ভদ্র জীবিকা
চল্লিশ-পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে উচ্চশিক্ষা বলিলে
সাধারণত সাহিত্য ইতিহাস দর্শন প্রভৃতি বুঝাইত। ছাত্র ও অভিভাবকগণ যখন দেখিলেন যে,
কেবল এইপ্রকার শিক্ষায় জীবিকালাভ দুর্ঘট, তখন অনেকের মন বিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকিল। একটা অস্পষ্ট ধারণা জন্মিল যে, বিজ্ঞানই হইল প্রকৃত কার্যকরী বিদ্যা; বিজ্ঞান শিখিলেই শিল্পজাত পণ্য উৎপাদন করিবার ক্ষমতা হইবে এবং
ভদ্রসন্তানের জীবিকাও জুটিবে। তখন কাব্য সাহিত্য দর্শনের মায়া ত্যাগ করিয়া ছাত্রগণ দলে দলে
বিজ্ঞান শিখিতে আরম্ভ করিল, বি এস-সি এম এস-সি-তে
দেশ ছাইয়া গেল। কিন্তু কোথায় শিল্প, কোথায় পণ্য?
আত্মীয়স্বজন ক্ষুণ্ণ হইয়া বলিলেন—এত সায়েন্স শিখিয়াও ছোকরা শেষে কেরানী বা
উকিল হইল! হায়, ছোকরা কি করিবে? বিজ্ঞান ও কার্যকরী বিদ্যা এক নয়। কেমিষ্ট্ৰী ফিজিক্স পড়িলেই পণ্য উৎপাদন করা যায় না,
এবং কোনও গতিকে উৎপন্ন করিলেই তাহা বাজারে চলে না।
এখন আমরা ঠেকিয়া শিখিয়াছি যে বিজ্ঞানে পণ্ডিত
হইলেই বিজ্ঞান প্রয়োগে দক্ষতা জন্মে না। সে বিদ্যা আলাদা, যাহাকে বলে
technical education। অতএব উপযুক্ত শিক্ষকের কাছে উপযুক্ত সরঞ্জামের সাহায্যে বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে শিল্প
শিখিতে হইবে। শিক্ষার পদ্ধতি নির্বাচনে ভুল করিয়া পূর্বে হতাশ হইয়াছি, এবারেও কি আশা নাই? সাবান কাচ চামড়া
শিখিয়াও কি শেষে কেরানীগিরি বা ওকালতি করিতে হইবে?
আশা পূর্বেও ছিল, এখনও আছে। কিন্তু আশার মাত্রা অসংযত ছিল তাই ঠিক যাহা চাহিয়াছিলাম তাহা পাই নাই,
এবং এবারেও হয়তো সম্ভাব্যের অতিরিক্ত ফল কামনা করিতেছি।
বিজ্ঞানে শিল্পজাত দ্রব্যের যে উল্লেখ থাকে
তাহা উদাহরণ রূপেই থাকে, উৎপাদনের প্রণালী তন্ন
তন্ন করিয়া বলা হয় না এবং ব্যবসায় সম্বন্ধে কোনও উপদেশ দেওয়া হয় না। বিজ্ঞানপাঠে কয়েকটি
শিল্প সম্বন্ধে একটা স্থূল জ্ঞান লাভ হয়, এবং দেশবাসীর
মধ্যে এই জ্ঞান যত বিস্তৃত হয় শিল্পবৃদ্ধির সম্ভাবনাও তত অধিক হয়। যে সকল কারণ বর্তমান
থাকিলে দেশে শিল্পবৃদ্ধি সহজ হয়, বিজ্ঞানশিক্ষা তাহার
অন্যতম কারণ, প্রধান কারণও বটে, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়।
অনেক বৎসর পূর্বে ইংরেজের মহিমায় মুগ্ধ হইয়া বাঙালী ভাবিয়াছিল— ইংরেজের চালচলন অনুকরণ না করিলে উন্নতির আশা নাই। সে ভ্রম এখন গিয়াছে, বাঙালী বুঝিয়াছে মোটা চালচলনের সঙ্গে বিদ্যা বুদ্ধি উদ্যমের কোন বিরোধ নাই। এখন আবার অনেকে ভ্রমে পড়িয়া ভাবিতেছেন— খোট্টার অধিকৃত ব্যবসায়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে হইলে জীবনযাত্রার প্রণালী অবনত করিতে হইবে এবং মানসিক উন্নতির আশা বিসর্জন দিতে হইবে।
