:::: সূচীপত্র ::::
কোলকাতা ৩য়-অংশ - প্রেসিডেন্সি কলেজ ১ম বর্ষ

এর পর আমি হেয়ার ইস্কুলের উত্তরের মাঠ পেরিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ঢুকলুমকলেজ হচ্ছে মনোজগতে একটি নতুন রাজ্যআমার ছাত্রবৃত্তি ইস্কুলে পড়া বিদ্যে ইংরেজি স্কুলেও আমার সহায় হয়েছিলকলেজে এসে দেখি সে বিদ্যেতে আর কুলোয় নাইতিহাস পড়তে হল রোমের আর গ্রিসেরঅঙ্ক, ট্রিগনমেট্রি, কনিক সেকশন প্রভৃতি শিখতে হললজিক নামে একটা নতুন শাস্ত্র শিখতে হলআর তখন ফাস্ট আর্টসে ফিজিক্স পড়তে হত ফিজিক্স আমার কাছে একটা যাদুবিদ্যা বলে মনে হতকলেজে আমাদের ফিজিক্সের অধ্যাপক ছিলেন এলিয়ট সাহেবতিনি ছিলেন senior wrangler, গণিতবিদ্যায় পারদর্শীতিনি experiment ভালো করতে পারতেন নাকিন্তু ব্ল্যাকবোর্ডে খড়ি দিয়ে এঁকে বস্তুর গতিবিধি সব পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতেনফলে আমি ফিজিক্সের অতি ভক্ত হয়ে পড়িএলিয়ট সাহেব ব্যতীত অপর কোন শিক্ষকের কথা আমার মনে নেই দুটি ছাড়াহরিশচন্দ্র কবিরত্ন ছিলেন আমাদের সংস্কৃতের অধ্যাপকতিনি ছিলেন অতিশয় ভদ্র এবং সুরসিক ব্যক্তি

তাঁর কাছে সংস্কৃত পড়ে আমরা সুখ পেতুমআর বিপিন গুপ্ত ছিলেন অঙ্কের শিক্ষক, তিনি ছিলেন অতিশয় বুদ্ধিমান প্রাণবানতিনি রাজশাহী কলেজ থেকে বদলি হয়ে প্রেসিডেন্সিতে এসেছিলেনসে কারণ, ছেলেদের একটু সমীহ করতেন কথা তিনি আমাকে বহু কাল পরে বলেছেতা ছাড়া, কলেজে জনকতক পয়লা নম্বরের ছেলে ছিল, যারা এনট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম দশজনের শ্রেণীভুক্ত হয়েছিলতাদের ভিতর প্রবাসী সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় একজনআর আমার যত দূর মনে পড়ে, সিভিলিয়ান কিরণ দে- দাদা সতীশ দে আর-একজন, যিনি পরে বর্ধমানে ডাক্তারি করে সেখানে প্রভূত অর্থ এবং খ্যাতি অর্জন করেনআর সূৰ্যকুমার কারফরমা নামক আর-একটি ছোকরা ছিল, যে পরে শুনেছি আগ্রা কলেজের গণিতশাস্ত্রের অধ্যাপক হয়কোন হিন্দুস্থানি যুবক আমাকে পরে বলেন যে, তার তুল্য অধ্যাপক সে কলেজে আর কেউ ছিল নাঅনুকূল দাসগুপ্ত বলে -একটি ঘোর ব্রাহ্ম যুবক ছিল, যে পরে বিলেতে গিয়ে ভেস্তে যায়

