আহমদ আবদুল্লাহ আবু নাসের চৌধুরী— সংক্ষেপে নাসের সাহেব। পিতা-পিতামহেরা
বড় জমিদার ছিলেন। এখন জমিদারি নেই কিন্তু পাঁচিলেঘেরা জমিদার বাড়ীটা আছে। পাঁচিলের
বাইরের বিশাল দিঘিটা সংস্কারের অভাবে শীতে কাতর জরাজীর্ণ বৃদ্ধদের মতো দামদকখলের
কাঁথা মুড়ি দিয়ে বুঝিবা অতীত রোমন্থনে ধ্যানমগ্ন। দিঘিতে এখন আর ঢেউ উঠে না। কিন্তু
বাহির বাড়ীতে কাচারি ঘরের সামনের দু’সারি
দেবদারু এবং মেটে সড়ক দিয়ে দিঘির পাড়ে পড়ার মুখে দণ্ডায়মান মেহগনি গাছ দু’টোতে এখনও আগের মতো সবুজ কিশলয়ের
সমারোহ। দিঘির বাঁধানো ঘাটের দু’দিকে দুটি
করে চারটি ঝাউগাছের
শীর্ষদেশে প্রবহমাণ হাওয়ার শনশন ধ্বনি এখনও পথিককে জমিদার বাড়ীর অতীত তমতমি স্মরণ
করিয়ে দেয়। বাড়ীর বেষ্টনী পাঁচিলটার উপরে শ্যাওলা পড়েছে, ভেঙ্গে গেছে স্থানে
স্থানে এবং ভাঙ্গা স্থানগুলোতে নানা রকমের আগাছা জন্মেছে যার মধ্যে চোতরালতার
(বিছুটি) সংখ্যাই বেশী।
নাসের সাহেব এ যুগের মানুষ। কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েট ক্লাশের যখন তিনি মেধাবী ছাত্র তখন জিন্নাহ
সাহেবের আহ্বানে মুসলমান সমাজের খেদমতে নামেন। সঙ্গে সঙ্গে তার ব্রিলিয়ান্ট
ক্যারিয়ার নির্মাণ শুরু হয়। বেশিদিন ছাত্র রাজনীতি করতে হয় নি। উত্তরাধিকার সূত্রে
প্রাপ্ত আভিজাত্য তাঁর সহায় হয়। অল্পদিনের মধ্যেই রাজধানীর মান্যগণ্য ব্যক্তিদের
তালিকায় তাঁর নাম পাথরে উৎকীর্ণ ঐতিহাসিক লিপির মতো পাকাপোক্ত হয়ে যায়। নিজ এলাকায়
ত প্রতিপত্তি ছিলই। নাটমন্দির সমাধিতে পরিণত হেত দেরী লাগে। রাজশকুন যত
বুড়োই হোক তাতে কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না: আর রঞ্জিত গলাটাই রাজত্ব করে।
মাঝখানে–বাংলাদেশ–পাকিস্তান যুদ্ধের শেষের দিকে নাসের সাহেবের প্রভাব প্রতিপত্তি কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। তিনি কিছুকাল আত্মগোপন করে ছিলেন। এই দূর্বিপাকের সময়টায় তিনি ধর্মকর্মে মনোযোগ দেন। বুদ্ধিমানের সাধনা কখনও নিষ্ফল হয় না। বছর চারেকের মধ্যেই তিনি পূর্বের মানমর্যাদা এবং প্রভাব প্রতিপত্তি পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
স্বাধীন বাংলাদেশে নাসের সাহেব এখন পাকিস্তানী আমলের মতোই মর্যাদাবান আহমদ আবদুল্লাহ আবু নাসের চৌধুরী। ধর্মনিষ্ঠার অতিরিক্ত গুণেও তিনি গুণান্বিত পুত্ৰ-কন্যার রাজধানী ঢাকায় ভাগ্যোন্নয়নের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তিনি সেকালের চাকর নফরদের নিয়ে রোমাঞ্চময় নানা বাল্যস্মৃতি জড়িত মফস্বলের বাড়ীতে অবসরকাল যাপন করেন। বেগম সাহেব পুত্র-কন্যাদের ছেড়ে থাকতে চান না। তিনি মাঝে-মধ্যে এসে সপ্তাহ দু’সপ্তাহ থেকে শহরে চলে যান।
মহকুমা শহরটি মাত্র দু’মাইল দূরে। খাওয়া খাদ্য আরাম আয়েস কোনোটারই অসুবিধা হয় না। যখন ভাবের ভার ভারী বোধ হয় তখন বাইরের কাচারি ঘরে গানের জলসা বসে : গম্ভীরা মারফতী এমন কি কীর্তন গানও হয়। বহু রাত অবধি গান চলে,
