ফের কৃষ্ণনগর ১ম - অংশ
জ্বর থেকে উঠে আমি বাবার কাছে দিনাজপুরে চলে যাই। এবং বৈশাখ মাস পর্যন্ত সেখানেই থাকি। গ্রীষ্মকালে দিনাজপুর ভীষণ গরম। এই গরমের জন্যই হোক, কিংবা অন্য কোন কারণে হোক, আমার সেখানে ভয়ঙ্কর melancholia হয়। ইংরিজিতে যাকে বলে metaphysical troubles, আমার মনের ভিতর তা ছাড়া আর কিছু ছিল না। সেই সময়ে আমার সেজদা দিনাজপুরে আসেন। আমি বাবাকে বললুম, ‘এবার আমি ফাস্ট আর্টস পরীক্ষা দিতে পারব না।’ তিনি তাতে কোন আপত্তি করলেন না। দিনাজপুরেও আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলুম। জ্বর নয়, হজমের গোলমাল। বাবার কাছে হলধর নামে একটি হরিপুরের চাকর থাকত। তাকে তিনি ছেলেবেলা থেকে প্রতিপালন করেছিলেন। সে ছিল যৌবনে অতি বলশালী। কিন্তু দিনাজপুর গিয়ে দেখলুম, কোন কাজ করে না। কেবল বসে-বসে গুলি খায়। আমি বাবাকে বলেছিলুম, ‘একে রাখেন কীসের জন্য ?’ তিনি বলেন, ‘বিদেশে একা থাকি, যদি কখনও অসুখ হয়, তা হলে হলধর আমার শুশ্রূষা করবে।'
আমি দেখলুম, এ কথা ঠিক। কারণ আমার অসুস্থ অবস্থায় হলধর আমার খাটের পাশে সকাল-সন্ধ্যা বসে থাকত; এবং যখন যা ফাইফরমাশ করতুম, সে কাজ করে দিত। দিনাজপুরে আমরা যে-বাসায় ছিলুম, সেটি শহর থেকে অনেক দূরে।
বাবা ছিলেন
Land Acquisition Collector, তাই যে-প্রকাণ্ড বাংলোটিতে আমরা ছিলুম, সেখানে তাঁর আপিসের আমলা-ফয়লা সকলে বাস করত; এবং ম্যাপ আঁকা প্রভৃতি কাজ করত। আমি তাদের সঙ্গে মেলামেশা করতুম। একবার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আমি । দিনাজপুরের রাজবাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, সেকেলে রাজকায়দা সব বজায় আছে। ফটক থেকে রাজবাড়ি পর্যন্ত মশালধারীরা আমাদের নিয়ে গেল। সেখানে নাচের আসর বসেছিল। তয়ফাওয়ালিদের দেখলুম একের পর আর-একটিকে পান দিয়ে বিদায় করা হল। পান দেওয়ার অর্থ শুনলুম, ঢের হয়েছে, এখন সরে পড়ো। এর বহু পরে ঐ দিনাজপুরের রাজবাড়িতে আবার যাই। দিনাজপুর অঞ্চল থেকে রাজাবাহাদুর অনেক প্রস্তরমূর্তি সংগ্রহ করে তাঁর বাড়ি সাজিয়েছেন। একটি স্তম্ভ সংগ্রহ করেছেন, যার উপর একটি খোদিত লিপি আছে।
আমি দিনাজপুরে অসুস্থ অবস্থায় ডিকেন্সের Martin Chuzzlewit পড়ি। সে বইখানি আমার মোটেই ভালো লাগেনি। আমেরিকানদের কথায় কথায় নিষ্ঠীবন ত্যাগ করার বিষয়টাই আমার কেবল মনে আছে। বাবার আপিসের হেডক্লার্ক কীর্তন গাইতেন। একটি ব্রজবুলি গানের প্রথম ছত্র আমার আজও মনে আছে—
এতেক মিনতি যব করলহ মাধব
তবু নাহি হেরিল বয়ান।
এরই বাংলা অনুবাদ করে তিনি গাইতেন। তা ছাড়া, বাবার কোন ‘পলি’ চাকরের মুখে কবি কালিদাসের ভাগ্নে রচিত দুটি শ্লোক শুনি যা কহতব্য নয়।
বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি আমি ও সেজদা কৃষ্ণনগরে ফিরে আসি। দিনাজপুরের তুলনায় কৃষ্ণনগর দাৰ্জিলিং মনে হয়েছিল। যদিচ কৃষ্ণনগরও যথেষ্ট গরম। তবে সেখানে লু বইত না।
কৃষ্ণনগরে ফিরে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচলুম। কিন্তু মন প্রকৃতিস্থ হল না। দিনাজপুরের melancholia ও গ্রীষ্মের জের টেনে এনেছিলুম। আমার ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগর বোধ হয় তেমন গরম ছিল না। অন্তত আমার কাছে অসহ্য মনে হয়নি।
এবার কৃষ্ণনগরে এসে দুপুরবেলায় বিছানায় শুয়ে-শুয়ে শুধু কাঠ-ঠোকরার আওয়াজ শুনতুম। চাতকের ‘ফটিক জল’ ডাক কখনও শুনিনি। তিন বৎসর কলকাতা-বাসের পর কৃষ্ণনাগরিক গ্রীষ্ম ঈষৎ কষ্টকর হয়েছিল। তখন ইস্কুল-কলেজের গরমের ছুটি। আমাদের পিঠপিঠি মেজদাদা (যোগেশ চৌধুরী), আমার ভগ্নী মৃণালিনী এবং ভগ্নী প্রিয়ম্বদা, এরাও কলকাতা থেকে ছুটিতে কৃষ্ণনগর চলে এলেন। প্রিয়ম্বদার সঙ্গে স্নেহ আশ বলে একটি মেয়ে ও কেশববাবুর সমাজের ভাই দীননাথের এক পুত্র এলেন। তিনি ছিলেন গাইয়ে। তাঁর গান শুনে আমরা মুগ্ধ হইনি। সে সব গানের যেমন কথা, তেমনি সুর। তার একটি গানের প্রথম লাইন আমার আজও মনে আছে, সেটি এই— ‘নববিধানের কলের গাড়ি চলে যায়।’ এটি বোধ হয় নববিধানের সঙ্গীত।
এই সময় আমি কালিদাস বাগচী বলে কোন এক ভদ্রলোকের বাড়ি রাত্রে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে, যে-ডাক্তার পূর্বে আমার প্রাণরক্ষা করেছিলেন, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সত্য লাহিড়ীর মুখে একটি গান শুনে চমকিত হয়ে উঠি। গানটি বাংলা, যথা— ‘বঁধু তুমি বলেছিলে তোমা বই আর কারও নই।’ গানের সুরের নাম শুনলুম কানাড়া। এমন সুন্দর গান আমি ইতিপূর্বে কখনও শুনিনি। এ রাগ আজ পর্যন্ত আমার অত্যন্ত প্রিয়। এবং আমার বিশ্বাস যে, হিন্দু সঙ্গীতের রাগরাগিণীর ভিতর কানাড়াই হচ্ছে রাজা। সত্য লাহিড়ী ছিলেন অতি সুগায়ক। তাঁর গলা ছিল যেমন মিষ্টি, তেমনি গতে পুরু।
পূর্বে বলেছি যে, আমি ছেলেবেলায় একটি যুবকের মুখে পিলু রাগিণীর একটি গান শুনি, যেটি আমার চমৎকার লেগেছিল। আমার বিশ্বাস সেটি আমি এই সত্য লাহিড়ীর মুখেই শুনি। তিনি ছিলেন দাদার সহপাঠী, আমার চাইতে অনেক বড়। ইতিমধ্যে তিনি সঙ্গীতশাস্ত্র শিক্ষা করেন। ফলে তিনি পুরো ওস্তাদ না-হলেও একরকম হাফ-ওস্তাদ হয়ে উঠেছিলেন। আমি এই সময় থেকেই তার মহাভক্ত হয়ে উঠি। যদিচ চরিত্রবান বলে তার সুনাম ছিল না।
এই গান শুনে আমার melancholia কেটে যায় ও আমি দুটি অল্পবয়সের ছোকরা, যারা গাইতে পারে, তাদের আমাদের বাড়িতে এনে রাখি এবং তাদের ভরণপোষণের ভার নিই। এমনকী, তাদের ইস্কুলের মাইনে পর্যন্ত আমি দিতুম। এর জন্য মাস্টারমশায় কোন আপত্তি করেননি। কারণ গলা ভারি মিষ্টি ছিল। কিন্তু সে গলা টেকসই নয়। একটু বয়স হলেই সে গলার মাধুর্য যে নষ্ট হবে, তা আমি তখনই বুঝেছিলুম। তারা আমার ছোটভাই অমিয়র সঙ্গে ইস্কুলে পড়ত। বহুকাল পরে শুনেছি যে, এ দু-জন অমিয়র কাছে কিঞ্চিৎ অর্থসাহায্যের প্রার্থী হয়ে এসেছিল। এর থেকে অনুমান করছি যে, তারা না-লেখাপড়া, না-সঙ্গীত— কোন বিষয়ই লাভ করেনি।
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই,
ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।