তাহার পর technical education বা শিল্পশিক্ষা। ইহার অর্থ-যে প্রণালীতে শিল্প দ্রব্য উৎপন্ন হয় সেই প্রণালীর
সহিত সাক্ষাৎ পরিচয়। অনেকে মনে করেন ইহাই শিল্প-প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ব্যবস্থা। এই বিশ্বাস কতদূর সংগত তাহা বিচার করিয়া
দেখা উচিত।
বিজ্ঞানে খাদ্য সম্বন্ধে অনেক কথা আছে,
কিন্তু খাদ্য তৈয়ারি বা রন্ধন সম্বন্ধে বিস্তারিত উপদেশ নাই। বিজ্ঞান পড়িলে রন্ধন
শেখা যায় না, তাহার জন্য দক্ষ ব্যক্তির কাছে হাতা-খন্তির
ব্যবহার অভ্যাস করিতে হয়। এই শিক্ষা লাভ করিলে পাচকের চাকরি মিলিতে পারে এবং অবস্থা অনুসারে
অভ্যস্ত রীতির একটু আধটু বদল করিলে মনিবকেও খুশী করা যায়। আয়ব্যয়ের কথা ভাবিতে হয় না, তাহা মনিবের লক্ষ্য। কিন্তু যদি কোনও উচ্চাভিলাষী লোক রন্ধনবিদ্যাকে একটা বড় কারবারে
লাগাইতে চায়, অর্থাৎ হোটেল খুলিয়া জনসাধারণকে রন্ধনশিল্পজাত
পণ্য বিক্রয় করিতে চায়, তবে কেবল পাচকের অভিজ্ঞতাতেই
কুলাইবে না, বিস্তর নূতন সমস্যার সমাধান করিতে হইবে। মূলধন চাই,
উপযুক্ত জায়গায় বাড়ি চাই, উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত মূল্যে কাঁচামাল খরিদ চাই, লোক খাটাইবার ক্ষমতা চাই, যথাকালে বহুলোকের আহার্য
সরবরাহ চাই, হিসাব রাখা, টাকা আদায়, আয়ব্যয় খতাইয়া লাভ-লোকসান নির্ণয় প্রভৃতি
নানা বিষয়ে সূক্ষ্মদৃষ্টি চাই। এই অভিজ্ঞতা কোনও শিক্ষালয়ে পাওয়া যায় না।
সর্বপ্রকার শিল্প ও ব্যবসায়ের পথই এইরূপ
অল্পাধিক দুর্গম। শিল্পদ্রব্য উৎপাদন করা যাহার ব্যবসায়, সে ঠিক কি প্রণালী অবলম্বন করে এবং কোন্ উপায়ে ব্যবসায়ের কঠোর প্রতিযোগিতা হইতে আত্মরক্ষা করে তাহা অপরকে জানিতে দেয় না। সুতরাং technical
education পাইলেই ব্যবসায়বুদ্ধি জন্মিবে না এবং শিল্পের প্রতিষ্ঠা হইবে
না। চাকরি মিলিতে পারে,
কিন্তু তাহার ক্ষেত্র সংকীর্ণ, কারণ দেশে প্রতিষ্ঠিত শিল্পের সংখ্যা অল্প। শিক্ষা শেষ হইলেই অধিকাংশ যুবক স্বাধীন কারবার
আরম্ভ করিতে পরিবে ইহা দুরাশা মাত্র।
যাহা বলা হইল তাহার ব্যতিক্রমের উদাহরণ অনেক
আছে। অনেক দৃঢ়সংকল্প উদযোগী
ব্যক্তি পুঁথিগত বিজ্ঞানচর্চা করিয়া কিংবা বিজ্ঞানের কোনও চর্চা না করিয়া এবং অপরের
সাহায্য না পাইয়াও শিল্পপ্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করিয়াছেন। বিজ্ঞানচর্চা এবং কার্যকরী শিক্ষার বিস্তারের