বাজনা বাজে। নাসের সাহেব তাকিয়া হেলান দিয়ে ফরসি হুঁকো টানেন এবং শোনেন। দু’চার মাস অন্তর উচ্চাঙ্গ সংগীতও হয়। মহিলা পুরুষ উভয় শ্রেণীর ওস্তাদের আসেন, দু’চার দিন থাকেন, হাওরে পাখী-শিকার অভিযান চলে এবং উচ্চাঙ্গ সংগীতের সঙ্গে উচ্চ মানের খানা-পিনাও যোগ হয়। কলকাতায় থাকতে নাসের সাহেব নিজেও কিছুকাল ক্লাসিকাল মিউজিকে তালিম নিয়েছিলেন তারুণ্যের বেগ তাকে সংগীত রাজধানী লক্ষ্ণৌতেও নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে তিনি ঠুংরি খেয়াল দু’টোই রপ্ত করেন। এখন গলা নেই। কিন্তু উচ্চাঙ্গ সংগীতের একজন সোচ্চার সমঝদার তিনি।
গভীর রাত্রে কাচারি ঘরের জলসায় যখন বেহাগ বাগেশ্রী শুরু হয় তখন
নিজেকে
দমন করতে পারেন না, গায়ক গায়িকাদের সঙ্গে নিজেও গাইতে শুরু করেন। জলসা এক বাক্যে সায় দেয়, বহুত আচ্ছা ! বহুত আচ্ছা!
কিছু দিন যাবৎ কি যেন হয়েছে রাত্রে ঘুম হতে দেরী হয়। উইনকারনিস, ওয়াইন, বিয়ার, হুইস্কি প্রভৃতি প্রায় রকমের পানীয় পরিমিত মাত্রায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। কিন্তু রাত বারোটা একটার আগে কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না। কোল বালিশ চেপে শতবার এপাশ ওপাশ করেন কিন্তু ঘুমের দেখা নেই, মশারির নীচে চোখ বুজে থাকাই সার হয়।
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত। ইংরেজি মতে রাত বারটা বাজামাত্র পরবর্তী দিবস শুরু হয়। দেয়ালঘড়িতে বারটা বাজেও, কিন্তু ঘুম তখনও ডুমুরের ফুল। বহু সাধ্যসাধনা করেছেন। বুড়ী বাঁদীর উচক্কা মেয়ে রুশনীকে ডেকে এনে হাত পা গা টিপিয়েছেন। এমন কি গরম শরীর শীতল করার জন্য এক বার রুশনীকে এসতেমালও করেছেন, গোসলখানায় গিয়ে পেটে ঠাণ্ডা পানি মেখেছেন, হাতমুখ ধুয়েছেন। তবু ঘুম সাপের পার মত অদৃশ্য।
নিঝুম পল্লী মেটে-সড়ক-পথে মহকুমা শহরে যাতায়াতকারী লোকজনের চলাচল বহু আগেই বন্ধ
হয়েছে। ভাঙ্গাচোরা পাঁচালি ঘিরে বিরাজমান আগাছা ঝেঁপে ঝিঁ ঝিঁ পোকারা স্ফুলিঙ্গের মতো উড়ছে। খোলা জানাল পথে ঐ আলো দেখা যায়। এক সময় ওরাও আর ওড়ে না। পুরানো বাড়ীর কোন গুপ্ত কোটরে বসে একটা তক্ষক এক দুই তিন করে সাত বার ডেকেছিল। কয়েকটা শৃগাল একবার একযোগে কেয়া হুয়া কেয়া হুয়া করে উঠেছিল। এখন ওরাও আর ডাকে না। শিয়ালগুলো বোধ করি বাঁশ ঝাড়ের দুৰ্ভেদ্য আশ্রয়ে নিদ্রা যাচ্ছে। চৈত্রের দমকা হাওয়ায় ঝাউ গাছের পাতাগুলো সাঁ সাঁ সোঁ সোঁ বাজছিল। আকাশে বুঝিবা মেঘ করেছে। রাত্ৰিও কৃষ্ণপক্ষের,
বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে। পাতা নড়ার শব্দও নেই। রাত্রির নীরবতা সম্পূর্ণ। নাসের সাহেবের নিঃসঙ্গতাও আকাশের শূন্যতার মতো পরিপূর্ণ। দেয়ালঘড়ির পেণ্ডুলামটাই শুধু টিকটিক করে চোখ বন্ধ ঘানির বলদের মতো নিদিষ্ট সীমার মধ্যে দুলছে। সহসা মনে হয়, নিঃশব্দ ও নিঃসঙ্গতার বেবাহা অরণ্যে ঘড়িটা একটা অসহ্য অসংগতি। ওটাকে আছাড় মেরে গুঁড়িয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে তাঁর।
এমন সময়ে ছাদের কার্নিশে বসে একটা পেচক কুউ কুউ ডাকে। মনে হয় শব্দটা যেন কুয়োর ভিতর থেকে আসছে। ডরভয় কাকে বলে নাসের সাহেব জানেন না। তিনি নিজেই ত চল্লিশ বৎসর ধরে এ-এলাকার মূর্তিমান ভীতি।
কু পাখীটা আবারও ডাকে। নাসের সাহেবের গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। চোখে বুঁজেও বুঝতে পারেন, মাথার চুল হতে পা’এর গোড়ালি পর্যন্ত প্রতিটি লোম সজারুর কাঁটার কতো খাড়া হয়ে উঠেছে।
পেচকটা থামতেই নৈশ নৈঃশব্দ বিদীর্ণ করে মেটে-সড়ক হতে নারীকণ্ঠে গম্ভীর ধ্বনি ভেসে আসে : গোশ্ত ! গোশ্ত লইবাহন গো গোশ্ত ।
দেয়ালঘড়িতে একটা বাজার ধ্বনি হয়। অত্যন্ত সংগতিহীন ধ্বনি। ঘোর অন্ধকার এ নিশীথে গোশত ফেরি করছে কে এ নারী ? ভীতিটা চাবুক হয়ে তাঁর গায়ে ঘা মারল। আচম্বিত এ-আঘাত সামলাতে না সামলাতেই আবার সেই ভয়াবহ শব্দ, গোশ্ত। তিনি শুনতে পান ঐ নিশাচর নারী যেন তার বাড়ীর চারদিক প্রদক্ষিণ করছে এবং থেকে থেকে হাকছে, গোশ্ত! গোশ্ত! গোশ্ত!
শরীর কাঁপে। ভিতরে কোথাও যেন একটা কাঁপুনিকল বসানো আছে। সেটা তাঁকে কেবলই কাঁপাচ্ছে, শরীর হতে সমানে ঘাম বেরোচ্ছে, উপরে বিজলী পাখা অবিরত ঘুরছে, কিন্তু ঘাম নিবারণ হচ্ছে না। পানি পিপাসা ভয়ানক, রুশনী নীচে মাদুর পেতে ঘুমোচ্ছে, ডাকলেই সুরাহির ঠাণ্ডা পানি এনে দেয়, কিন্তু কণ্ঠস্বর বেরোচ্ছে না : ভালোই, ঐ নারী শুনতে পেয়ে যদি ডাক দেয়, তাহলে সর্বনাশ। জানালায় এক ইঞ্চি মোটা শিক, তবু নিরাপত্তাবোধ করতে পারেন না নাসের সাহেব। কোনোক্রমে খাট হতে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে জানালার কাঠের পাল্লা বন্ধ করে দেন। কিন্তু কাঠের পাল্লা এয়ারটাইট হয় না, ফাঁক দিয়ে ঐ ভয়াবহ ধ্বনি ভিতরে প্রবেশ করেই। তিনি তখন নির্জীব ক্লীব। এমন সময় স্মরণশক্তিটা ফিরে আসে। তাঁর শিয়রে বালিশের নীচে গুলিভরা রিভলভার। তাছাড়া এস এল আর, রাইফেল, দোনলা একনলা বন্দুক, খড়গ, রাম দা, তলোয়ার প্রভৃতি মিলিয়ে বাড়ীটা রীতিমতো আরসেনাল। পাশের গরাদ ঘেরা মালগুদামের দেয়ালে ওগুলো ঝুলছে । এসব অস্ত্রের কিছু উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বাকী এক্সজামপ্লারী কারেজ এর গ্যালেন্ট্রির জন্য ১৯৭১ সালে পাক সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রদত্ত পুরস্কার। মালগুদামের চাবিও তাঁর পায়ের তলায় তোশক এবং জাজিমের মাঝখানে।
তাঁর লক্ষ্য কখনও ভ্ৰষ্ট হয় না। একটি মাত্র গুলিতে ঐ নিশাচরী গোশত ফেরিয়ালীকে স্তর করে দেয়া যায়। কিন্তু তার আগে যে দরজা খুলে বাইরে যেতে হচ্ছে, বাউণ্ডারি ওয়াল পেরিয়ে মেটে-সড়কে পড়ে নিশান সই করতে হবে। ওঠার শক্তি নেই, বলতাকত সব গেছে। কামরার এক কোণে সোরাহিভর্তি পানি। হামাগুড়ি দিয়ে ওখানে যেতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। পানি খাওয়ার সময়ও শুনতে পান নারীকষ্ঠের সেই ভয়াবহ ধ্বনি, গোশত! গোশত! গোশত! তাঁর সমস্ত বলশক্তি খাঁচার ভিতরে সেধিয়ে যায়। রিভলভার, রাইফেল, বন্দুক কোনোটাই হাতে নিতে পারেন না। আত্মরক্ষায় অক্ষম নাসের সাহেব একটা দুর্বোধ্য ধ্বনি তুলে মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়েন।
এক সময়ে শ্বেত মর্মরের মেঝেটা বড়ড শক্ত এবং ঠাণ্ড বোধ হয়। চোখ কচলাতে কচলাতে চেয়ে দেখেন বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যালোকের লম্বা চঞ্চু এসে মেঝেটাকে ঠোকরাচ্ছে।
রাত্রির ঘটনাটা মনে পড়ে। স্বপ্ন না বাস্তব ঘটনা কিছুই ঠাহর করতে পারেন না। যাই হোক রাত্রির ভীরুতার কথা স্মরণ করে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। সামনে অন্য কাউকে না পাওয়ায় সম্পূর্ণ ক্রোধটা গিয়ে পড়ে নিদ্রিত রুশনির উপর। তার পাছায় লাথি মেরে হুঙ্কার দেন, হারামজাদী ওঠ্।
প্রাতঃকৃত্য এবং পাক গোসল সেরে মুসল্লম, পরাটা, পনির এবং মর্তমান কলায় নাস্তা করার সময় রাত্রের ঘটনাটা আবার মনে পড়ে। কিছুক্ষণ গভীরভাবে ভাবেন। তারপর দু’হাতে তালি বাজিয়ে হাঁক দেন, কোই হ্যায়!
খাস খাদেম আবদুল উপস্থিতি হয়, আভূমি প্রণত হয়ে বলে, হুজুর।
নাসের সাহেব তার হাতে এক তাড়া নোট দিয়ে দিয়ে বলেন, শহরে যা, তিন চাঙারি জিলেপি, তিন চাঙারি নিমকি আর এক চাঙারি বুন্দা নিয়ে আয়। আমি জুমার নামাজে যাওয়ার আগে ওগুলো মসজিদে পৌঁছে দিবি।
দেখতে দেখতে সপ্তাহ চলে যায়। আবার বৃহস্পতিবার আসে, রাত হয়। নাসের সাহেব সে রাত্রে আগেভাগে খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়েন। বাঁদী রুশনী যথারীতি তার হাত-পা টিপে দেয়ার পর মেঝেয় মাদুর পেতে শোয়। দিন রাত্রির একটানা খাটুনির পর সে অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। আশ্চর্য! বেগম সাহেবেরও নাক ডাকে এই মেয়েটারও নাক ডাকে। নাক ডাকানি তাঁর কাছে অসহ্য। এজন্য তিনি বহুদিন যাবৎ স্ত্রীর সঙ্গে এক শয্যায় শোন না। ইচ্ছে করে রুশনীকে লাথি মেরে ঘর হতে বের করে দেন। কিন্তু তাহলে ত প্রাণহীন আসবাব ছাড়া ঘরে তাকে সঙ্গে দেয়ার জন্য কেউ থাকবে না। যদি সেই গোশত ফেরিয়ালী আজ রাতেও আসে। সেদিনও ছিল বৃহস্পতিবার রাত। চিন্তাটা উদয় হতেই তিনি কোলবালিশ চেপে প্রাণপণে ঘুমোবার চেষ্টা করেন। এক হতে এক শ’র সংখ্যা পর্যন্ত গণনা করেন, ঘুম আসে না। শতবার আল্লাহর নাম জপেন, ঘুম আসে না। কলমা তৈয়ব পড়েন, ঘুম আসে না। ইয়াসিন সুরা মুখস্থ না করার গাফিলতির বিষয়টা স্মরণ করে নিজের প্রতি ক্ষুব্ধ হন। ঘুম! ঘুম! ঘুম! কিন্তু ঘুম নেই।
দেয়ালঘড়িতে বারটা বাজল। সঙ্গে সঙ্গে সেই নারীকণ্ঠ, গোশত ! গোশত লইবানগো ! গোশত! পেঁচাটাও ডাকতে শুরু করে কু! কু! ফেরিআলী আজ আরো নিকটে–
মেটে সড়ক ছেড়েছে । দিঘির ঘাটলা হতে শব্দ আসছে গোশত! গোশত! তার পর আরো আরো নিকটে– সদর দরজা পেরিয়ে বাড়ীর ভিতরে ঢুকল বুঝি! সর্বনাশ বাড়ীর উঠান হতেই মেঘমন্দ্র ধ্বনি হচ্ছে, গোশত! গোশত!
শয্যায় এপাশ ওপাশ করাও বন্ধ হয়ে যায়। শ্বাস প্রশ্বাসের সামান্য ধ্বনিও বিপজ্জনক। পরিত্যক্ত গোরস্তানের নীরবতার মতো পূর্ণ নীরবতাই একমাত্র নিরাপত্তা। অথচ রুশনী আগের মতোই নাক ডাকাচ্ছে। কেন যে ঐ খানকীটাকে
ঘরে জায়গা দিয়েছিলেন? মাগীটাকে লাথি মারতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আচমকা আঘাতে যদি সে কেঁদে ওঠে, যদি ঘরে মানুষ আছে জেনে ফেরিআলী দরজায় ধাক্কা দিয়ে হাঁকে, গোশত! সর্বনাশ! না, না, নিঃশব্দ নীরবতাই ভালো।
তাঁর লাল তাজী গোড়াটা আস্তাবলে চিঁহিহি করে আপন অস্তিত্ব ঘোষণা করে। দিঘির অপর পাড়ে খানেজাদদের বস্তি। সেখান থেকে ঢোল করতালের বাজনার সাথে মেয়েলী । গানের একটা পঙক্তি ভেসে আসে, জামাইর মাগো করুণা, হলদিগিলা বাইটনা, চাম্পা ফুলের গন্ধে জামাই
আইব আনন্দে। সিনেমার পর্দায় বিলীয়মান দৃশ্যের মতো ফেরিআলীর গোশত, গোশত হাঁকও ক্রমে ক্রমে দূরে সরে যায়। বিভীষিকার রেশটা কিছুক্ষণ ধরে তাঁর কান দুটোকে পীড়া দেয়।
পরদিন জুমার আগে তিনি তাঁর জানের সদকারূপে একটা ষাঁড় আল্লাহর নামে ছেড়ে দেন। গরুটা কিছুক্ষণ মাটিতে শিং ধারায়, তারপর মানুষের আখ খেত বুট খেত পয়মাল করতে করতে লক্ষ্যহীন ছোটে। নাসের সাহেব মনকে শক্ত করেন। আর নয়, সাহস তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সাহস তাঁকে দেখাতেই হবে।
তৃতীয় বৃহস্পতিবার বিকেলে শহর থেকে কিছু ইয়ার বন্ধু আসে। গান বাজনাও হয় কিছুক্ষণ ঠুংরি তালের হালকা রসের গান নাসের সাহেবের দেহমান নাচন জাগায়।
সংগীতের পর পানাহার। নাসের সাহেব নিজেও তাঁর দৈনদিন রেশন দু’পেগের চেয়ে অনেক বেশি পান করেন। মনে হয়, প্রথম জীবনের বেপরোয়া ভাবটি আবার ফিরে এসেছে। রাত এগারটা নাগাদ নিমন্ত্রিতরা বিদায় হয়। তিনি চলে যান সোজাসোজি তাঁর শয়নকক্ষে। মনটা কাঁচের মতো সাদা–দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনাহীন, দেহের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে তানপুরার আলাপ। রুশনী যথারীতি তার সেবা করতে আসে কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই তাকে হুকুম দেন, তুই যা! আমি আজ ঘুমোব। রুশনী মুক্তির আনন্দ চেপে ঘর ছেড়ে চলে যায়। বহুদিন পরে সে আজ তার স্বামীর সঙ্গে শোয়ার সুযোগ পেল।
নাসের সাহেব দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েন। মস্তিকটি মানুষকে কখন কি নির্দেশ দেয় এক সেকেণ্ড আগেও তা জানার উপায় নেই। নাক ডাকতে শুরু করলে ঘুম আসে, নাকি ঘুমিয়ে পড়লে নাক ডাকে সরেজমিনে পরীক্ষা করে এ-বিষয়ে প্রকৃত সত্য নির্ণয়ের ইচ্ছে হয় তাঁর। এবং ইচ্ছেটা জাগতেই তিনি সজোরে নাক ডাকতে শুরু করেন। দাঁড় বাওয়ার তাল ওঠে, বুঝতে পারেন, জেগে থেকেও বেশ উদারা থেকে মুদারা পেরিয়ে তারায় উঠছে এবং তারা থেকে মুদারা হয়ে পুনরায় উদারায় নামছে। ফাইন মনে হয়, ঘুম চোখ ধর ধর করছে—পাখীর পালকের স্পর্শের মতো তার নরম স্পর্শ একটু একটু লাগছে—আরো একটু আরো একটু-হিজিবিজি মত অস্পষ্টতা সামনে—তারপরেই নিঃশব্দ অচৈতন্য।
পরম সুখের এ-সময়টায় কুলক্ষণে কু পাখীরা পাঁচিলের কাছের তেঁতুল গাছটায় বসে ডাক শুরু করে কুউ কুউ। মনে হয়, তাঁর মাথায় যেন সহসা একটা লাঠির বাড়ী পড়ল। তিনবার তিনটে ভয়াবহ ধ্বনি। জটিল ব্যাধিগ্রস্ত রোগীর আর্তনাদের মতো শোনায় সে ধ্বনি। নিদ্রার রেশমী আবেশ টুটে যায় এবং ঠিক ঐ সময়েই হিসেরের ঘন্টার মত অন্দর বাড়ীর উঠোনে সেই ভয়াল কণ্ঠধনি, গোশত! কোনো সন্দেহ নেই, মানুষের কণ্ঠস্বর। মানুষটা নারী তাতেও সন্দেহ নেই। মাঝখানে বছর তিন চারেকের বিশৃঙ্খল দিনগুলো বাদ দিলে নাসের সাহেব জীবনে কখনও মানুষের ভয়ে হাত পা গুটিয়ে অন্দরে আশ্রয় নেন নি। মানুষ বেয়াড় বেতমিজ হয়ে উঠলে তিনি বল প্রয়োগ করে পোষ মানিয়েছেন। পোষা হাতি বাড়ীতেই ছিল। ঘরে এতগুলো অস্ত্ৰ, ভয় কি!
হুইস্কির ক্রিয়াটাও তখনও মস্তিস্কে ছিল।
তিনি নিঃশব্দে শয্যাত্যাগ করেন। ঘরে নীল বাতি জ্বলছে। রিভলভারটা এক হাতে নিয়ে অন্য হাতে কপাটের হুড়কোটা খুলতেই ক্যাচ শব্দ হয়। ঐ শব্দে শিকার সাবধান হয়ে যেতে পারে ভেবে নাসের সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হন। নিঃশব্দ ক্রোধটা গিয়ে পড়ে সেকালের ছুতোর মিস্ত্রীদের উপর। ওরা নেই কিন্তু ওদের আনাড়িপনা এখনও আছে। এমন সময় বাইরে আবার হাঁক শোনা যায়, গোশত! গোশত! মেঘমন্দ্র ঐ ধ্বনি অতি নিকটে অথচ মনে হয়, মানুষের হয়েও যেন ও কণ্ঠস্বর মানুষের অস্থিপাঁজর ভেদ করে আসছে না, আসছে কোন পর্বতগুহ্য হতে। ইসরাফিলের শিঙ্গা এমন করেই বাজবে কিনা কে জানে। সহসা ঐ বিধ্বংসী ফেরেশতার নাম মনে পড়ে কেন ? নিজের প্রতি ধিক্কার জন্মে। শেক্সপিয়ারকে মনে পড়ে, কাওয়ার্ডস ডাই মেনি টাইমস বিফোর দেয়ার ডেথস। দ্যা ভ্যালিয়েন্ট নেভার টেস্ট অব্ ডেথ বাট ওয়ান্স। তিনি আজীবন সৈনিকের সাহস এবং বৈমানিকের নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন। সে-সব স্মৃতি তাঁকে সাহস দেয়। হোক আওয়াজ। জোর আওয়াজে দরজা খুলে চৌকাঠের উপর দাঁড়িয়ে রিভলভার তাক করে প্রচণ্ড ধমক দেন, কে তুই মাগী, রাত দুপুরে গোশত ফেরি করতে বেরিয়েছিস?
কিন্তু একি সামনে মানুষ কৈ ? নারীদেহের ছায়ামাত্র। ছায়াটাই যেন কায়া হয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে। তার মাথায় লালসালু কাপড়ে ঢাকা এক প্রকাণ্ড খাঞ্চা। গায়ে হলুদের দিন ও রকম সরপোশে ঢাকা ঝালরযুক্ত খাঞ্চা কনের বাড়ী পাঠায় বরপক্ষ। ও-রকম সরপোশে ঢেকেই খাঞ্চ-ভরা খানা আনে দু’লার জন্য।
ইতস্ততঃ করার সময় নয়। ঐ ছায়াটাকে লক্ষ্য করেই তিনি রিভলভার ছোঁড়েন, বলেন, যা খবিস জাহান্নামে যা, ফী নারে জাহান্নামা খালেদানা ফীহা।
কিন্তু কি আশ্চর্য। রিভলভারটা কি বোবা হয়ে গেল? কোনো শব্দ নেই। নাসের সাহেব আবারও গুলী ছোঁড়েন কিন্তু আওয়াজ হয় না, তবে কি গুলী বেরুচ্ছে না ? কিন্তু কেন? পাকিস্তানী আর্মির প্রেজেন্ট এ-রিভলভার বহুবার লক্ষ্য ভেদ করেছে। পরীক্ষিত এ-যন্ত্র ত বোবা হতে পারে না।
কপালের ঘামের ফোঁটা চিবুকে পড়ে। তবে কি এস, এল, আর ঘর থেকে নিয়ে আসবেন ? ব্রাশ-ফায়ার। হ্যাঁ, ব্রাশ-ফায়ার!
কিন্তু নারীমূর্তি সুযোগ দিচ্ছে কৈ? ছিল কৃশ কঙ্কাল-প্রায় বিবসনা। দেখতে দেখতে সে শক্ত সোমত্ত স্থূলকায় হয়ে উঠল যে। তার আলুলায়িত কালো কেশরাশি কোমর ছেড়ে হাঁটুতে পড়েছে। আরো আরো বাড়ছে-স্ফীত এবং লম্বা হচ্ছে তার অবয়ব-মাথার খাঞ্চাটাও বড় হচ্ছে। মূর্তিটা এগিয়ে আসে। নাসের সাহেব এক পা নড়তে পারেন না, হাতের রিভলভার তেমনি মাটির সমান্তরালে বুক বরাবর উঁচানো, কিন্তু হাত পা শিরদাঁড়া সব কিছু মিলিয়ে তিনি যেন একটা শাখা প্রশাখাহীন শুকনো বৃক্ষ।
মূর্তিটা এগোতে এগোতে তার সামনে এসে খাঞ্চটা নামায়, ডান হাতে সরপোশটা টেনে নিয়ে বলে গো—শ—ত।
সত্য সত্যই আলগা করে বসানো কতগুলো গোশতের ভাগ—তরতাজা, রক্ত ঝরছে। খাঞ্চার সেন্টারে মানুষের রক্তাক্ত শির একটা। কর্তিত গলা থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত ঝরছে।
নাসের সাহেব ঈমানদার মানুষ। আল্লাহ তাঁর উপর সব সময়েই মেহেরবান, এটাও তাঁর ঈমানের অঙ্গ। লক্ষ্ণৌতে বাইজীর দখল নিয়ে মারামারির সময়, ১৯৪৬ সালে গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর সময়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সহযোগিতা করার সময়-মোট কথা জীবনের প্রতিটি যুগসন্ধিক্ষণে তিনি আক্রমণকারীরূপে আল্লাহর মদদ পেয়েছেন। আজ তিনি সে মদদ হতে বঞ্চিত হতে পারেন না।
বিশ্বাস তাঁকে প্রেরণা যোগায়। তিনি প্রচণ্ড ধমক দেন, কে তুই মাগী রাত দুপুরে মানুষের গোশত ফেরি করতে বেরিয়েছিস? খুনী বদমাশ ।
সত্য সত্যই তাঁর উপর আল্লাহর মেহেরবানি আছে। এক মুহুর্ত আগে তিনি ছিলেন স্থবির এবং বোবা। মুর্হুত পরেই জীবন ফিরে পেয়েছেন আশ্চর্য! তাঁর ধমকটা গুলীর তীক্ষ্ণতায় ফেরিআলীর মুখের দিকে ধাবিত হয়।
কিন্তু গোশত ফেরিআলীর মধ্যে সামান্য প্রতিক্রিয়াও দেখা যায় না। সে ধীর স্থিরভাবে বলে, খঞ্চাটা তোমার লাইগাই ত আনছি।
আমার লাইগা আনছিস । কস কি কুত্তী মাগী।
হ, তোমার লাইগা আনছি।
ফেরিআলীর জবাব শুনে নাসের সাহেব কিছুটা দমে যান। বলেন, আমি কি মাইনষের গোশত খাই ? মাইনষে কখনও মাইনষের গোশত খায়। দেখছস কোথাও?
খায়—না—তয় কি? একাত্তর সনে মানুষগুলাইন খুন
করলা, কিয়ের লাইগা করলা। জিগাই।
কথোপকথন বেশ স্বাভাবিক। কতকটা আদালতের সওয়াল জওয়াবের মতো। কিন্তু ঐ মাগীটা হাকিম হওয়ার কে ? কি যোগ্যতা আছে তার? গাঁইয়া আশিক্ষিত মূর্খ।
নাসের সাহেব স্বর চড়িয়ে জবাব দেন, কে বলে মানুষ খুন করেছি। আমি একটি মানুষও মারি নি। জেহাদ চলছিল, কাফের মেরেছি, কাফের মারা লাজেম।
আমার পেলাডারে আবদুল্লাহ ডাকতাম। তাকে তুমি খুন করলা। খুন করলা গাঁয়ের রহিমুদ্দি এবং আরো কত গণ্ডারে—ফেরিআলী জবাব দেয়।
মূর্খ মাগী তুই জানবি কি কইরা কেডা
কাফির আর কেডা মুমিন বান্দা। আরবি নাম অইলেই মুসলমান আয় না, বুঝলি নাসের সাহেব জবাব দেন।
ছায়াটা সহসা সম্প্রসারিত হয়। মনে হয় সে যেন আর কারো কায়া নয়, একটা সর্বব্যাপী সবুজতা। সেই সবুজতাই কথা বলে, তোমার লগে তর্ক করবার লাইগা আইয়ি নাই। হিন্দু মুসলমান হগলেই আল্লাহর বান্দা। তুমি আল্লাহর বান্দাদের খুন করছ। হেগর গোশত আহনও তরতাজা আছে, তোমার খাওনের লাইগা খাঞ্চাড়া রাইহা গেলাম।
কে? কে তুই মাগী? যত বড় মুখ না তত বড় কথা। খাঞ্চা লইয়া দূর হ! নাসের সাহেব তেড়ে ওঠেন।
আমি তাগর মা। মানুষ মরে, মা মরে না, মা আউয়াল থেইকা আখেরতক আছে বুঝলি হারামখোর বেঈমান কাফির।
প্রতিটি শব্দ এক একটি আগুনের হলকা। গায়ে এসে তাপ লাগে। দিগন্তহীন সবুজে যেন সহসা দাবানল দেখতে পান নাসের সাহেব।
সত্যই সত্যই তিনি আজ মহা বিপদের সন্মুখীন। মালেকুল মওত কি ঐ বেশে এসেছে? না কি মরদুদ শয়তান। কিন্তু তাঁকে যে বাঁচতেই হবে। তিনি খুব বড় একটা কিছু হবেন, জোর এস্তেজাম চলছে, সব কিছু রেডি, আর মাত্র ক’টা দিন বাকী। তিনি রিভলভারটা আবারওটাই করেন। কিন্তু বৃথা।
বিশাল সবুজের মধ্যে মিলিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে মা! মা! ধ্বনি। খাঞ্চায় রক্ষিত গোশতের টুকরোগুলো নিমেষে এক একটা জীবন্ত মানুষ হয়ে দাঁড়িয়ে ওঠে। খাঞ্চাটাঞ্চা কিছু নেই, মানুষ শুধু মানুষ। ওরাও যোগ দেয় মা ! মা !
কাটা শিরটাও জীবন পায়। শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে কমাণ্ড দেয়, ঘিরে ফেলো। ঘিরে ফেলো নরঘাতক ঐ মোনাফিকটাকে ।
নাসের সাহেব ঐ মনুষ্যগুলোর হাতে কোন অস্ত্র দেখতে পান না। মুষ্টিবদ্ধ অসংখ্য হাত তাঁর চারদিকে দ্রুত ওঠা—নমা করে আর ধ্বনি ওঠে—জয় বাংলা।
পরদিন সকালে বুকে গুলীবিদ্ধ নাসের সাহেবের দেহটা দিঘির পাড়ে পাওয়া যায়। রিভলভারটা তখনও তাঁর মুষ্টিবদ্ধ। পুলিশ সন্দেহ করে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।