ফের কৃষ্ণনগর ২য়- অংশ (শাঁখচুন্নির ভয়)
আমি কৃষ্ণনগর কলেজে সেকেন্ড ইয়ার ক্লাসে
আবার ভর্তি হলুম। তখন সে কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন ম্যান-সাহেব। তিনিই আমাদের ইংরিজি পড়াতেন। কী রকম পড়াতেন, তা আমি বলতে পারিনে। আমি প্রফেসরদের কথায়
বড় একটা মনোযোগ দিতুম না। অপরিচিত সহপাঠীদের সঙ্গে ক্লাসে গল্পসল্পও করতুম না। এক কোণে চুপচাপ করে
বসে থাকতুম। নকুলেশ্বর পণ্ডিত আমাদের সংস্কৃত পড়াতেন। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে পারদশী বলে তাঁর
খ্যাতি ছিল। কিন্তু তাঁর পঠনপাঠনের ভিতর কোন রসকষ ছিল না। অপর মাস্টার কে-কে ছিলেন আমার মনে নেই। ফিজিক্সের প্রফেসর
ছিলেন অতিশয় ভদ্র ও মিষ্টভাষী। কিন্তু আমি দু-চার দিনেই আবিষ্কার করলুম যে, ফিজিক্স সম্বন্ধে তাঁর
চাইতে আমার জ্ঞান পরিস্কার। সে কথা তাঁকে বলতেও আমি ক্রটি করিনি। তিনি ছিলেন নদে জেলার কোন বিশিষ্ট জমিদার
বংশের ছেলে এবং অতি সদাশয় লোক । ছোকরা বয়সে হয়েছিলেন ঘোর ব্রাহ্ম।
আমি প্রথম থেকেই প্রিন্সিপাল ম্যান-সাহেবের
সুনজরে পড়ি, এবং তাঁর অতি প্রিয়পাত্র হয়ে উঠি— যার পরিচয় আমি পরে পাই। কলকাতা থেকে চলে এসে দলছাড়া হয়ে সমবয়সীদের
সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছিলুম না, তাই আমি ইস্কুলের ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা না-করে পূর্বোক্ত সত্য
লাহিড়ীর গানের আড্ডায় যোগ দিলুম। প্রসিদ্ধ ব্রাহ্ম রামতনু লাহিড়ীর ভাই কালী লাহিড়ী ছিলেন কৃষ্ণনগরের
শ্রেষ্ঠ ডাক্তার; সত্য ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র। এবার কৃষ্ণনগর ফিরে গিয়ে দেখি সত্যও হয়েছেন
একজন ডাক্তার— ইস্কুল-কলেজে পড়ে নয়, তাঁর পিতার কাছে শিখে। তিনিও হয়ে উঠেছিলেন
একটি খুব ভালো চিকিৎসক। তাঁর স্বাভাবিক বুদ্ধি এবং রোগ সম্বন্ধে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি চিকিৎসাবিদ্যায় তাঁর
জুটত; তাদের মধ্যে কেউ বেকার, কেউ বা গবর্নমেন্টের ছোটখাটাে চাকরি করে। এদের মধ্যে প্রায়
সকলেই কোন-না-কোন যন্ত্রে হাত লাগাত, যথা— সেতার, বেয়ালা, বায়া তবলা, ঢোলক ইত্যাদি। একমাত্র সত্যই সব যন্ত্র বাজাতেন। এ ছাড়া কৃষ্ণনগরে শশী কর্মকার বলে একটি ওস্তাদের
। বিখ্যাত গায়ক নুলো
গোপালের নিকট তিনি গান শেখেন। নুলো গোপালকে বৃদ্ধ বয়সে আমি দেখেছি। তখন তাঁর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরত না। তিনি আমার এবং আমার
খুড়শ্বশুর-মহাশয় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরোধে ফিসফিস করে একটি গান গাইলেন। আমি শুনে অবাক হয়ে
গেলুম। কী মিষ্টি তাঁর তার। কী দরদি তার মিড়। আর বুঝলুম যে এঁর যখন
গলা ছিল, তখন ইনি একটি অসাধারণ গাইয়ে ছিলেন। শশী কর্মকার এ হেন ওস্তাদের কাছে শিক্ষা পেয়ে যে একটি ভাল গাইয়ে
হয়ে উঠেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তিনি হিন্দুস্তানি ধ্ৰুপদ খেয়াল টপ্পা ঠুংরি ছাড়া বিদ্যাসুন্দরের
গান অতি চমৎকার গাইতেন। এর পূর্বে কৃষ্ণনগরে বদ্রি সুকুল নামে একটি হিন্দুস্থানি ওস্তাদ ছিলেন। তিনি নাবালক রাজাকে
সেতার এবং সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন। সত্য লাহিড়ী প্রথম-প্রথম সেই বদ্রি সুকুলের কাছে সেতার ও গান
শেখেন।
এঁদের দলে মিশে আমার সঙ্গীতের নেশা হয়। সে নেশা এখনও সম্পূর্ণ
ছোটেনি।
এ অবস্থায় এবার কৃষ্ণনগরে আমি যে বিশেষ কিছু
লেখাপড়া করতুম, তা নয়। এমনকী নতুন পাঠ্যপুস্তকও আমি কিনিনি। কলেজ খোলা থাকলে দশটায় সেখানে একবার যে তুম, আর চারটের পর ফিরে
আসতুম। তার পর পাঁচটা আন্দাজ
সত্য লাহিড়ীর ডিস্পেন্সারিতে যে তুম, এবং ঘণ্টাখানেক সেখানে হয় গান-বাজনা শুনে, নয় গল্পসল্প করে সাড়ে-সাতটার
পর বাড়ি চলে আসতুম। এই বাড়ি ফেরার পথটা একটু অদ্ভুত ছিল। রাস্তায় জনমানব কখনও দেখিনি, আর দু-পাশে প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড সেগুন গাছ ছিল, তাই অন্ধকারের ভিতর
সেই পথ দিয়ে ফিরতে হত। একদিন পথে ভূতের ভয় পাই। সেই নির্জন রাস্তায় হঠাৎ সেই সেগুন গাছের তলা থেকে একটি বিকট
হাসির আওয়াজ পেলুম। মনে করলুম, এ হাসি কোন মানুষের হাসি কি না, সেটা না-জেনে ভয়ে আর অগ্রসর হতে পারব না। তাই প্রতি সেগুন গাছের
গায়ে ছড়ি দিয়ে মারতে-মারতে দু-চার পা করে এগোতে লাগলুম। হঠাৎ একটি মহা চিৎকার শুনলুম। আমি একটু এগিয়ে দেখি
একটি গাছের তলায় এক পাগলি দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার পূর্বপরিচিতা। তখন আমার ভয় কেটে
গেল। এ ছাড়া মধ্যেমধ্যে
রাস্তার ধারে যেখানে বড় গাছ কম, সেখানে ছোট গাছে শাঁখচুন্নি দেখেছি। প্রথম শাঁখচুন্নি দেখি, একটি শেওড়া গাছের
ডালে পা দিয়ে সাদা কাপড়-পরা স্ত্রীলোক দাঁড়িয়ে আছে। সে বারও আমি ছড়ি দিয়ে সেই স্ত্রীলোককে আঘাত
করি। তাতে আবিষ্কার করি
যে, গাছের গায়ে চাঁদের আলো পড়ে এই শাঁখচুন্নির রূপ ধারণ করেছে।
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই,
ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।