ফলে এই সুযোগ বর্ধিত হইবে তাহাতে সন্দেহ নাই। অর্থাৎ পূর্বে যদি এক লক্ষ শিক্ষিত ব্যক্তির
মধ্যে একজন শিল্পপ্রতিষ্ঠায় কৃতকার্য হইয়া থাকেন; তবে এখন হয়তো দশজন হইবেন। নূতন শিক্ষাপদ্ধতি হইতে আমরা একমাত্র আশা করিতে পারি যে কয়েকজনের
নূতন প্রকার চাকরি মিলিবে এবং কয়েকজন অনুকূল অবস্থায় পড়িলে স্বাধীন ব্যবসায়ের প্রতিষ্ঠা
করিতে পরিবে। কিন্তু অধিকাংশের ভাগ্যে কোনও প্রকার সুবিধা লাভ হইবে না।
Technical Education-কে নিরর্থক প্রতিপন্ন
করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কেবল ইহাই বলিতে চাহি—যদি ছাত্রগণ অত্যধিক সংখ্যায় নির্বিচারে এই পথে জীবিকার সন্ধানে
আসেন তবে তাহাদের অনেকেই বিফলমনোরথ হইবেন। কারণ, নূতন শিল্পের প্রতিষ্ঠা
সহজসাধ্য নয়, এদেশে কারখানাও এত নাই যাহাতে যথেষ্ট চাকরি
মিলিতে পারে। বিজ্ঞান সকলের রুচিকরও নয়। অতএব জীবিকালাভের অপেক্ষাকৃত সুগম পন্থা আর কিছু আছে কিনা দেখা
উচিত।
বাংলাদেশ পরদেশীতে ভরিয়া গিয়াছে। তাহাদের এক দল এদেশের
কুলী মজুর ধোবা নাপিত কামার কুমার মাঝি মিস্ত্রীকে স্থানচ্যুত করিতেছে, আর এক দল দেশী বণিকের হাত হইতে ছোট বড় সকল ব্যবসায় কাড়িয়া
লইতেছে এবং নুতন ব্যবসায়ের পত্তন করিতেছে। শিক্ষিত বাঙালী লোলুপনেত্রে এই শেষোক্ত দলের কীর্তি দেখিতেছে
কিন্তু তাহাদের পদ্ধতিতে দন্তস্ফুট করিতে পারিতেছে না। এইসকল পরদেশী ইংরেজী বিদ্যা জানে না,
ecnomics বোঝে না, ইহাদের হিসাবের প্রণালীও
আধুনিক bookkeeping হইতে অনেক নিকৃষ্ট, অথচ বাণিজ্যলক্ষ্মী ইহাদের ঘরেই বাসা লইয়াছেন। ইহারা বিজ্ঞানের খবর
রাখে না, নূতন শিল্প প্রতিষ্ঠা করিতেও খুব ব্যস্ত নয়,
কারণ ইহারা মনে করে পণ্য উৎপাদন অপেক্ষা পণ্য লইয়া কেনাবেচা
করাই বেশী সহজ এবং তাহাতে লাভের নিশ্চয়তাও অধিক। ইহারা নির্বিচারে দেশী বিলাতী প্রয়োজনীয়
অপ্রয়োজনীয় উপকারী অপকারী সকল পণ্যের উপরেই ব্যবসায়ের জাল ফেলিয়াছে। উৎপাদকের ভাণ্ডার হইতে
ভোক্তার গৃহ পর্যন্ত বিস্তৃত ঋজুকুটিল নানা পথের প্রত্যেক ঘাঁটিতে দাঁড়াইয়া ইহারা
পণ্য হইতে লাভ আদায় করিয়া লইতেছে।
শিক্ষিত বাঙালী কতক ঈর্ষার বশে কতক অজ্ঞতার
জন্য এইসকল পরদেশীর কার্যপ্রণালী হেয় প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করেন। ইহারা বর্বর অশিক্ষিত
দুর্নীতিপরায়ণ, টাকার জন্য দেশের সর্বনাশ করিতেছে। ইহারা লোটাকম্বল সম্বল
করিয়া এদেশে আসে; যা তা খাইয়া যেখানে সেখানে বাস করিয়া অশেষ
কষ্ট স্বীকার করিয়া কৃপণের তুল্য অর্থ সঞ্চয় করে। ধনী হইলেও ইহারা মানসিক সম্পদে নিঃস্ব। ভদ্র বাঙালী অত হীনভাবে
