:::: সূচীপত্র ::::
ভ্রমণ - বিলেত যাত্রা -২ 

বিকেলে ঝড় উঠল সমুদ্রের জল তোলপাড় করতে লাগল

সঙ্গে-সঙ্গে জাহাজও নাচতে শুরু করলে নৃত্য লাস্য নয় তাণ্ডব ঢেউয়ের পিঠে চড়ে, উপরে উঠে পরক্ষণেই নিচে পড়ে একে বলে 'পিচ' করা, 'রোল' নয় এর ফলে প্রথমে গা-বমি করে, তারপরে শয্যাশায়ী হতে হয় শরীরের এই অবস্থার নাম সি-সিকনেস সে অসুখ যে কী কষ্টকর, যিনি নিজে তা ভোগ করেননি, তাকে কথায় বোঝানো যায় না আমি সেদিন সন্ধ্যা থেকে শয্যাত্যাগ করতে পারিনি; পরের দিনও অবস্থা প্রায় সমানই ছিল জাহাজে আরোহী খুব কম ছিল সবে পাঁচ-ছয় জন মাত্র তার ভিতর আমার পূর্বপরিচিত একটি বাঙালি ভদ্রলোক ছিলেন নাম শশী মুখুজ্যে তিনি ভাগলপুরের উকিল এবং W C Bonnerjee- ভগ্নীপতি, তিনি বার বার আমার ঘরে এসে খোঁজ নিতে লাগলেন কেমন আছি একটি ইংরেজ সহযাত্রী নাম বোধ হয় General Channing– আমাকে এসে বললেন, ' রোগের কোন ওষুধ নেই, তবে তুমি যদি একটু-একটু শ্যাম্পেন sip করো, তা হলে এই বমির ভাবটা কিছু কমে যেতে পারে।' অপর এক সহযাত্রী ছিলেন সেকালের মেডিকাল কলেজের প্রিন্সিপাল নাম বোধ হয় Dr Birch. তিনি এসে বললেন, 'শ্যাম্পেনে তোমার রোগ সারবে না সমুদ্রের এই তোলপাড় বন্ধ হলেই তোমার অসুখ সেরে যাবে।'
তার দু-দিন পরেই আমরা কলম্বোয় উপস্থিত হলুম শশীবাবু বললেন, 'শুনলুম কলম্বোয় আমাদের দিন-তিনেক থাকতে হবে অষ্ট্রেলিয়া থেকে একটি জাহাজ আসবে, সেই জাহাজের জনকতক আরোহীকে আমাদের জাহাজে তুলে নিতে হবে' তারপর তিনি প্রস্তাব করলেন যে, আমাকে তাঁর সঙ্গে গিয়ে Galle Face হোটেলে তাঁর অতিথিস্বরূপ থাকতে হবে আমি সেই হোটেলে গিয়ে উঠলুম, যদিও সেখানে খরচা বেশি, তিনি আমাকে তাঁর পুত্র সতীশকে প্রথম দিনটা কলম্বো ঘুরে দেখতে বললেন কলম্বোয় দেখবার বিশেষ কিছু নেই; শুধু একটি ছোটখাটো মন্দিরে বুদ্ধমূর্তি দেখে চমৎকৃত হয়ে যাই এমন শাস্ত এবং নির্বিকার মূর্তি আমি পূর্বে কখনও দেখিনি সন্ধ্যাবেলা আমি সতীশ Cinnamon Gardens দেখতে যাই এবং গুটিকতক ছোট-ছোট মরকুট্টে গাছ দেখে চলে আসি হোটেলটি আমার খুব ভালো লেগেছিল বড়-বড় ঘর, সমুদ্রের ধারে সেখানে একটি breaker ছিল, আর দিবারাত্র তার আওয়াজ কানে আসত আমি এই প্রথম অনুভব করলুম যে, টেনিসনের Break, break, break ছোট্ট কবিতাটি কত দূর সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী। যথার্থ কবি ছাড়া আর কেউ এটি লিখতে পারত না। সমুদ্রের তটভূমির গায়ে ঢলে পড়ার অবিরত মৃদুধ্বনি মনকে উদাস করে দেয়।

আমার বাবার বন্ধু শশীবাবু বোধ হয় তার পরদিন আমাকে কান্ডি নিয়ে যান। ক্যান্ডি একটি পাহাড়ের উপর অতি সুন্দর জায়গা। এইখানেই ভগবান বুদ্ধের দন্ত রক্ষিত আছে। স্থানটি অতি মনোরম। ইংরেজি সভ্যতা এই বৌদ্ধ আশ্রমকে প্রায় আক্রমণ করেছে। বৌদ্ধ মন্দিরের অব্যবহিত পূর্বে দেখলুম একটি মাংসের দোকানে বড়-বড় গরুর ঠাং ঝুলছে। দৃশ্য দেখে আমার মন একেবারে বিগড়ে গেল। মনে হল, ক্যান্ডি ছিল একটি বৌদ্ধক্ষেত্র, ক্রমে হয়ে উঠেছে রাবণের রাক্ষসপুরী। আমরা সেই দিনই কলম্বোয় ফিরে এলুম। পরের দিন শশীবাবু আমাকে কলম্বো থেকে কিছু দূরে আর-একটি নতুন হোটেল দেখাতে রেলে করে নিয়ে গেলেন। নামটি ঠিক মনে নেই। সেটি একেবারে সমুদ্রের ভিতর থেকে গেঁথে তোলা। ইংরেজরা আরাম জিনিসটা বোঝে। সেদিনই কিংবা তার পরের দিনই আমি কলম্বো ত্যাগ করলুম।

রাত বারোটায় জাহাজ ছাড়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমরা ভারত সাগরে ভাসছি। Ceylon সম্বন্ধে আমার তিন-চার দিনের অভিজ্ঞতা এই :  জনগণ সবই বাঙালির মতো দেখতে। তাদের শরীরে শক্তিও নেই, রূপও নেই। শুধু কান্ডিতে পথচলতি নরনারী অপেক্ষাকৃত হৃষ্টপুষ্ট। সিংহলে গাছপালার পাতার রং আমাদের দেশের মতো ঘোর সবুজ নয়, কচি পাতার মতো ঈষৎ তামাটে। বোধ হয় এই কারণেই সেকালে এই দ্বীপের অপর নাম ছিল তাম্রপর্ণী। ভারত সাগর সম্বন্ধে আমার কিছু -কক্তব্য নেই। সাগর সে সময়ে ছিল একরকম প্রশান্ত সাগর। আমি তাই জল ছাড়া আর কিছু দেখিনি, এবং আবিষ্কার করি যে, সমুদ্রের রং নীল নয়, সবুজ। আমি সি-সিকনেসের জের টেনে চলেছিলুম। অর্থাৎ সমস্ত দিনই গা-বমি করত। স্টিমারের একটা বিশ্রী গন্ধ আছে। বোধ হয় এঞ্জিনের কয়লার ধোঁয়া রান্নাঘরের মাছ-মাংস রান্নার গন্ধ মিলিয়ে এই অপ্রীতিকর গন্ধের সৃষ্টি হয়। Red sea- মুখে প্রথম এডেন শহরে গিয়ে নামি। অমন sunburnt শহর আমি পূর্বে কখনও দেখিনি। সমস্ত শহর এবং তার বাড়িঘরদোরের রং সব পোড়ামাটির, অর্থাৎ আমাদের দেশের হাঁড়িকলসীর রং। রাস্তায় বেদুইন দেখেছি, তারাও দেখতে বাঙালিরই মতো। কেবল তাদের রং বোধ হয় বাঙালির চেয়ে ফরসা। কিন্তু রোদের তাতে তাদের চামড়া সব কলসে কুঁচকে গিয়েছে।


সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।