৬৮
শ্যামা-পক্ষী
আঁধার পিঞ্জরে তুই, রে কুঞ্জ-বিহারি
বিহঙ্গ, কি রঙ্গে গীত গাইস্ সুস্বরে?
ক মোরে, পূৰ্ব্বের সুখ কেমনে বিস্মরে
মনঃ তোর ? বুঝা রে, যা বুঝিতে না পারি !
সঙ্গীত-তরঙ্গ-সঙ্গে মিশি কি রে ঝরে
অদৃশ্যে ও কারাগারে নয়নের বারি?
রোদন-নিনাদ কি রে লোকে মনে করে
কে ভাবে, হৃদয়ে তোর কি ভাব উথলে ? —
কবির কুভাগ্য তোর, আমি ভাবি মনে।
দুখের আঁধারে মজি গাইস্ বিরলে
তুই, পাখি, মজায়ে রে মধু-বরিষণে !
কে জানে যাতনা কত তোর ভব-তলে ?
মোহে গন্ধে গন্ধরস সহি হুতাশনে!১
৬৯
দ্বেষ
শত ধিক্ সে মনেরে, কাতর যে মনঃ
পরের সুখেতে সদা এ ভব-ভবনে !
মোর মতে নর-কুলে কলঙ্ক সে জন
পোড়ে আঁখি যার যেন বিষ-বরিষণে,
বিকশে কুসুম যদি, গায় পিক-গণে
বাসন্ত আমোদে পূরি ভাগ্যের কানন
পরের! কি গুণ দেখে, কব তা কেমনে,
প্রসাদ তোমার, রমা, কর বিতরণ
তুমি ? কিন্তু এ প্রসাদ, নমি যোড় করে
মাগি রাঙা পায়ে, দেবি ; দ্বেষের অনলে
(হে মহানরক ভবে!) সুখী দেখি পরে,
দাসের পরাণ যেন কভু নাহি জ্বলে,
যদিও না পাত তুমি তার ক্ষুদ্র ঘরে
রত্ম সিংহাসন, মা গো কুভাগ্যের বলে !
৭০
বসন্তে কানন-রাজি সাজে নানা ফুলে,
নব বিধুমুখী বধূ যাইতে বাসরে
যেমতি ; তবু সে নদ, শোভে যার কুলে
সে কানন, যদ্যপিও তার কলেবরে
নাহি অলঙ্কার, তবু সে দুখ সে ভুলে
পড়শীর সুখ দেখি ; তবুও সে ধরে
মূৰ্ত্তি তার হিয়া-রূপ দরপণে তুলে
আনন্দে ! আনন্দ-গীত গায় মৃদু স্বরে ! —
হে রমা, অজ্ঞান নদ, জ্ঞানবান্ করি,
সৃজেছেন দাসে বিধি ; তবে কেন আমি
তব মায়া, মায়াময়ি, জগতে বিস্মরি,
কু-ইন্দ্রিয়-বশে হব এ কুপথ-গামী ?
এ প্রসাদ যাচি পদে, ইন্দিরা সুন্দরি,
দ্বেষ-রূপ ইন্দ্রিয়ের কর দাসে স্বামী ।
৭১
যশঃ
লিখিনু কি নাম মোর বিফল যতনে
বালিতে, রে কাল, তোর সাগরের তীরে ?
ফেন-চূড় জল-রাশি আসি কি রে ফিরে,
মুছিতে তুচ্ছেতে ত্বরা এ মোর লিখনে ?
অথবা খোদিনু তারে যশোগিরি-শিরে,
গুণ-রূপ যন্ত্রে কাটি অক্ষর সুক্ষণে, —
নারিবে উঠাতে যাহে, ধুয়ে নিজ নীরে,
বিস্মৃতি, বা মলিনিতে মলের মিলনে ? —
শূন্য-জল জল-পথে জলে লোক স্মরে ;
দেব-শূন্য দেবালয়ে অদৃশ্যে নিবাসে
দেবতা ; ভস্মের রাশি ঢাকে বৈশ্বানরে।
সেই রূপে, ধড় যবে পড়ে কাল-গ্রাসে,
যশোরূপাশ্রমে প্রাণ মর্ত্ত্যে বাস করে ; —
কুযশে নরকে যেন সু্যশে—আকাশে।
১. অগ্নিদাহন সহ্য করেও ধূপ গন্ধ বিতরণ করে এবং মুগ্ধ করে।