:::: সূচীপত্র ::::
সাহিত্য-সেবা

আমার মনের চরিত্র কী করে আস্তে-আস্তে গড়ে উঠল, সে কথা আমি পূর্বে বলেছিআমি এফ এ পাস করবার পর কলেজ ত্যাগ করিনিথার্ড ইয়ার ক্লাসটা আমি সেন্ট জেবিয়ার্সেই পড়িতখন কলেজ পার্ক স্ট্রিটে উঠে গেছেFather Moulmein নামক একটি যুবক পাদরি আমাদের ফিলজফি পড়াতেনতাঁর বুদ্ধি ছিল অতি পরিষ্কারতাঁর তুল্য সাইকোলজি পড়াতে আর কোন অধ্যাপক পারতেন নাসেই সময় থেকেই ফিলজফিতে আমার প্রীতি জন্মায়তারপর ফোর্থ ইয়ার ক্লাসে প্রেসিডেন্সিতে ফিরে যাইএবং বি এ পরীক্ষায় ফিলজফি অনার্সে আমি ফাস্ট হইপ্রেসিডেন্সি কলেজের ফিলজফির অধ্যাপক পি কে রায় আমাকে বলেন 'তুমি যে ফিলজফি সব ছাত্রের চেয়ে বেশি জানো তা নয়; কিন্তু তোমার কাগজ যারা পরীক্ষা করেছে, সেই ইংরেজ অধ্যাপকেরা আমাকে বলেছে যে তোমার মতো অপর কেউ অত সুন্দর ও পরিষ্কার করে লিখতে পারে না।' অর্থাৎ আমি ফিলজফিতে ফাস্ট হই আমার ইংরেজি লেখার গুণেতারপর আমি প্রেসিডেন্সিতে এম এ পড়িএবং ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীর প্রথম স্থান আধিকার করিএ-ও আমার বিশ্বাস ইংরেজি রচনার প্রসাদে আমি শেক্সপিয়রের সমালোচনা অন্য কোন সমালোচকের বইয়ে পড়িনি আমার নিজের মতামত নিজের ভাষায় ব্যক্ত করেছিলুম, যা ইংরেজদের কাছেও গ্রাহ্য হত এই দুই পরীক্ষাই তা প্রমাণ করে

ইতিপূর্বে আমি বাংলা কখনও লিখিনি আমি যখন এম পড়ি, তখন জ্ঞানেন্দ্রনাথ গুপ্ত নামক একটি যুবকের অনুরোধে একটি ক্ষুদ্র সাহিত্য-সভায় যোগ দিই এবং সেই সভাতেই জয়দেবের গীতগোবিন্দের উপর একটি প্রবন্ধ পাঠ করি তার প্রধান বক্তব্য এই ছিল যে, জয়দেব উঁচু দরের কবি নন আমার মত শুনে শ্রীযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রনাথ গুপ্ত পরলোকগত চিত্তরঞ্জন দাশ প্রভৃতি অসন্তুষ্ট হন কবি অক্ষয় বড়াল সে সভায় উপস্থিত ছিলেন তিনি বলেন যে, 'এত কাল পর বাংলায় একটি নতুন লেখকের আবির্ভাব হল' সে প্রবন্ধ 'ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশ করি ভারতীর সম্পাদিক ছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী তিনি উক্ত প্রবন্ধের অনেকাংশ বাদ দিয়ে সেটি ছাপান সেই প্রবন্ধের পাণ্ডুলিপি আমার ভাগিনেয়ী প্রিয়ম্বদা দেবীর কাছে রাখি এবং বহুকাল পরে সেটি 'সবুজ পত্রে' পুনঃপ্রকাশিত করি এর কারণ সেটি আবার পড়ে দেখলুম যে আমি আমার মত পরিবর্তন করিনি সেটি অবশ্য তথাকথিত লিখিত কিন্তু ঈষৎ মনোযোগ দিয়ে পড়লেই বুঝতে পারবেন যে, আমার লেখার সব দোষগুণই তাতে বর্তমান

এর পর থেকেই আমি বাংলা লেখক হয়ে উঠলুম আমার বি এম পরীক্ষার ফল শুনে রবীন্দ্রনাথ মহা খুশি হয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্য যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় উচ্চ স্থান অধিকার করেছে, এটি তাঁর পক্ষে বিশেষ আনন্দের বিষয় আমি যখন এম দিই, সেই সময় রবীন্দ্রনাথ কিছু দিনের জন্য বিলেত গিয়েছিলেন, যার বিবরণ তাঁ যুরোপ-যাত্রীর ডায়রিতে পাওয়া যায় তিনি বিলাত থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আমার এম পরীক্ষার ফল বোধ হয় প্রকাশিত হয়

এর পর সুরেশচন্দ্র কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত 'সাহিত্য'পত্রিকায় Prosper Merimée-র 'Etruscan vase' নামক একটি গল্প তর্জমা করে 'ফুলদানি' নাম দিয়ে প্রকাশ করি সেটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ 'সাধনা'য় আমাকে আক্রমণ করেন দুটি কারণে, প্রথমত 'ফুলদানি'র মতো গল্প বঙ্গসাহিত্যের অন্তর্ভূত করা অনুচিত বলে, দ্বিতীয়ত পাকা ফরাসি লেখকের লেখা কাঁচা বাংলা লেখকের অনুবাদে শ্ৰীশ্ৰষ্ট করা হয়েছে বলে আমি শেষোক্ত আপত্তি গ্রাহ্য করি কিন্তু জাতীয় গল্প যে বঙ্গসাহিত্যে চলতে পারে না, সে কথা মাননি আমি অবশ্য সে সমালোচনা পড়ে একটু মনঃক্ষুন্ন হয়েছিলুম কারণ রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে রকম সমালোচনা আশা করিনি তার পরেই আমি মেরিমে- 'কামেন' তৰ্জমা করি কিন্তু সেটি শেষ করতে পারিনি বলে প্রকাশ করিনি কার্মেন অনুবাদ করবার কারণ, তার বিষয়বস্তু 'ফুলদানি'র চাইতে ঢের বেশি -সামাজিক সাহিত্যিক শুচিবাই প্রথম থেকেই আমার ধাতে ছিল না, এবং প্যুরিটানিজ্‌মকে আমি কোন কালে একটা গুণের মধ্যে গণ্য করিনি তার পরিচয় আমার 'জয়দেব' নামক প্রবন্ধেও পাবেন