আমার অবশ্য দলের ছোকরাদের সঙ্গে বিশেষ পরিচয় ছিল নাহিন্দু স্কুল হেয়ার স্কুলের ছেলেরা ঘরে ঢুকতেই ডান বাঁ-পাশের বেঞ্চি অধিকার করে বসতহিন্দু স্কুলে নারায়ণপ্রসাদ শীল নামক একটি ছোকরার সঙ্গে আমার অত্যন্ত বন্ধুত্ব হয়; তিনি আজও বর্তমানতিনি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে ওঠেনলালচাঁদ অল্পবয়স থেকেই গান গাইতেন; এস্রাজ, হারমনিয়ম বাঁয়া তবলা বাজাতেনপরে তিনি একজন গাইয়ে বাজিয়ে হয়ে ওঠেন। তাঁর গলা ছিল জাঁদরেল, আর বাজনায় হাত ছিল কড়া পরে দুই- অনেকটা মোলায়েম হয়ে আসেআমি সেকালে একটি সহপাঠীকে হারমনিয়ম শিক্ষা করতে দেখি। তিনি 'বউ আমাকে কাটনা কেটে কিনে দেবে বাজনা,' এই বাহারের গৎটি মকসো করতেনলোককে বানান করে পড়তে শুনলে যে-রকম হাসি পায়, তাঁর এই বাদ্যশিক্ষার পদ্ধতি আমার তেমনি হাস্যকর মনে হতআমি পূর্বে বলেছি যে কলকাতার ছেলেরা ছিল সঙ্গীতছুটসেকালে দুটি গান রাস্তাঘাটে সকলেই গাইত, গরুর গাড়ির গাড়োয়ান থেকে ইস্কুলের ছেলে পর্যন্তসে দুটি হচ্ছেআয় লো অলি কুসুম তুলি', আর 'যমুনা পুলিনে বসি কাঁদে রাধা বিনোদিনী'ভাবে ভাষায়, সুরে তালে এমন খেলো গান আমি ইতিপূর্বে কখনও শুনিনিরবীন্দ্রনাথের গান তখন কেউ জানতও না লালচাঁদ অবশ্য সব গান গাইত নাসে গাইত সেকালে প্রচলিত ব্রহ্মসঙ্গীতআদি ব্রাহ্মসমাজের সংগৃহীত আদি ব্রহ্মসঙ্গীত সে জানতলালচাঁদের ঠাকুরদা প্রেমচাঁদ বড়াল ছিলেন একজন আদি ব্রাহ্ম, তাদের বাড়িতে হপ্তায় একদিন যে-সমাজ হত, তাতে লালচাঁদকে অল্পবয়স থেকে গান গাইতে হতআমি তার সঙ্গে মিশে বহু গানবাজনার আসরে উপস্থিত থাকতুমআমার মনে আছে যে, আমি লালচাঁদের সঙ্গে মহেন্দ্র চাটুয্যে নামক জনৈক প্রসিদ্ধ হারমনিয়াম-বাদকের বাড়িতে গিয়েছিতাঁর বাজনা আমার ভালো লাগেনিযদিচ অনেকে আহা-উহু করেছিলতিনি ছিলেন ধনী নন, কিন্তু ঘোর বাবুশুনেছি সেকালে গোলাপজলে স্নান করতেনপরে তিনি নোট জাল করে আন্দামানে যানসেখান থেকে ফিরে আসবার পরেও তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলচেহারা তাঁর একই ছিল, কিন্তু তিনি তখন আর গুণী ছিলেন না

আমি বলতে ভুলে গিয়েছি যে, প্রেসিডেন্সি কলেজে ফাস্ট ইয়ার, ক্লাসে আর-একটি যুবকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তাঁর নাম জ্ঞানদা প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, গোবরডাঙার বড় জমিদারের পুত্রতিনি ছিলেন চেহারায় আমার সহপাঠীদের মধ্যে অনন্যসাধারণতাঁর বর্ণ ছিল গেীর, চোখ নীল আর চুল কটাএমন ব্যূঢ়োরস্ক বৃষস্কন্ধ মহাভুজ পুরুষ বাঙালির মধ্যে কদাচিৎ দেখা যায়তিনি Wards Institution-এর ছাত্র ছিলেনআর শিখেছিলেন কুস্তি করতে, ঘোড়ায় চড়তে সেতার বাজাতেপ্রথম-প্রথম আমি তাঁর সঙ্গীতচর্চার কোন পরিচয় পাইনিপরে তিনি বাংলার ভিতর শ্রেষ্ঠ সুরবাহার-বাজিয়ে হয়ে ওঠেনএবং আমাদের পরিবারের অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু হনসে অনেকটা আমার সেজদা কুমুদনাথ চৌধুরীর প্রসাদেসেজদা ছিলেন শিকারমত্ত, আমি ছিলুম সঙ্গীত-ভক্তএই দুই কারণে জ্ঞানদার সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব পাকা হয়ে ওঠেআর সে বন্ধুত্ব তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অটুট থাকে

ফাস্ট ইয়ারের সহপাঠীদের নারায়ণপ্রসাদ শীল জ্ঞানদাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় ব্যতীত আর কারও সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব টেকসই হয়নিতা যে হয়নি, তার কারণ ভালো ছেলেদের কোন দল ছিল নাতারা সকলেই ছিল স্ব-স্ব প্রধান গম্ভীর প্রকৃতিরতা ছাড়া, জনকতক ধনী ছেলে এবং জামাইও ছিলতারা যে কী জন্য কলেজে ভর্তি হয়েছিল, তা আমি জানিনে; সম্ভবত আর পাঁচজনকে নিজেদের বেশভূষার বাহার দেখাতে দলের সঙ্গে আমার আলাপ হয়নি


সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা