সিকান্দার আবু
জাফর
(১৯১৯-১৯৭৫)
সাহিত্যের সব
শাখায় তাঁর বিচরণ ছিল। ছাত্রজীবনেই তিনি চারটি উপন্যাস - মাটি আর অশ্রু, পূরবী, নতুন
সকাল আর জয়ের পথে রচনা করেন। তবু তিনি কবি হিসেবেই আমাদের মাঝে সমধিক পরিচিত। তাঁর
দুটি কবিতা খুব বিখ্যাত হয়ে আছে, একটি “বাংলা ছাড়ো”, অন্যটি
“আমাদের সংগ্রাম চলবেই”।
“তিনিই একমাত্র কবি যিনি পাকিস্তান
শাসকদের বিরুদ্ধে কবিতায় ধিক্কার বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। ... যা তৎকালীন সময়ে
তরুণদের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। ... সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায় ছন্দ ও
শব্দ ব্যবহারের উজ্জ্বল সাবলীলতা আছে। তিনি তাঁর বক্তব্যকে অনায়াস-নির্ভাবনায়
প্রকাশ করেছেন।” (বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত-মুহম্মদ
আবদুল হাই-সৈয়দ আলী আহসান,পৃ: ৩৮৩)
দিলারা হাফিজ
সিকান্দার আবু জাফরকে গণমানুষের কবি আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, গণমানুষের কবি সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায়
আলোচনায় তাঁর পরিবেশ ও কাল-সচেতনতা উল্লেখ্য। সিকান্দার আবু জাফরের ‘প্রসন্ন প্রহর’, ‘তিমিরান্তিক’ এবং ‘বৈরী
বৃষ্টিতে’ নামের তিনখানি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়
১৯৬৫ সালে। ‘কবিতা ১৩৭২’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। উল্লেখিত সময়কালে রচিত
এবং প্রকাশিত কবিতার অধিকাংশ সমসাময়িক রাষ্ট্র ও সমাজকে কেন্দ্র করে রচিত। এ সম্পর্কে
কবি লিখেছেন, “সমাজের সঙ্গে কথা বলাতেই আমার বেশী
আনন্দ।” এ সমাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে
সিকান্দার আবু জাফরের কাব্যজগত। প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই ফুটে উঠেছে চাপা বিক্ষোভ
ও অসন্তোষ। কবির অসন্তোষ ও বিক্ষোভের পেছনে কাজ
করেছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব। (গণমানুষের কবি সিকান্দার আবু জাফর, বাংলাদেশের হৃদয় হতে, প্রথম বর্ষ চর্তুথ সংখ্যা, ১২১ পৃ:)
সিকান্দার আবু
জাফর রচনাবলী-৩ এর ভূমিকায় আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেন,
“আমাদের সময়েরই একজন কৃতী সন্তান সিকান্দার
আবু জাফর। কবি ও নাট্যকার হিশেবে স্মরণীয় অবদান রেখেছেন তিনি। ‘সমকাল’ সম্পাদনা
তো তাঁর জীবনের অবিস্মরণীয় কাজ। আমাদের ভাষা-আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
জীবনভোর যখনই দেশ সংকটে পতিত হয়েছে, তখনই
সিকান্দার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। এদিক থেকে যেন তিনি কাজী নজরুল ইসলামের
উত্তরাধিকার বহন করেছেন।”
বিভিন্ন সময়ে দৈনিক
নবযুগ, ইত্তেফাক, সংবাদ ও মিল্লাত পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন।
১৯৪১ সালে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের 'নবযুগ' পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে সিকান্দার আবু
জাফরের সম্পাদনায় মাসিক ‘সমকাল’ (১৯৫৭-১৯৭১)
প্রকাশিত হয়। উক্ত পত্রিকায় প্রথম দু’বছর
সহযোগী সম্পাদক ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। পূর্ব বঙ্গে পাকিস্তানকালের প্রধান
পত্রিকারূপে 'সমকাল' খ্যাতি
লাভ করে। অনুকরণীয় এই ধারায় পরবর্তীতে কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
পত্রিকাটি
সম্পর্কে আবুল ফজল বলেন,