এম পাশ করবার পর আমি প্রায় দু-বৎসর বেকার বসেছিলাম কিছু দিন পর আমি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে state scholarship নেব কি না, তাই জানবার জন্য একখানি পত্র পাই বৃত্তি তারই প্রাপ্য যার বয়স পাঁচশ বৎসরের কম আমি উত্তরে লিখি যে, আমার বয়স পঁচিশের দু-এক মাস বেশি কথা লেখার দরুন রেজিস্ট্রার ম্যান-সাহেব আমার উপর বিরক্ত হন আমি তাঁর অতিশয় প্রিয় ছাত্র ছিলুম এর পর বহরমপুর কলেজের প্রিন্সিপালের চাকরি নিতে রাজি কি না জনবার জন্য তিনি আমাকে চিঠি লেখেন কিন্তু রাজি হইনি তার কিছুদিন পর তিনি আমাকে কুচবেহার কলেজের প্রিন্সিপালের পদ গ্রহণের প্রস্তাব করে লেখেন, তার বেতন মাসিক পাঁচশ টাকা দাদা আমাকে চাকরি নিতে পেড়াপিড়ি করেন কিন্তু আমি ইতস্তত করতে লাগলুম বাবা তখন কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন দাদা তাকে প্রস্তাবের কথা বলেন বাবা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার চাকরি নিতে আপত্তি কী?' আমি বললুম, 'পরের চাকরি করতে আমার মন সরে না' বারা বললেন, ‘প্রমথ যখন বিবাহ করেনি, তখন তার অনিচ্ছায় আমি তাকে পরের চাকরি নিতে বাধ্য করতে চাইনে।' তাই মান-সাহেবের প্রস্তাবও আমি অগ্রাহ্য করলুম

কলেজ থেকে বেরিয়েই পাঁচশ টাকা মাইনের চাকরি কেন যে আমি প্রত্যাখ্যান করলুম, তা বলতে পারিনে সম্ভবত কর্মবিমুখতাই এর প্রকৃত কারণ তারপর আমি জনৈক প্রসিদ্ধ অ্যাটর্নি আশুতোষ ধরের আপিসে articled clerk হই এবং বিলেত যাওয়া পর্যন্ত নামমাত্র সে আপিসেই কাজ কাজ করি|


প্রথম থেকেই আমি আটনি আপিসের চেহারা দেখে ভড়কে যাই। এত ধুলো, আর র‍্যাকের উপর এত মোটা-মোটা ও এত জীর্ণ খাতা ইতিপূর্বে কখনও দেখিনি। আইন হয়তো বই পড়ে শেখা যায়; কিন্তু আইনের কাজকর্ম কী ভাবে চলে, তার অভিজ্ঞতা এই আপিস থেকেই আমি অর্জন করি। আর নানারকম লোককে দেখি। তারা প্রায় সকলেই বাঙাল এবং সম্পত্তি কেনাবেচা ও বন্ধক দেবার দালাল। তাদের ভিতর কেউ সৎ লোক নয়; এবং নানা রকম জুয়োচুরি করতে প্রায় সকলেই প্রস্তুত। এমনকী, একের সম্পত্তি অন্যের বলে বন্ধক দিতেও পিছপা নয়। আমি এই আপিসের দলিল ঘাঁটতে-ঘাঁটতে আবিষ্কার করি যে, কলকাতার কোন বড় বাড়ি দু-তিন পুরুষের বেশি এক পরিবারের সম্পত্তি থাকে না। আদি মালিকেরা প্রায় আর্মানি, ইহুদি বা ইংরেজ। আর আমি অনেক ধনী ছোকরাকে দেখেছি, যারা পাঁচ-ছয় বছরের ভিতর পাঁচ-ছয় লক্ষ টাকা কাপ্তেনি করে উড়িয়ে নিঃস্ব হয়েছে। অ্যাটর্নির আপিসে কাজ করে idealist হওয়া যায় না। এই কারণেই বোধ হয় আমি idealist লেখক নই।

সে যা-ই হোক, এম এ পাশ করলার পর নানা স্থানে, যথা দাৰ্জিলিং, আসানসোল, সীতারামপুরে ঘুরে বেড়াই। দার্জিলিং যাই বরফ দেখবার জন্য, আর সীতারামপুর প্রভৃতিতে ছোটখাটো কয়লার খনি দেখবার জন্য। অর্থাৎ বেকার সময়টাতে আমি কতকটা স্বশিক্ষিত হই। এই সময়ে আমি আবার সংস্কৃত পড়তে আরম্ভ করি। ইস্কুলে মুখস্থ করেছিলুম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উপক্রমণিকা ও কলেজে ব্যাকরণ কৌমুদী। এ দুখানি ব্যাকরণের যে-অংশ আমার মনে ছিল, তাতে সংস্কৃত পাঠের বিশেষ সাহায্য হয়েছিল।


সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।