:::: সূচীপত্র ::::
ফের কৃষ্ণনগর ৩য়- অংশ (রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা)

সত্যবাবুর ডিস্পেন্সারি থেকে আমাদের বাড়ি প্রায় আড়াই মাইল দূরে, আর এর বেশির ভাগ পথ সেগুন গাছের বীথির ভিতর দিয়ে যেতে-আসতে হত, সন্ধ্যার পর ঘোর অন্ধকারের ভিতর দিয়েতবু সঙ্গীত অথবা আড্ডার এমনি নেশা যে, আমার উক্ত আড্ডায় হাজির হওয়া নিত্যকর্মের মধ্যে হয়ে উঠেছিল।

আমার কলেজের পড়াশুনায় মন ছিল না। শেষটা ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষার পড়া পড়তে আরম্ভ করি ফেব্রুয়ারি মাসে টেস্ট পরীক্ষা দিইতার ফল থেকে আমি অনুমান করেছিলুম যে, আমি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবতার কিছুদিন পরেই মার্চ ১৮৮৬ সালে আমার দাদা আশু চৌধুরী পাঁচ বৎসর পর বিলেত থেকে ফিরে এলেনসেই দিনই আমার পায়ে অল্প-অল্প ব্যথা হয়জ্যেষ্ঠ পুত্রের শুভাগমে বাড়িতে মহা হৈচৈ পড়ে গেলসুতরাং আমার পায়ের ব্যথার কোন তদ্বির করা হল নাদিন পাঁচ-ছয়ের মধ্যে সে ব্যথা সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে গেল; এবং জ্বর উঠল ১০৫°শুনলুম আমার যা হয়েছে তার নাম নাকি rheumatic rever, আমি একুশ দিন অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে রইলুমএকুশ দিনের পর আমার জ্বর ছাড়ল এবং ব্যথা কমতে আরম্ভ করলসে বৎসর তাই আমার পরীক্ষা দেওয়া হল না

রোগমুক্ত হবার কিছুদিন পর আমি আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দৰ্শন লাভ করিদাদা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এক জাহাজে বিলেত যাত্রা করেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মাদ্রাজ থেকে ফিরে আসেনএই অল্প সময়ের মধ্যে দাদার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব হয়তাই রবীন্দ্রনাথ দাদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্যে কৃষ্ণনগরে আসেনপ্রথম দর্শনে রবীন্দ্রনাথ আমার মনে কী রকম গভীর ছাপ অঙ্কিত করেছিলেন, সে কথা আমি ইতিপূর্বে অন্যত্র বলেছি স্থলে তার পুনরাবৃত্তি করব নাসে সময়ে আমি রবীন্দ্রনাথকে দেখি তাঁর কথাবার্তা এবং গান শুনিআমাদের কৃষ্ণনগরের বাড়িতে দক্ষিণে একটি লম্বা-চওড়া ঢাকা বারান্দা ছিল এবং তার দক্ষিণে একটি মাঝারি গোছের খোলা বারান্দা ছিলএকদিন সন্ধ্যার পর সেখানে দাদা রবীন্দ্রনাথ বসে তাল সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেনরবীন্দ্রনাথ কৃষ্ণনগরে আসবার কিছু পূর্বে কলকাতায়, বোধ হয় মেডিক্যাল কলেজে, তাল সম্বন্ধে একটি বক্তৃতা করেনআমি ঢাকা বারান্দায় অন্ধকারের ভিতর বসে তাঁদের আলোচনা শুনছিলুমশুনে দাদাকে একটি প্রশ্ন করলুমসেই রাত্রে দাদার মুখে শুনি যে, আমার প্রশ্ন শুনে রবীন্দ্রনাথ দাদাকে জিজ্ঞাসা করেন, ' প্রশ্ন কে করলে ?' দাদা বলেন, 'আমার একটি ছোট ভাই।' রবীন্দ্রনাথ নাকি দাদাকে বলেন, 'তোমার -ভাইটি দেখছি অতি বুদ্ধিমান চতুর।' আমার সে প্রশ্নটি ছিল এই যে রাস্তা দিয়ে একটি ঘোড়া যদি সমান জোরে দৌড়ে যায়, তবে তার সমপদ বিক্ষেপের শব্দ কি কানে মিষ্টি লাগে না ? যদিচ তার ভিতর কোন সুরস্বর নেই, আছে শুধু সমান সময় ব্যবধানতিনি কৃষ্ণনগরের মতো পাড়াগাঁয়ে এসে, একটি রুগ্‌ণ ছোকরার মুখে এরকম প্রশ্ন বোধ হয় প্রত্যাশা করেননিরবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সংক্ষেপে আমার বক্তব্য এই যে, আমি প্রথমেই আবিষ্কার করি তিনি দেহে মনে একটি লোকোত্তর পুরুষ

এর মাসখানেক পরে আমি দাদার সঙ্গে আবার কলকাতায় পড়তে ফিরে আসিসেকালে একবার পরীক্ষা না-দিলে কলেজে মাত্র -মাস পড়তে হতআমি মট্‌স লেনে একটি বাসায় থাকতুমকিন্তু কলেজে যেতুম না-মাসের জন্যে St. Xavier's College- ভর্তি হই! তখন তার কলেজ ক্লাস হত লালবাজারের একটি বাড়িতেতার মালির ঘর অর্থাৎ জলখাবার ঘরে দস্তুরমতো আড্ডা বসতছাত্রদের ভিতর কেউ-কেউ বাইরে থেকে বিয়ার আনিয়ে পান করত

এই সময়ে আমার সঙ্গে নতুন কতকগুলি ছাত্রের পরিচয় হয়তাদের মধ্যে কেউ-কেউ বুদ্ধিমান ছোকরা ছিলযথা সতীশ মুখুজ্যে তুলসী মুখুজ্যেসতীশ বার্মায় গিয়ে ম্যান্ডালেতে বড় উকিল হন; কিন্তু অল্প-বয়সেই মদ খেয়ে মারা যানআর তুলসী পাঠ্যপুস্তক লিখে সংসারযাত্রা নিৰ্বাহ করেনইংরিজি ভাষা তিনি ভালোই জানতেনতিনিও শুনেছি সুরার কবলে প্রাণত্যাগ করেনযারা স্কুল-কলেজে পড়ে না, এমন কোন-কোন ছোকরাও সেখানে আড্ডা দিতে আসতকিন্তু তারা মদ্যপান করত নাতাদের মধ্যে একটি সোনার বেনে ছেলেকে দেখেছি, যিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার অত্যন্ত ভক্ত ছিলেনএবং তাঁর মুখেই শুনেছি, যে-সব স্ত্রীলোক সমাজ-বহির্ভূত তিনি তাদের সেই কবিতা পড়ে শোনাতেন মুখস্থ করাতেন

সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।