ভদ্র জীবিকা
বাংলার
ভদ্রলোকের দুরবস্থা হইয়াছে তাহাতে দ্বিমত নাই। দেশের অনেক মনীষী প্রতিকারের উপায়
ভাবিতেছেন এবং জীবিকা নির্বাহের নূতন পন্থা নির্দেশ করিতেছেন। কিন্তু বর্তমান
সমস্যার সমাধান যে উপায়েই হউক, তাহা শীঘ্ৰ ঘটিয়া উঠিবে না। রোগের বীজ
ধীরে ধীরে সমাজে ব্যাপ্ত হইয়াছে, ঔষধনির্বাচন মাত্রই রোগমুক্তি হইবে না।
সতর্কতা চাই, ধৈর্য চাই, উপায়ের
প্রতি শ্রদ্ধা চাই। রোগের নিদান একটি নয়, নিবারণের
উপায়ও একটি হইতে পারে না। যে যে উপায়ে প্রতিকার সম্ভবপর বোধহয় তাহার প্রত্যেকটি
সাবধানে নির্বাচন করা উচিত, নতুবা ভুল পথে গিয়া দুর্দশার কালবৃদ্ধি
হইবে।
দুর্দশা
কেবল ভদ্রসমাজেই বর্তমান এমন নয়। কিন্তু সমগ্র বাঙালীসমাজের অবস্থার বিচার আমার
উদ্দেশ্য নয়, সেজন্য কেবল তথাকথিত ভদ্রশ্রেণীর কথাই বলিব। ‘ভদ্র’
বলিতে যে শ্রেণী বুঝায় তাহাতে হিন্দু মুসলমান খ্ৰীষ্টান সকলেই আছেন।
অন্যধর্মীয় ভদ্রসমাজে ঠিক কি ভাবে পরিবর্তন ঘটিয়াছে তাহা আমার জানা নাই, সেজন্য
হিন্দু ভদ্রের কথাই বিশেষ করিয়া বলিব। প্রতিকারের পন্থা যে সকলের পক্ষেই সমান
তাহা বলা বাহুল্য।
শতাধিক বৎসর পূর্বে ‘ভদ্র’ বলিলে কেবল ব্রাহ্মণ বৈদ্য কায়স্থ ও অপর কয়েকটি সম্প্রদায় মাত্র বুঝাইত। ভদ্রের উৎপত্তি প্রধানত জন্মগত হইলেও একটা গুণকৰ্মবিভাগজ বিশিষ্টতা সেকালেও ছিল। ভদ্রের প্রধান বৃত্তি ছিল—জমিদারি বা জমির উপস্বত্ব ভোগ, জমিদারের অধীনে চাকরি অথবা তেজারতি। বহু ব্রাহ্মণ যাজন ও অধ্যাপনা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন, অধিকাংশ বৈদ্য চিকিৎসা করিতেন। ভদ্রশ্রেণীর অল্প কয়েকজন রাজকার্য করিতেন, এবং কদাচিৎ কেহ কেহ নবাগত ইংরেজ বণিকের অধীনে চাকরি লইতেন। বাণিজ্যবৃত্তি নিম্নতর সমাজেই আবদ্ধ ছিল। ভদ্র গৃহস্থ প্রতিবেশী ধনী বণিককে অবজ্ঞার চক্ষুতেই দেখিতেন। উভয় গৃহস্থের মধ্যে সদভাব থাকিলেও ঘনিষ্ঠতা ছিল না। উচ্চবর্ণের লোকেরা জমিদারি এবং মামলা পরিচালনের দক্ষতাকেই বৈষয়িক বিদ্যার পরাকাষ্ঠা মনে করিতেন, প্রতিবেশী বণিক কোন্ বিদ্যার সাহায্যে অর্থ উপার্জন করিতেছেন তাহার সন্ধান লইতেন না। বণিকের জাতিগত নিকৃষ্টতা এবং অমার্জিত আচার-ব্যবহারের সঙ্গে তাহার অর্থকরী বিদ্যাও ভদ্রসমাজে উপেক্ষিত হইত। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এখনও বর্তমান, কেবল প্রভেদ এই—বাঙালী বণিকও তাহাদের বংশপরম্পরালব্ধ বিদ্যা হারাইতে বসিয়াছেন। আর যাহারা ভদ্র বলিয়া গণ্য তাহারা এতদিন তাঁহাদের অতি নিকট প্রতিবেশীর কার্যকলাপ সম্বন্ধে অন্ধ থাকিয়া আজ হঠাৎ আবিষ্কার করিয়াছেন যে ব্যবসায় না শিখিলে তাহাদের আর চলিবে না।
একালের তুলনায় সেকালের ভদ্রলোকের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। কিন্তু তখন বিলাসিত কম ছিল, জীবনযাত্রাও অল্পব্যয়ে নির্বাহ হইত। ইংরেজী শিক্ষার প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশে এক যুগান্তর আসিল। বাঙালী বুঝিল—এই নূতন বিদ্যায় কেবল জ্ঞানবৃদ্ধি নয়, অর্থাগমেরও সুবিধা হয়। কেরানীযুগের সেই আদি কালে সামান্য ইংরেজী জ্ঞান থাকিলেই চাকরি মিলিত। অনেক ভদ্রসন্তানেরই সেরেস্তার কাজের সহিত বংশানুক্ৰমে পরিচয় ছিল, সুতরাং সামান্য চেষ্টাতেই তাহারা নূতন কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠালাভ করিলেন। জনকতক অধিকতর দক্ষ ব্যক্তির ভাগ্যে উচ্চতর সরকারী চাকরিও জুটিল। আবার যাহারা সর্বাপেক্ষা সাহসী ও উদযোগী তাহারা নূতন বিদ্যা আয়ত্ত করিয়া ওকালতি ডাক্তারি প্রভৃতি স্বাধীন বৃত্তি অবলম্বন করিলেন। তখন প্রতিযোগিতা কম ছিল, অর্থাগমের পথও উন্মুক্ত ছিল। এইরূপে ইংরেজী শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রশ্রেণী নূতন জীবিকার সন্ধান পাইলেন। বাঙালী ভদ্রসন্তানই ইংরেজী শিক্ষায় অগ্রণী ছিলেন, সুতরাং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হইতে তাঁহাদের সাদর নিমন্ত্রণ আসিতে লাগিল। অর্থাগম এবং ইংরেজের অনুকরণের ফলে বিলাসিতা বাড়িতে লাগিল, জীবনযাত্রার প্রণালীও ক্রমশ পরিবর্তিত হইতে লাগিল। এই সকল নূতন ধনীর প্রতিপত্তি সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। ইহাদের উপার্জনের পরিমাণ যাহাই হউক, কিন্তু কি বিদ্যা! কেমন চালচলন। ভদ্রসন্তান দলে দলে এই নূতন মার্গে ছুটিল। সেকালে নিষ্কমা ভদ্রলোকের সংখ্যা এখনকার অপেক্ষা বেশী ছিল, কিন্তু একান্নবর্তী পরিবারে একজনের রোজগারে অনেক বেকারের ভরণপোষণ হইত। সভ্যতা ও বিলাসিতা বৃদ্ধির সঙ্গে উপার্জকের নিজ খরচ বাড়িয়া চলিল, বেকারগণ অবজ্ঞাত হইতে লাগিলেন। এতদিন যাহারা আত্মীয়ের উপর নির্ভর করাই স্বাভাবিক মনে করিতেন, অভাবের তাড়নায় তাহারাও চাকরির উমেদার হইলেন। অপর শ্রেণীর লোকেরাও পৈতৃক ব্যবসায় ছাড়িয়া সম্মান বৃদ্ধির আশায় ভদ্রের পদানুসরণ করিতে লাগিলেন।
ভদ্রের
প্রাচীন সংজ্ঞার্থ পরিবর্তিত হইল। ভদ্রতার লক্ষণ দাড়াইল— জীবনযাত্রার
প্রণালী বিশেষ। ভদ্রতালাভের উপায় হইল—বিশেষ-প্রকার
জীবিকা গ্রহণ। এই জীবিকার বাহন হইল স্কুল-কলেজের বিদ্যা, এবং জীবিকার
অর্থ হইল—উক্ত বিদ্যার সাহায্যে যাহা সহজে পাওয়া যায়,
যথা —চাকরি।
নূতন কূপের
সন্ধান পাইয়া কয়েকটি ভদ্রমন্ডুক সেখানে আশ্রয় লইয়াছিল। কিন্তু কূপের মহিমাও
ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল, মাঠের মন্ডুক হাটের মন্ডুক দলে দলে কূপের
মধ্যে ঝাঁপ দিয়া ভদ্রতালাভ করিল। কূপমণ্ডকের দলবৃদ্ধি হইয়াছে কিন্তু আহার্য
ফুরাইয়াছে।
ভদ্রের
সংখ্যা বাড়িয়া গিয়াছে। সকল জীবিকা ভদ্রের গ্রহণীয় নয়, কেবল
কয়েকটি জীবিকাতেই ভদ্রতা বজায় থাকিতে পারে। সেকালের তুলনায় এখন ভদ্রোচিত
জীবিকার সংখ্যা অনেক বাড়িয়াছে, কিন্তু ভদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে
বাড়ে নাই। কেতাবী বিদ্যা অর্থাৎ স্কুল-কলেজে লব্ধ বিদ্যা যে জীবিকায় প্রয়োগ করা
যায় তাহাই সর্বাপেক্ষা লোভনীয়। কেরানীগিরির বেতন যতই অল্প হউক, ওকালতিতে
পসারের সম্ভাবনা যতই কম হউক, তথাপি এসকলে একটু কেতাবী বিদ্যা খাটাইতে
পারা যায়। মুদিগিরি, পুরানো লোহা বিক্রয় বা গরুর গাড়ির
ঠিকাদারিতে বিদ্যা-প্রয়োগের সুযোগ নাই, সুতরাং এসকল
ব্যবসায় ভদ্রোচিত নয়। কিন্তু কেতাবী বৃত্তিতে যখন আর অন্নের সংস্থান হয় না তখন
অপর বৃত্তি গ্রহণ ভিন্ন উপায় নাই। নিতান্ত নাচার হইয়া বাঙালী ভদ্রসন্তান ক্রমশ
অকেতাবী বৃত্তিও লইতে আরম্ভ করিয়াছে, কিন্তু খুব সন্তপণে
বাছিয়া লইয়া। যে বৃত্তি পুরাতন এবং নিম্নশ্রেণীর সহিত জড়িত তাহা ভদ্রের অযোগ্য।
কিন্তু যাহার নূতন আমদানি হইয়াছে কিংবা যাহার ইংরেজী নামই প্রচলিত, সেরূপ
বৃত্তিতে ভদ্রতার তত হানি হয় না। ছুতারের কাজ, ধোবার কাজ,
কোচমানি, মুদিগিরি চলিবে না; কিন্তু ঘড়ি
বা বাইসিকেল মেরামত, নক্শা আঁকা, ডাইং-ক্লিনিং,
চা-এর দোকান, মাংসের হোটেল, স্টেশনারি
শপ—এসকলে আপত্তি নাই, কারণ সমস্তই আধুনিক বা ইংরেজী নামে
পরিচিত।
কিন্তু
এইসকল নুতন বৃত্তিতে বেশী রোজগার করা সম্ভব নয়। দরিদ্র ভদ্রসন্তান উহা গ্রহণ
করিয়া কোনও রকমে সংসার চালাইতে পারে, কিন্তু যাহাদের
উচ্চ আশা তাহারা কি করিবে? চাকরি দূর্লভ, উকিলে দেশ ছাইয়া গিয়াছে, ডাক্তারিতে
পসার অনিশ্চিত, এঞ্জিনিয়ার প্রফেসার প্রভৃতি বিদ্যাজীবীর পদও
বেশী নাই। বিলাতে অনেকে পাদরী হয়, সৈনিক হয়, নাবিক
হয় কিন্তু বাঙালীর ভাগ্যে এসকল বৃত্তি নাই।
বাঙালী
ভদ্রলোক অন্ধকূপে পড়িয়াছে, তাহার চারিদিকে গণ্ডি। —গন্ডি
অতিক্ৰম করিয়া বাহিরে আসিতে সে ভয় পায়, কারণ সেখানে
সমস্তই অজ্ঞাত অনিশ্চিত। কে তাহাকে অভয়দান করিবে ?
অনেকেই বলিতেছেন—অর্থকরী
বিদ্যা শিখাও, ইউনিভার্সিটির পাঠ্য বদলাও। ছেলেরা অল্পবয়স হইতে
হাতে-কলমে কাজ করিতে শিখুক, তাহার পর একটু বড় হইয়া বৈজ্ঞানিক
প্রণালীতে শিল্প-উৎপাদন শিখুক। যাহারা বিজ্ঞান বোঝে না তাহারা banking,
accountancy, economics প্রভৃতিতে মন দিক। দেশে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার
হইলেই বেকারের সমস্যা কমিবে।
উত্তম কথা,
কিন্তু অতি বৃহৎ কার্য। রোগ নির্ণয় হইয়াছে ঔষধের ফর্দও প্রস্তুত,
কিন্তু এখনও অনেক উপকরণ সংগ্রহ হয় নাই, মাত্রাও
স্থির হয় নাই, রোগীকে কেবল আশ্বাস দেওয়া হইতেছে। ঔষধ সেবনে যদি
বাঞ্ছিত সুফল না হয় তবে সে নিরাশায় মরিবে। অতএব প্রত্যেক উপকরণের ফলাফল বিচার
কর্তব্য, যাহাতে রোগীর কাছে সত্যের অপলাপ না হয়।
প্রথম
ব্যবস্থা—সাধারণ বিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের হাতে-কলমে কাজ
শেখানো। আমার যতটা জানা আছে, এই কাজের প্রচলিত অর্থ—ছুতারের
কাজ, কামারে কাজ, দরজীর কাজ, সুতা কাটা, তাঁত বোনা, নক্শা করা ও কৃষি। যে সকল ছাত্রের ঐ জাতীয় কাজ কৌলিক
ব্যবসায়, কিংবা যাহারা ভবিষ্যতে ঐ কাজ বৃত্তিস্বরূপ গ্রহণ
করিবে, তাহদের পক্ষে উক্ত প্রকার শিক্ষা নিশ্চয় হিতকর। যাহারা অবস্থাপন্ন এবং
রোজগার সম্বন্ধে উচ্চ আশা রাখে, তাহারাও উপকৃত হইবে, কারণ
মনুষ্যত্ব বিকাশের জন্য যেমন বুদ্ধির পরিচর্যা ও ব্যায়ামশিক্ষা আবশ্যক, হাতের
নিপুণতা তেমনই আবশ্যক। কিন্তু উচ্চাভিলাষী ছাত্রের পক্ষে এই প্রকার শিক্ষা কেবল
গৌণভাবেই হিতকর, মুখ্যভাবে উপার্জনের কোনও সহায়তা করিবে না।
দ্বিতীয়
ব্যবস্থা—বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে শিল্পশিক্ষা। Mechanical
ও electrical engineering, agriculture, surveying, banking,
accountancy ইত্যাদি শিখাইবার ব্যবস্থা অল্পবিস্তর আছে। এখন কয়েকপ্রকার নুতন শিল্প
শিখাইবার চেষ্টা হইতেছে, যথা—চামড়া,
সাবান, কাচ, চীনামাটির জিনিস,
বিবিধ রাসায়নিক দ্রব্য প্রভৃতি তৈয়ারি এবং সুতা ও কাপড় রং করার
প্রণালী। উদ্দেশ্য এই যে দেশে অনেক নুতন ব্যবসায় ও শিল্পের প্রতিষ্ঠা দ্বারা
শিক্ষিত ভদ্রসন্তানের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত হইবে। উল্লিখিত কয়েকটি বিদ্যা, যথা-engineering,
accountancy ইত্যাদি শিখিলে চাকরির ক্ষেত্র কিঞ্চিৎ বিস্তৃত হয় সন্দেহ নাই। কিন্তু
ব্যবসায় ও শিল্পের প্রতিষ্ঠা কি পরিমাণে হইবে তাহা ভাবিবার বিষয়।