জীবিকানির্বাহ আরম্ভ করিতে পারে না, তাহার ভব্যতার
একটা সীমা আছে যাহার কমে তাহার চলে না। অতএব দগ্ধোদরের জন্য সে খোট্টার শিষ্য হইবে না।
অনেক বৎসর পূর্বে ইংরেজের মহিমায় মুগ্ধ হইয়া
বাঙালী ভাবিয়াছিল— ইংরেজের চালচলন অনুকরণ না করিলে উন্নতির আশা
নাই। সে ভ্রম এখন গিয়াছে,
বাঙালী বুঝিয়াছে মোটা চালচলনের সঙ্গে বিদ্যা বুদ্ধি উদ্যমের
কোন বিরোধ নাই। এখন আবার অনেকে ভ্রমে পড়িয়া ভাবিতেছেন— খোট্টার অধিকৃত ব্যবসায়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে হইলে জীবনযাত্রার প্রণালী অবনত করিতে
হইবে এবং মানসিক উন্নতির আশা বিসর্জন দিতে হইবে।
যাহারা বাঙালীর মুখের গ্রাস কাড়িয়া লইতেছে
তাহাদের অনেক দোষ থাকিতে পারে, কিন্তু এমন মনে করার
কোনও হেতু নাই যে ঐসকল দোষের জন্যই তাহারা প্রতিযোগে জয়ী হইয়াছে। নিরপেক্ষ বিচারে ইহাই
প্রতিপন্ন হইবে যে বাঙালীর পরাভব তাহার নিজের ক্রুটির জন্যই হইয়াছে।
এই সকল পরদেশী বণিকের শিক্ষা ও পরিবেষ্টন
সযত্ন অনুসন্ধানের যোগ্য। ইহারা জন্মাবধি বণিগবৃত্তির আবহাওয়ায় লালিত হইয়াছে এবং আত্মীয়স্বজনের
নিকটেই দীক্ষা লাভ করিয়াছে। বাঙালী কেরানী মার্চেন্ট অফিসে গিয়া নির্লিপ্ত চিত্তে invoice
voucher day-book ledgers লিখিয়া দিনগত পাপক্ষয় করিয়া আসে,
মনিবের সহিত তাহার কেবল বেতনের সম্পর্ক। সে নিজের নির্দিষ্ট
কর্তব্য পালন করে মাত্র, মনিবের সমগ্র ব্যবসায়
বুঝিবার তাহার সুযোগও নাই স্বার্থও নাই। ভারতীয় বণিকের অনেক কাজ গৃহেই নিম্পন্ন হয়। তাহার সহায়তা করিয়া
বণিকপুত্র অল্প বয়সেই পৈতৃক ব্যবসায়ের রস গ্রহণ করিতে শেখে, এবং কেনা বেচা আদায় উসুল জাবেদা রোকড় খতিয়ান হাতচিঠা হুণ্ডি
মোকাম—বাজারের গূঢ় তত্ত্বে অভিজ্ঞতা লাভ করে।
এই business atmosphere বাঙালী ভদ্রের দুলর্ভ। উকিল ব্যারিস্টার ডাক্তার প্রফেসার কেরানীর
সন্তান ইহাতে বঞ্চিত। বণিগবৃত্তির বীজ বাঙালী ভদ্রের গৃহে নূতন করিয়া বপন করিতে হইবে। অনেক অঙ্কুর নষ্ট হইবে,
কিন্তু অভিভাবকদের উৎসাহ ও তীক্ষ্ম দৃষ্টি থাকিলে ফলবান বিটপীও
অচিরে দেখা দিবে।
দালাল আড়তদার ব্যাপারী পাইকার দোকানী প্রভৃতি
বহু মধ্যবর্তীর হাত ঘুরিয়া পণ্যদ্রব্য ভোক্তার ঘরে আসে। পণ্যের এই পরিক্রমপথে অগণিত ব্যক্তির অন্নসংস্থান
হয়। এই মহাজন অনুসৃত পথই
জীবিকার রাজপথ। বাঙালী ভদ্রলোককে এই পথের বার্তা সংগ্ৰহ করিয়া যাত্রা আরম্ভ করিতে হইবে।
আরম্ভ দুরূহ সন্দেহ নাই। অভিজ্ঞ অভিভাবকের উপদেশ
পাইলে নূতন ব্রতীর পন্থা সুগম হইবে। কিন্তু যেখানে এ সুযোগ নাই সেখানেও শুভাকাঙক্ষী অভিভাবক অনেক
