রবীন্দ্রনাথের সাথে ভ্রমণ
আমি Manzalo নামক জনৈক ইতালীয়
violinist-এর কাছে ইতালীয় ভাষা শিখতেও আরম্ভ করি। তিনি লেখাপড়া কিছু জানতেন না। সুতরাং
তাঁর স্ত্রী আমাকে পড়াতেন। মহিলাটি ইংরেজি জানতেন না। ফলে আমি ইতালীয় ভাষায় কথোপকথন
করতে বাধ্য হই।
এই সময়ে আমি দু-বার মধ্যপ্রদেশে রাইপুর যাই। আমার ভাগ্নী প্রিয়ম্বদা
দেবীর স্বামী তারাদাস বন্দোপাধ্যায় সেখানকার একজন বিশিষ্ট উকিল ছিলেন। একবার তাঁদের
বাড়িতে এক মাস থাকি, আর একবার দু-দিন।
ইতিমধ্যে আমি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে
রাজশাহী যাই। লোকেন পালিত তখন সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সম্ভবত দিন-পনেরো আমরা
দু-জনে তাঁর অতিথি হয়ে থাকি। পরে আমরা নাটোর ফিরে আসি। আমার উদ্দেশ্য ছিল আমার নিজ গ্রাম হরিপুরে
যাওয়া, এবং রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য কলকাতায় ফিরে যাওয়া। নাটোরে বোধ হয় আমরা দিন-সাতেক
থাকি। নাটোরের মহারাজার সঙ্গে কিছুদিন পূর্বে কলকাতায় আমার পরিচয় হয়। আমি একদিন
সন্ধাবেলা বাড়ি বসেছিলুম, এমন সময়ে চাকর এসে খবর দিলে যে দুটি বাবু এসে হলঘরে বসে
আছেন। দাদা বললেন– 'প্রমথ,
দেখো তো কে। আমি ঘরে ঢুকে দেখি যে, একজন সুপুরুষ এবং তাঁর বেশভূষা অতি পরিপাটি। তিনি
হচ্ছেন নাটোরের ভূতপূর্ব মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছেন রাজশাহীর
উকিল অক্ষয় মৈত্র, 'সিরাজদ্দৌলা'র লেখক। আমি আর মহারাজা উভয়েই প্রথম দর্শনে পরস্পরের
love-এ পড়ে যাই। এবং সেই দিন থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আমরা অতি অনুরক্ত এবং অন্তরঙ্গ
ছিলুম। মহারাজা ছিলেন দূরসম্পর্কে আমার আত্মীয়। এবং আমাদের উভয় পরিবারের বহুকাল থেকে
অতিশয় ঘনিষ্ঠতা ছিল। বাবার শৈশবে মাতৃবিয়োগ হয়। তাই তিনি বাল্যকালে তাঁর মাসি মহারানি
কৃষ্ণমণির কাছে নাটোরে লালিত-পালিত হন। এবং নাটোর-রাজের যখন ভগ্নদশা উপস্থিত হয়, তখন
আমার ঠাকুরদাদা ও মহারানি কৃষ্ণমণির ভ্রাতা, এই দুই শালা-ভগ্নীপতিতে মিলে তাঁদের সম্পত্তি
রক্ষা করবার চেষ্টা করেন। এ সব আমার শোনা কথা। তবে আমার ঠাকুরদাদা যে এই ব্যাপারে নাটোরে
জেলে গিয়েছিলেন, এ কথা সত্যি। এই সব কারণেই নাটোর-রাজপরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের
সম্পর্ক এত দৃঢ় হয়েছিল। দাদা বিলেত যাবার পর রানি কৃষ্ণমণির পুত্রবধূ ও ও প্রায়শ্চিত্ত
করতে বারাকে আদেশ করেন। বাবা তাতে অস্বীকৃত হওয়ায় তিনি আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন
করেন। তখন আমি হেয়ার স্কুলে এনট্রান্স ক্লাসে পড়ি। তারপর থেকে আমাদের দুই পরিবারের
পরস্পরের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না। আর আমি এম এ পাশ করবার পর যুবক জগদিন্দ্রনাথ রায়
নিজে থেকে আমাদের বাড়িতে এসে সেই ভাঙা-সম্পর্কে আবার জোড়া লাগান।
আমার রাজশাহী যাবার
অব্যবহিত পরে মহারাজা সেখানে এসে উপস্থিত হন। প্রতি দিন সন্ধাবেলা অক্ষয় মৈত্র এবং
তিনি লোকেন পালিতের বাড়িতে আসতেন, আমাদের সঙ্গে গল্পসল্প করতে। এই সময়ে আমরা আবিষ্কার
করি যে, মহারাজার ভদ্রতা অসাধারণ। ভূভারতে এমন জিনিস নেই, যা নিয়ে আমরা আলোচনা না-করতুম।
সে আলোচনায় মহারাজাও যোগ দিতেন। এই সূত্রে
আমরা আরও আবিষ্কার করি যে, মহারাজা অতি বুদ্ধিমান। সে সময়ে রবীন্দ্রনাথের শরীর খুব
ভালো ছিল না। তিনি সন্দেহ করতেন যে, তাঁর হৃদরোগ হয়েছে। আমি সে ভয় কখনও পাইনি। আমার
মনে হত সেটি রবীন্দ্রনাথের একটি বিশেষ mood মাত্র, যাকে তিনি হৃদ্রোগ বলে ভুল করতেন।
সে যা-ই হোক, আমাদের এই সান্ধা সম্মিলনে লোকেন আর আমি ঘোর তর্ক করতুম। তার কারণ,
লোকেনের সঙ্গে আমার কী সাহিত্য, কী আর্ট, কী ফিলজফি– কোন বিষয়েই মতের মিল ছিল না।
লোকেন -মধ্যে মধ্যে Mill's Examination of Hamilton আমাদের পড়ে শোনাতে চেষ্টা করত, যা আমার
অসহ্য বোধ হত, এবং রবীন্দ্রনাথেরও তা-ই। আমি একটি কথায় তার মিল পড়া বন্ধ করে দিই।
আমি একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করি – 'মিল কে?' তার উত্তরে সে বলে- 'মিল কে, তুমি জানো না?' আমি
উত্তর করি, 'নামও কখনও শুনিনি।' লোকেন বললে, 'তা হলে তোমার কাছে মিল পড়া ব্যর্থ।' আমার এ কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ ঈষৎ
হাস্য করলেন। এর পর লোকেনের মিল পড়া বন্ধ হল।
রবীন্দ্রনাথ রাজশাহীতে কোনরূপ লেখাপড়া
করতেন না। কিন্তু মনে-মনে একখানি অপূর্ব গ্রন্থ রচনা করতেন। সে বইয়ের নাম পঞ্চভূতের
ডায়রি; যাতে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার পূর্ণ পরিচয় এবং আমাদের তর্কের কিছু-কিছু আভাস
পাওয়া যায়। লোকেনের সঙ্গে তর্কে আমার মতামতের অনুকূল ছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং মহারাজ।
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই,
ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।