতে পারিনিতিনি অনিমন্ত্রিত বলেতাঁর নাম হচ্ছে বীরবল

সূত্র : প্রমথ চৌধুরী || অগ্রন্থিত রচনা - ১
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেইওয়েবে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন