গ্রামে টিটি পড়ে গেল। পাঁচ ছেলের মা সাদুর মেয়ে জয়তুনকে তার জামাই তালাক দিয়েছে।
পাড়ার মেয়েদের কাছে খবরটা বেশ মুখরোচক। রসঘন আলাপ করার মতো
ঘটনা অনেক দিন হাকিমপুরে ঘটে নি। একটানা চলে যাচ্ছিল দিনগুলো, না ছিল তাতে কোনরূপ বৈচিত্র্য না ছিল নতুনের উন্মাদনা। চলছিল শুধু রবিবাবুর কথায়—রাঁধার পরে খাওয়া, তারপরে আবার
রাঁধা, তারপরে আবার খাওয়া। কাজেই মেয়েরা ব্যাপারটাকে নিয়ে জটলা পাকাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বেটাছেলেরাও
দু'এক কথা বলে জিনিসটাকে আরও রসাত্মক করে তুলছিল।
পুকুরঘাটেই জটলাটা পেকে উঠছিল সব চাইতে বেশি। পানি আনা এবং গা-ধোয়ার
জন্য গ্রামের সকল মেয়েকেই সকাল বিকাল এবং সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে হাজিরা দিতে হয়। জেলা বোর্ডের দেওয়া
পুকুর— সরকারী মাল, যার যেমন খুশি ব্যবহার করে—গরুর গাধোয়াতেও কসুর
করে না–কাঁথা কাপড় কাচা ত আছেই। অথচ গ্রামবাসীকে এই
পুকুরের পানি খেতে হয়। এ গ্রামের কুয়া মোটে টিকে না।
সেদিন সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে গ্রামের মেয়েরা
প্রায় সবাই এসে জুটলো পুকুরঘাটে।
কেতাবুদ্দিনের বৌ নসিরুন প্রথম কথা তুললো,
বললো : তালাক কি মরদেরা অনর্থক দেয়। বাবা! মাগীর যা সাহস শুনলাম, তাজব হতে হয়।
সকলে
একসঙ্গে জিজ্ঞাসা
করে : কি শুনলে?
জয়তুন
নাকি তার জামাইকে ঘরের থামের সঙ্গে... হিঃ হিঃ হিঃ...। নসিরুন কথা শেষ করতেই পারে
না, হেসে কুটি কুটি হয়।
অন্যেরাও হাসে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শুনতে না পারায় থেমে যায়।
একজন ধমক দিয়ে বলে : কথাটা আগে শেষই কর, তারপর খুব হাসিস।
ধমক খেয়ে নসিরুন আবার বলতে শুরু করে..জয়তুন তার জামাই আইজদ্দিকে ঘরের থামের সঙ্গে জাবড়ে ধরে জামাইর মাথা থামের ওপর এমন ঠোকাঠুকে দিয়েছিল যে তার মাথা নাকি কয়েক দিন ফুলে ছিল। গজারি কাঠের থাম–বুঝতেই পারো।
এবার সকলের হাসবার পালা। হাসির হুল্লোড় চললো কয়েক মিনিট।
থামলে পরে একজন বলে : উ! কি ডাকু মেয়ে বাবা জামাইকে ধরে মার। সর্বনাশ, একটু ভয়ও হলো না। আর একজন বলে পাঁচ ছেলের মা, তবু যে জামাই তালাক দেয় সে কি আর শুধু শুধু। যাই বলো অপরাধ জয়তুনেরই।
তৃতীয়া রসিকতা করার জন্য বলে : কিন্তু জামাইর মাথা যে সে ঠুকে দিল ঘরের থামের উপর, সাহস বলছো, আমি বলি, বেটাছেলের সঙ্গে সে পেরে উঠলো কি করে?
ভারী একটা কথা জিজ্ঞাসা করলেন উনি ! সকলে প্রায় এক সঙ্গে বলে। কে না জানে যে
জয়তুনের চাইতে আইজদ্দি কদেও ছোট, গায়ের শক্তিতেও অনেক কম।
এ উক্তির সত্যতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ করার জন্য আর একজন বললো : ওনার মুখে
শুনেছি আইজদ্দির ওজন নাকি মোটে ছয়-পাশরি!
ওমা তাই নাকি? বেটা ছেলের ওজন মোট ছয় পাশরি। তাহলে জয়তুনের ওজন হবে । কমসে কম দেড় মণ।
একটু থেমে প্রায় সকলে একসঙ্গে বলে : কাজেই বুঝতে পারছে সমিরুন, আইজদ্দি কেন বৌয়ের হাতে মার খেলো।
সমিরুন বলে : কিন্তু তবু বেটাছেলে ত! ডর-ভয় একটু হলো না? .
হু, ডর-ভয় । যা দজ্জাল মেয়ে জয়তুন। ছোটবেলায় ও
বড় বড় গাছে চড়ে কাঁঠাল পাড়তো, মধ্যবয়সী একজন জানায়।
আবার সকলে হেসে কুটিকুটি।
কাজের
কথা ওঠে পরে।
একজন বলে, জয়তুনের এখন গতিটা কি হবে বলি। তার বাপ সাদুও জীবিত নেই। ছেলেরা আছে।
তাদেরই বলে দিন ভিক্ষা তনু রক্ষা, বোনকে ভাত দেবে কোত্থেকে।
খেটেপুটে খাবে। একটা পেট। নয়ত নিকাহ বসবে, একজন সহানুভূতির সুরে বলে ।
পাঁচ ছেলের মাকে নিকাহ করতে আসছে আর কি কত গণ্ডায়! যুবতী গোছের একটি বৌ বলে।
মধ্যবয়সী এক বৌয়ের গায়ে কথাটা বড্ড বিধল। সে চটে উঠে বলে : পাঁচ ছেলের মা হয়েছে তো কি হয়েছে! জয়তুনের দেহটি এখনও অনেকের চাইতে ভালো। ছেলে-মেয়ের ওর সঙ্গে যাচ্ছে না। তাহলে কেন নেকাহ হবে না ওর বলি?
আবার
হাসির পালা।
মাগরিবের আজান পড়ে। কাজেই গল্প আর চলে না। যে যার মতো পানির কলসী কাঁখে বাড়ী
ফেরে।
* * * * * *
ব্যাপারটা এই হাকিমপুরের আইজদিন দিনমজুরি করে খায়। যখন বিয়ে তখন জায়গা জমি অল্প-স্বল্প ছিল। বৌ জয়তুনকে ঘরে এনে কিঞ্চিৎ বিলাসে মন দিল। বৌয়ের জন্য প্রতি হাট থেকে বাছাই পান সুপরি আনতে হতো। তার ওপর সে-সময়ের সস্তার বাজারেও তিন টাকা সাড়ে তিন টাকার কমের কোন কাপড় সে জয়তুনকে পরাতো না। এসব করবার কারণও ছিল। জয়তুন দেখতে শুনতে মন্দ ছিল না। দোহারা লম্বা গড়ন— গায়ের রংটাও ছিল উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ।
এসব বিলাস করতে গিয়ে ব্রাহ্মণ মহাজনের কাছ থেকে খত দিয়ে টাকা কর্জ নিতে হয় তাকে। সে-কর্জ থেকে জায়গা জমি সব গেল। বাস্তু ভিটা সম্বল হয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়লো নিজের গতরের উপর।
তবে আইজদিনের কতকগুলো ভাল গুণ ছিল। ঘুম থেকে জাগতো সে অতি সকালে। এক দিনও সে কাজ কামাই করতে না। পরের বাড়ী কাজ না থাকলে, গ্রাম থেকে কলাটা মূলোটা ক্রয় করে হাটে নিয়ে যেতো। এই তেজারতিতেও তার দু পয়সা হতো। কিন্তু প্রথম জীবনের
বিলাসে জয়তুনের হাত হয়ে গিয়েছিল দরাজ। আইজদ্দিনের জনমজুরির রোজগারে তার মন উঠতো না। এ-উপার্জন থেকে পাঁচটি ছেলে-মেয়েকে খাইয়ে জয়তুনকে মাঝে মাঝে উপোস করতে হতো। এ নিয়ে প্ৰায়ই দু’জনের ঝগড়া বাঁধতো।
সেদিন অতি ভোরে ওঠে আইজদিন দুই কাঁদি কলা নিয়ে চলে গিয়েছিল সাত মাইল দূরে ইলিসপুরের হাটে। ঘরে চাল বাড়ন্ত। অন্যান্য দিন জয়তুন হাওলাত করেই হোক বা অন্যের বাড়ী কাজকর্ম করেই হোক, কোন রকমে কিছু চাল যোগাড় করে এনে স্বামীর জন্য ভাত বেঁধে রাখতো। সেদিন ধারকর্জও মিললো না, বিশেষ চেষ্টাও সে করে নি। বিরক্তি ধরে গিয়েছিল জীবনের উপর। প্রতিদিনের এত অভাব ভাল লাগছিল না। গুম হয়ে বসে ছিল সে।
সন্ধ্যার পরে হাট-ফেরত এসে আইজনি ভাত চাইলো।
যখন শুনলো যে ভাত হয় নি, অমনি আইজদিন রাগে গর্জন করতে লাগলো
: হারামজাদী, ঘরে বসে কি করছিলি তবে ? সারাদিন উপোস। এখন বলছে কিনা ভাত নেই।
জয়তুন উত্তর দিল : মুখ খলারাপ করিসনে বলছি। ভাত
রাঁধবো আমার কাছে কি দিয়ে গিয়েছিলি? হাঁড়িতে কি তোর মাথা ফুটাবো?
তবে রে...! যতবড় মুখ না তত বড় কথা! আমার মাথা ফুটাবি
হাঁড়ির গরম পানিতে? দেখাচ্ছি মজা। বলে আইজদ্দিন ধরলো জয়তুনের চুলের ঝুঁটি।
হেঁচকা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, জয়তুন যেমনি ঘরের
থামের কাছে দাঁড়িয়েছে, আইজদ্দিন লাগিয়ে দিল তার পিঠের উপর এক কিল।
জয়তুনের সহ্য হলো না। দুহাতে জাবড়ে ধরলো সে আইজদিনকে ঘরের থামের সঙ্গে।
ছাড়, ছাড় মরে গেলুম।
না, না, আমি ছাড়বো না।
ছাড়বি
নে ?
না, ছাড়বো না। বল আর মারতে আসবি আমায়?
তোর কাছে একরারনাম দিতে হবে নাকি?
আলবৎ একরারনামা দিতে হবে। না দিয়ে যাবি টাকা, না চাল, তবু বাড়ী এসে কেন
ভাত হলো না, সে-অপরাধে আমাকেই মারবি হর-হামেশা ! বল আর কখনো আমার গায়ে
হাত তুলবি ?
আমি তোর কাছে একরারনামা দেবো না। বল ছাড়বি কি না?
না ছাড়বে না, কিছুতেই ছাড়বো
না।
তবে রে হারামজাদী। যা তবে জাহান্নামে যা, এক, দুই, তিন তালাক বাইন তালাক দিলাম তোকে। ছাড় এবার। শিগ্গির ছাড়। তুই আমার জন্য হারাম হয়েছিস। কবীরা গোনাহ্ করছিস
আমায় ধরে রেখে, শিগ্গির ছাড়।
ততক্ষণে জয়তুনের চৈতন্য হয়েছে। সত্যই ত একি সর্বনাশ
হয়ে গেলো তার! আইজদিনকে ছেড়ে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠালো সে। চিৎকার করে পাড়া কাঁপিয়ে তুললো : ও মা,
আমার কি হলো গো!
আইজদ্দিন ইত্যবসরে সরে পড়েছে।
পাড়ার লোকজন জমায়েত হলো। মুনশী সাহেবও খবর শুনে এলেন।
সকলে মিলে অনেকক্ষণ গবেষণার পর ঠিক হলো ; যথার্থই তালাক হয়ে গেছে।
মুনশী সাহেব ফতোয়া দিলেন : কারো মুখ কারো আর দেখা চলবে না।
চোখের পানি মুছতে মুছতে
জয়তুন নিজের ভাইয়ের সঙ্গে ও পাড়ায় বাপের বাড়ী চলে গেল। আর আইজদ্দিন পাঁচটি ছেলে-মেয়ের হাত ধরে হবার
মতো চেয়ে রইলো জয়তুনের চলার পথের দিকে।
কেউ কেউ সমবেদনা দেখালো। কিন্তু ভদ্রলোকেরা
বললো : বেশ হয়েছে। যেমন ছোটলোক তেমনি কীর্তি।