“সিকান্দার আবু জাফর আমাদের কাছে অনন্য
ও দুর্লভ উত্তরাধিকার। কি সেই উত্তরাধিকার? যা
তিনি আমাদের সামনে রেখে গেছেন? আমার মনে হয়, তাঁর একমাত্র উত্তর : সাহসিকতা। ... আমরা যারা
স্বাধীন চিন্তা আর স্বাধীন সাহিত্যকর্মে বিশ্বাসী, প্রতি
মুহূর্তে সিকান্দার আবু জাফর এবং তাঁর মতো সাহসী সম্পাদকের অভাব আমরা মর্মে মর্মে
বোধ করছি।” (হায়াৎ মামুদ, সিকান্দার আবু জাফর, পৃ: ৮৫)
পত্রিকাটির একটি
সংখ্যা আবুল ফজলের একটি প্রবন্ধের জন্য এবং আবুল হকের দু’টি প্রবন্ধের জন্য (আবু আহসান ছদ্মনামে)
সরকারকর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়।
এই পত্রিকায়
প্রকাশিত অধিকাংশ রচনায় অতি আধুনিক সাহিত্য চিন্তা এবং তার অনুশীলনের ছাপ সুস্পষ্ট।
পত্রিকায় প্রকাশিত ধারাবাহিক রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য - আনিস চৌধুরীর নাটক ‘এ্যালবাম’ এবং
রশীদ করিমের উপন্যাস ‘উত্তম পুরুষ’। এ পত্রিকার বিশেষ কবিতা সংখ্যা সমকালীন
কবিতার একটি মূল্যবান সংকলন।
"আর কিছুর জন্য না হলেও শুধু ‘সমকাল’ প্রকাশের
জন্য তিনি পরিচিত হয়ে থাকবেন।" (বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত- মুহম্মদ আবদুল
হাই-সৈয়দ আলী আহসান, পৃ: ৩৮৩)
একজন সংগ্রামী
কবি হিসেবে অসংখ্য গণসঙ্গীত লিখে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ষাটের দশকে পূর্ব
বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার যে ধারা গড়ে ওঠে, আবু জাফর ছিলেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ১৯৭১
সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনতা, দেশপ্রেম
ও বিপ্লবের চেতনাসম্পন্ন অনেক গান রচনা করেন।
সিকান্দার আবু
জাফর রচিত ও শেখ লুতফর রহমানের সুরে ‘জনতার
সংগ্রাম চলবে’ গানে উদ্দীপ্ত হয়েছে যুদ্ধে লিপ্ত
মুক্তিযোদ্ধার দল। গানটি:
জনতার সংগ্রাম
চলবেই
আমাদের সংগ্রাম
চলবেই।
বাঁচবার অধিকার
কাড়তে, দাস্যের নির্মোক ছাড়াও
অগণিত মানুষের
প্রাণপণ যুদ্ধ
চলবেই চলবেই।
আমাদের সংগ্রাম
চলবেই। (সংক্ষেপিত)
তাঁর আলোচিত
গ্রন্থপঞ্জি [উপন্যাস, গল্পসংকলন, নাটক]
পূরবী (উপন্যাস,১৯৪১)
মাটি আর অশ্রু
(ছোটোগল্প, ১৯৪২)
জয়ের পথে (কিশোর
উপন্যাস, ১৯৪৩)
নতুন সকাল
(উপন্যাস, ১৯৪৭)
শকুন্ত উপাখ্যান
(১৯৫২)
মাড়কসা (১৯৬০)
প্রসন্ন প্রহর
(কবিতা, ১৯৬৫)
তিমিরান্তিক
(কবিতা, ১৯৬৫)
বৈরী বৃষ্টিতে
(কবিতা, ১৯৬৫)
সিরাজ-উ-দ্দৌলা
(নাটক, ১৯৬৫)
মহাকবি আলাউল
(নাটক,১৯৬৬)
কবিতা ১৩৭২
(কবিতা, ১৯৬৮)
বৃশ্চিক-লগ্ন
(কবিতা, ১৯৭১)
বাংলা ছাড়ো
(কবিতা, ১৯৭১)
অভিযোগ
(গদ্যপুস্তিকা, ১৯৭১)
কবিতা ১৩৭৪
(কবিতা, ১৯৭২)
আবু জাফর
অনুবাদক হিসেবেও খ্যাত ছিলেন। তাঁর কয়েকটি অনূদিত গ্রন্থ: মাটির উপরে আর মাটির
নিচে (১৯৫৯)যাদুর কলস [বানার্ড ম্যালামুড](১৯৫৯), সেন্ট
লুইয়ের সেতু (১৯৬১), রুবাইয়াৎ : ওমর খৈয়াম (১৯৬৬), পশ্চিমের পারাবত (১৯৬২), মালব কৌশিক (১৯৬৮), সিংগের নাটক (১৯৭১), ইত্যাদি।
তাঁর কিছু
অগ্রন্থিত উপন্যাস :
জীবনের লেখা,
মনজিল,
ধূসর আকাশ,
রোকেয়া ও আফতাব,
দুই বন্ধু।
অগ্রন্থিত
অনুবাদ গল্প :
‘অলিখিত কাহিনী’- মূল: হাওয়ার্ড জোনস
‘মিগল্স্ - মূল ব্রেট হার্ট’
‘রডনের ছাদ’ - মূল ডি.এইচ. লরেন্স
সামাজিক
স্বীকৃতি :
উল্লেখ্য ১৯৬৬
সালে তিনি নাট্যসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।
একুশে পদক (সাংবাদিকতা), ১৯৮৪(মরণোত্তর), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (সাহিত্য) ১৯৯৯
(মরণোত্তর)।