সাহায্য করিতে পারেন। পুত্রের শিক্ষার জন্য খরচ করিতে বাঙালী কুণ্ঠিত নয়। সাধারণ শিক্ষার জন্য যে অর্থ ও উদ্যম ব্যয়
হয় তাহারই কিয়দংশে ব্যবসায় শিক্ষা আরম্ভ হইতে পারে। অনেক উদার অভিভাবক এই উদ্দেশ্যে অর্থব্যয়
করিয়া বাঞ্ছিত ফল পান নাই, ভবিষ্যতেও অনেকে পাইবেন
না। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার
ব্যয়ও সকল সময়ে সার্থক হয় না।
সকল যুবকই অবশ্য ব্যবসায়ী হইবে না। কিন্তু যে হইতে চাহিবে
তাহার সংকল্প স্থির করিয়া পঠদ্দশাতেই বণিগ্বৃত্তির সহিত পরিচয় আরম্ভ করা ভাল। এজন্য অধিক আড়ম্বর
অনাবশ্যক। আগে অর্থবিদ্যা শিখিব তাহার পর ব্যবসায় আরম্ভ করিব এরূপ মনে করিলে শিক্ষা অগ্রসর
হইবে না। আগে ভাষা, তাহার পর ব্যাকরণ—ইহাই স্বাভাবিক রীতি। দোকান হাট বাজার আড়ত ব্যবসায়শিক্ষার সুগম বিদ্যাপীঠ। এই সকল স্থানে নিত্য
যাতায়াত করিলে শিক্ষার্থী অনেক নূতন তথ্য শিখিবে; আমদানি রপ্তানি, আড়তের বিক্রয়প্রথা, পণ্যের ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্য, দালালের করণীয়, হিসাবের প্রণালী, পাওনা আদায়ের উপায়—ইত্যাদি বহু জটিল বিষয় সরল হইয়া যাইবে। অভিভাবক যদি শিক্ষার্থীর
নিকট এইসকল সংবাদ গ্রহণ করেন তবে তিনিও উপকৃত হইবেন এবং শিক্ষার্থীকেও সাহায্য করিতে
পারবেন। সাধারণ শিক্ষা—অর্থাৎ স্কুল কলেজের শিক্ষা—শেষ হইলে শিক্ষার্থী দিনকতক কোনও ব্যবসায়ীর
কর্মচারী হইয়া হাতেকলমে কাজ শিখিতে পারে। এদেশে ব্যবসায় শিখিবার জন্য premium দেওয়ার প্রথা নাই। কিন্তু যদি দিতেও হয় তাহা অপব্যয় হইবে না। যদি পছন্দমত কোনও নির্দিষ্ট ব্যবসায় শিখিবার
সুযোগ না থাকে, তথাপি যেকোনও সমজাতীয় ব্যবসায়ে শিক্ষানবিশি
করায় লাভ আছে, কারণ সকল ব্যবসায়েরই কতকগুলি সাধারণ মূলসূত্র
আছে। খুব বড় ব্যবসায়ীর
অফিসে সুবিধা হইবে না। সেখানে নানা বিভাগের মধ্যে দিগ্ভ্রম হইবে, সমগ্র ব্যাপারে শৃঙ্খলিত ধারণা সহজে জন্মিবে না ।
আজকাল অনেক দেশহিতৈষী কুটিরশিল্প, উন্নত কৃষি এবং কার্যকরী শিক্ষা লইয়া আলোচনা করিতেছেন। তাঁহারা যদি বণিগ্বৃত্তির উপযোগিতার প্রতি মন দেন তবে অনেক যুবক উৎসাহিত হইয়া ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইবে। বণিগ্বৃত্তি সহজেই সংক্ৰমিত হয়, ইহার ক্ষেত্রও বিশাল। দোকানদার না থাকিলে সমাজ চলে না। জনকতক অগ্রগামীর উদ্যম সফল হইলে তাহাদের দৃষ্টান্তে পরবর্তী অনেকেই সিদ্ধিলাভ করিবে। বাঙালীর বুদ্ধির অভাব নাই, নিপুণতা ও সৌষ্ঠবজ্ঞানও যথেষ্ট আছে। এইসকল সদ্গুণ ব্যবসায়ে লাগাইলে প্রতিযোগিতায় সে নিশ্চয় জয়ী হইবে।
শিক্ষানবিশি শেষ হইলে সামান্য মূলধন লইয়া
কারবার আরম্ভ হইতে পারে। সুবিধা হইলে অভিজ্ঞ অংশীদারের সহিত বখরার বন্দোবস্ত হইতে পারে। অবশ্য প্রথম হইতেই
জীবিকানির্বাহের উপযোগী লাভ হইবে না। কলেজে উচ্চশিক্ষা বা কার্যকরী বিদ্যা লাভ করিতে যে সময় লাগে,
ব্যবসায় দাঁড় করাইতে তাহা অপেক্ষা কম সময় লাগিবে এরূপ আশা
করা অসংগত। প্রথমে যে ছোট কারবার আরম্ভ হইবে তাহা হাতেখড়ি বলিয়াই গণ্য করা উচিত। তাহার পর অভিজ্ঞতা
ও আত্মনির্ভরতা জন্মিলে কারবার সহজেই বৃদ্ধি পাইবে।
এই প্রকার শিক্ষার জন্য এবং সামান্য মূলধনে
ব্যবসায় আরম্ভ করিতে হইলে যে কষ্টসহিষ্ণুতা আবশ্যক, শৌখিন বাঙালীর ধাতে তাহা সহিবে কি? নিশ্চয় সহিবে। বাঙালী যুবক অশেষ পরিশ্রম
করিয়া রাত জাগিয়া মড়া ঘাঁটিয়া ডাক্তারি শেখে। উত্তপ্ত লোহার ঘরে জুলন্ত হাপরের কাছে লোহা
পিটিয়া এঞ্জিনিয়ারিং শেখে। প্রখর রৌদ্রে মাঠে মাঠে ঘুরিয়া ক্ষুধা তৃষ্ণা দমন করিয়া সার্ভেয়িং
শেখে। আইন পরীক্ষা পাস করিয়া
বহুদিন মুরব্বী উকিলের বাড়িতে ধরনা দেয়। ভোরে অর্ধসিদ্ধ ভাত খাইয়া ডেলি-প্যাসেঞ্জার হইয়া সমস্ত দিন
অফিসে কলম পিশিয়া বাড়ি ফেরে। এসকল কাজকে সে শ্নাঘ্য বা ভদ্রোচিত মনে করে সেজন্য কষ্ট সহিতে
পারে। যেদিন সে বুঝিবে যে
বণিগ্বৃত্তি হীন নয়, ইহাতে অতি উচ্চ আশা
পূরণেরও সম্ভাবনা আছে, সেদিন সে এই বৃত্তির
জন্য কোনও কষ্ট গ্রাহ্য করিবে না।
আশার কথা—পূর্বের তুলনায় বাঙালী এখন ব্যবসায়ে অধিকতর
মন দিতেছে। আজকাল অনেক দেশহিতৈষী কুটিরশিল্প, উন্নত কৃষি
এবং কার্যকরী শিক্ষা লইয়া আলোচনা করিতেছেন। তাঁহারা যদি বণিগ্বৃত্তির উপযোগিতার প্রতি মন দেন তবে অনেক
যুবক উৎসাহিত হইয়া ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইবে। বণিগ্বৃত্তি সহজেই সংক্ৰমিত হয়,
ইহার ক্ষেত্রও বিশাল। দোকানদার না থাকিলে সমাজ চলে না। জনকতক অগ্রগামীর উদ্যম সফল হইলে তাহাদের দৃষ্টান্তে
পরবর্তী অনেকেই সিদ্ধিলাভ করিবে। বাঙালীর বুদ্ধির অভাব নাই, নিপুণতা ও সৌষ্ঠবজ্ঞানও যথেষ্ট আছে। এইসকল সদ্গুণ ব্যবসায়ে লাগাইলে প্রতিযোগিতায় সে নিশ্চয় জয়ী
হইবে।
বণিগ্বৃত্তির প্রসারে বাঙালীর মানসিক অবনতি
হইবে না। মসীজীবী বাঙালীর যে সদ্গুণ আছে তাহা কলমপেশার ফল নয়। পরদেশী বণিকের যে দোষ আছে তাহাও তাহার বৃত্তিজনিত
নয়। অনেক বাঙালী বিদেশী
বণিকের গোলামি করিয়াও সাহিত্য ইতিহাস দর্শনের চর্চা করিয়া থাকেন। নিজের দাঁড়িপাল্লা
নিজের হাতে ধরিলেই বাঙালীর ভাবের উৎস শুকাইবে না ।
সূত্র : প্রবন্ধাবলী রাজশেখর বসু (সম্পাদনা-
দীপংকর বসু)