ভ্রমণ (বিলেত যাত্রা)
রাজশাহী থেকে নাটোর ফিরে আসবার পর দাঁতের ব্যথায় রবীন্দ্রনাথ অতি কাতর হয়ে পড়েন। এবং মহারাজ যদু লাহিড়ী নামে তাঁর একটি আমলাকে তাঁর তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত করেন। যদু তিন দিন তিন রাত অবিরত তাঁর শুশ্রূষা করে। রবীন্দ্রনাথ ভালো হয়ে উঠলে তিনি ও আমি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করবার সংকল্প করি। কারণ ইতিমধ্যে আমি বাড়ি থেকে চিঠি পাই যে, হরিপুরে ওলাউঠার প্রকোপ হয়েছে, আমার সেখানে যাওয়া উচিত নয়। এম এ পাস করবার পর যে দু-বৎসর আমি বাড়ি বসেছিলুম, সে দু-বৎসরে আমি নানারকম অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ছিলুম কলেজের ছোকরা, হয়ে উঠলুম একটি সামাজিক যুবক। আমি ছেলেবেলা থেকেই সঙ্গীতপ্রিয় ছিলুম। মহারাজা ছিলেন যথেষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ও চমৎকার মৃদঙ্গ এবং বাঁয়া তবলা-বাজিয়ে। আমি মহারাজার সঙ্গে তাঁর সমবস্থ কলকাতায় বহু লোকের পরিচয় করিয়ে দিই। এবং তিনিও বাংলার বহু পাড়াগেঁয়ে বড় জমিদারের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন। ফলে বাংলা দেশের idle rich দলের হালচাল সম্বন্ধে আমি ওয়াকিবহাল হই। মহারাজ এ দলের ভিতর unique ছিলেন। কথাবার্তায় তিনি ছিলেন অতি সুরসিক, এবং repartee-তে সিদ্ধহস্ত, একরকম ধনুর্ধর বললেই হয়। আমি তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে আপোসে তলোয়ার খেলতুম। কিন্তু আমরা পরস্পরের উত্তর-প্রত্যুত্তরে কখনও পরস্পরকে আঘাত করিনি। এর থেকে যেন কেউ মনে না-ভালেন যে, আমি সোজা কথা বাঁকা করে বলতে মহারাজার কাছে শিখেছি। আমি আসলে কৃষ্ণনাগরিক। আমি অল্পবয়স থেকেই কথার মারপ্যাঁচ কাকে বলে তা জানতুম।
আমরা রাজশাহী গিয়েছিলুম বোধ হয় শীতকালে। তারপর গ্রীষ্মকালে তৃতীয় বার দাৰ্জিলিং যাই, আর তিন-চার মাস সেখানে থাকি। সঙ্গে ছিলেন বৌঠান (প্রতিভা দেবী), আমার দিদি (প্রসন্নময়ী দেবী) এবং আমার একটি পিসতুতো ভাই প্যারীমোহন সান্যাল। এক মাস আমি একরকম ঘোড়ার উপরেই ছিলুম। বর্ধমান এস্টেটের ম্যানেজার ফণী মুখুজ্যের দুটি ঘোড়া ছিল, একটি এস্টেটের, অপরটি তাঁর নিজস্ব। একটিতে চড়তেন ফণী, আর-একটিতে আমি। আমরা দু-জনে সকাল-সন্ধা ঘোড়া দাবড়ে ঘুরে বেড়াতুম। কখনও যেতুম সিঞ্চল, কখনও যেতুম দার্জিলিঙের সন্নিকট কোন-না-কোন চা-বাগানে। সে সব জায়গায় থাকত অসংখ্য জোঁক। আমাদের পায়ে পট্টি জড়ানো থাকত, কিন্তু বাড়ি ফিরে এসে দেখতুম পট্রির উপরেও জোঁক ঝুলছে। আমি ভালো ঘোড়সওয়ার ছিলুম না, কিন্তু ঘোড়া থেকে অদ্যাবধি কখনও পড়িনি। তার একটি কারণ আমার শরীর ছিল হালকা, আমি জিনের উপর শরীরের balance রাখতে পারতুম। দার্জিলিঙে ঘোড়ায় চড়া বোধ হয় নিরাপদ। আমি পরে অসম্ভব স্থূলকায় বাঙালি ভদ্রলোকদের ভুটিয়া টাট্টু ঘোড়ায় যাতায়াত করতে দেখেছি। সে যাত্রায় প্যারীদাদা আমাদের সঙ্গে একটি টাট্টুতে চড়ে রঙ্গিত যান। রঙ্গিত দাৰ্জিলিং থেকে বোধ হয় দশ-বারো মাইল দূরে ও আগাগোড়া ওতরাই। অবশ্য তাঁর সইস ঘোড়ার লেজ ধরে সঙ্গে-সঙ্গে দৌড়চ্ছিল। তিনিও নিরাপদে রঙ্গিত নদীর ধারে গিয়ে পৌছেন। রঙ্গিতের উপর সেকালে দড়ির কিংবা বেতমোড়া একটি ঝোলানো ব্রিজ ছিল, যেটি পার হয়ে সিকিমে যাওয়া যেত। সিকিমের মেয়েরা দেখতে অতি সুন্দর।
এবার দাৰ্জিলিং থেকে ফিরে এসে অল্পদিনের ভিতর বিলেত যাই। যত দূর মনে পড়ে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর আমি বিলেত যাত্রা করি। ১৭ অক্টোবর তারিখটা বোধ হয় ভুল নয়, কারণ ঐ তারিখেই বছরের পর বছর আমার জীবনে এমন একটা কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা কখনও দুঃখের, কখনও বা সুখের কারণ হয়েছে। বিলেতে যাওয়াটা আমার পক্ষে সৌভাগ্যের কথা কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। বিলেত না-গেলেও আমি এখন যা আছি তা-ই থাকতুম। আমি বিলেতে কোন বিশেষ বিষয়ে লেখাপড়া শিখতে যাইনি। দাদা আমাকে বিলেত যাত্রা সম্বন্ধে খুব উৎসাহ দেন। তিনি বলেন, ও একবার বিলেত গেলে he will get a fresh
lease of life. আমাকে তিনি বলেন, 'বিলেত গিয়ে যেন কোন য়ুনিভারসিটিতে ভরতি হয়ো না, তা হলে তুমি এ দেশে যেমন কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেছ, সেই রকম পাস করবার চেষ্টা করবে, আর তাতে তোমার শরীর আরও ভেঙে পড়বে। ব্যারিস্টারি পাশ করা কিছু নয়, সে পরীক্ষায় তুমি অনায়াসে উতরে যাবে।' এর থেকে বুঝতে পারছেন যে, সেকালে আমার দেহ ছিল অতি কৃশ। কিন্তু বিলেতে যত দিন ছিলুম আমি একদিনের জন্যেও কোন অসুখে পড়িনি। অবশ্য আমি কোন ডিগ্রি নিয়ে ফিরিনি, ফিরেছিলুম কতকটা হৃষ্টপুষ্ট এবং ব্যারিস্টারি পাশ করে।
আমি প্রসন্নমনে বিলেত যাত্রা করিনি। বাবা পক্ষাঘাত রোগে শয্যাশায়ী ছিলেন। দেশে ফিরে হয়তো তাঁকে আর দেখতে পাব না, এই ভয় ছিল। উপরন্তু তিন-চার বছরের জন্য দেশ ছেড়ে যাবার সময়ে বোধ হয় সকলেরই মন অকারণে খারাপ হয়। আমাকে জাহাজে তুলে দিতে গিয়েছিলেন আমার সেজদা কুমুদনাথ চৌধুরী, আর আমার বন্ধু নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়। আমার দাদা আশুতোষ চৌধুরী সে ক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন কি না ঠিক মনে নেই। জাহাজখানি ছোট্ট। ৩৫০০ টনের বেশি নয়। আমাদের কাপ্তেন পথিমধ্যে আমাকে বলেছিলেন যে, এইখানি বোধ হয় P & O কোম্পানির সবচেয়ে ভালো জাহাজ। বহুকাল সমুদ্রে- ভাসছে, কিন্তু এ জাহাজের কখনও কোন বিপদ হয়নি। গঙ্গাসাগরের মোহনা পেরিয়ে বেলা বারোটা-একটায় মহাসমুদ্রে অবতরণ করলুম। মহাসমুদ্র দেখে আমার প্রথমে মহা আনন্দ হয়। বিকেলের দিকে খালাসিরা দেখি মাস্তুল থেকে সব পাল খুলে ফেলছে। আমি কাপ্তেনকে জিজ্ঞেস করলুম, 'এর অর্থ কী?' তিনি বললেন, 'আমরা ব্যারোমিটার দৃষ্টে মনে করছি যে, একটি ছোটখাটো ঝড় আসছে, তাই আগে থাকতে জাহাজকে সামাল করে নিচ্ছি।'
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই,
ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।