:::: সূচীপত্র ::::
প্রেসিডেন্সি কলেজ দ্বিতীয় বর্ষ

তারপর সেকেন্ড ইয়ারে উঠলুমশ্রীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত হিন্দু স্কুল থেকে আমাদের কলেজে এসে ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হলেনতাঁর সঙ্গে আমি পরিচিত হইতিনি সেই বয়সেই কলেজের ডিবেটিং ক্লাবে বক্তৃতা করতেনতিনি পরিণত বয়সে চমৎকার বক্তা হয়ে ওঠেন, বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষাতেইতিনি বোধ হয় আমার চেয়ে বয়সে কিছু বড় ছিলেনআজও তিনি নানা সভা-সমিতিতে বক্তৃতা করেনএই দু-তিন বৎসর কলিকাতা-বাসের ফলে আমার শহরের প্রতি মায়া জন্মায়সেটা আমি আবিষ্কার করি আমার কলকাতা ত্যাগ করবার সময়েআমি কী জন্য কলকাতা ত্যাগ করতে বাধ্য হই, তা রে বলব

আমি আবার কৃষ্ণনগর ফিরে যাই; সেখানে গিয়ে কলকাতার অভাব অনুভব করিকৃষ্ণনগরে প্রথমে বাড়িতে ভালো করে ফুলের বাগান করতে প্রবৃত্ত হইআমাদের পূর্বোক্ত গৃহশিক্ষক আমাদের বাড়িতে এসে অধিষ্ঠান করেন, শিক্ষক হিসেবে নয়, সরকার হিসেবেতিনি আমাকে বাগান করার পব্যয় থেকে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করেন; কিন্তু কৃতকার্য হননিআমার সেজদা কুমুদনাথ ছিলেন অতি রোখালো মেজাজের লোকআমি যখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, তিনি তখন থার্ড ইয়ারে পড়েনতার সহপাঠী জনৈক গোবেচারি ছোকরা ক্লাসে বসে পান চিবেচ্ছিলঅধ্যাপক ওয়েব সাহেব তাই দেখে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ছোকরাটিকে বাইরে গিয়ে মুখের পান ফেলে আসতে আদেশ করেনসে যখন বেরিয়ে যায়, ওয়েব সাহেব তাঁর পিছন-পিছন ছোটেনসাহেবের হাত থেকে তাকে রক্ষা করবার জন্য সেজদাও সেই সঙ্গে ছুটে বেরিয়ে পড়েনওয়েব সাহেব প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ করেন যে, সেজদা তাঁকে মারতে গিয়েছিলেনতাঁর বিচার হয় তাতে সাব্যস্ত হয় যে, সেজদা বাস্তবিকই সাহেবকে মারতে যানঅবশ্য নিরীহ ছোকরাটির গায়ে সাহেব হাত দিলে সেজদাও আস্তিন গোটাতেনএর ফলে এক বছরের জন্য সেজদা rusticated হন
মেজদা (যোগেশচন্দ্র) তখন বাড়ির কর্তা, দাদা তখন বিলেতে, আর বাবা বিদেশেমেজদা আমাদের সকলকে হুকুম দিলেন কৃষ্ণনগর ফিরে যেতেআমার কলকাতা ছাড়তে বিশেষ আপত্তি ছিলমেজদা বললেন, ছোকরা বখা ছেলেদের সঙ্গে মিশে বখে গেছে, তাই কলকাতা ছাড়তে চায় না কথা শুনে আমার ভয়ঙ্কর রাগ হলআমি বললুম, আচ্ছা, আমি যাবআমরা পূজো সময়ে কৃষ্ণনগর ফিরে গেলুমগিয়ে কৃষ্ণনগর কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে ভর্তি হলুম

আমি কলকাতায় পঠদ্দশায় দুটি ব্যক্তির দর্শনলাভের সুযোগ পেয়েছিলুম, কিন্তু সে সুযোগ গ্রহণ করিনিসেই দু-জনই ভবিষ্যতে আমার জীবন মন অধিকার করেনএকজন হচ্ছেন শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনা ঠাকুর, অপরটি তাঁ ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীবোধ হয় ১৮৮৪ খ্রি. সরস্বতী পূজোর দিন, হঠাৎ গরম পড়ায় আমি হুজুরিমল ট্যাঙ্ক লেন থেকে হেঁটে প্রেসিডেন্সি কলেজের দক্ষিণের মাঠে এসে উপস্থিত হইএসে দেখি আমার বন্ধু নারায়ণপ্রসাদ শীল সেখানে একটি গাছতলায় শুয়ে আছেনতিনি আমাকে বললেন যে অ্যালবার্ট হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী একটি বক্তৃতা করছেন, আর সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তাঁর একটি বালিকা ভ্রাতুষ্পপুত্রীকেআর বললেন, ‘চলো না, রাস্তাটা পেরিয়ে আমরা অ্যালবার্ট হলে যাইআমি তাঁর এই প্রস্তাবে স্বীকৃত হলুম না, কারণ আমি শ্রান্ত বোধ করছিলুমনারায়ণ বললেন, রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা না-শুনতে চাও, অন্তত তাঁ ভ্রাতুষ্পুত্রটিকে দেখে আসি চলোশুনেছি মেয়েটি নাকি অতি সুন্দরীফলে অ্যালবার্ট হলে না-গিয়ে নারায়ণ আর আমি সেই গাছতলাতেই শুয়ে থাকলুমপরে সে মেয়েটিকেই আমি বিবাহ করি

এর বছর-দেড়েক পরে কৃষ্ণনগরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়কারণ ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর কি নভেম্বর মাসে আমি কৃষ্ণনগরে প্রত্যাবর্তন করিএবার কৃষ্ণনগর আমার বড় ফাঁকা-ফাঁকা লাগেএবং আমি স্বেচ্ছায় কলকাতা ত্যাগ করিনি বলে আমার মনও ভালো ছিল নাসময় কাটাবার জন্য আমি বাবার লাইব্রোর থেকে নানা রকম বই পড়তে শুরু করলুমদুখানি বইয়ের কথা আজও মনে আছে : বায়রনের Don Juan আর ল্যান্ডরের Imaginary Conversations. আমার সেজদা কুমুদনাথ চৌধুরী শিকারে মত্ত হয়ে গেলেনবন্দুক দিয়ে পাখিমারা-শিকারি সর্বত্রই আছেসুতরাং তাঁর সহ-শিকারিও জুটে গেলকৃষ্ণনগরে বাঘ নেই, তা হলেও শ্ৰীবন নামে অঞ্জনার ধারে রাজার একটি অদ্ভুত বাড়ি ছিল; উচুতে পাঁচ-ছয় তলা, প্রতি তলায় একটি করে ঘর, আর চারপাশে জঙ্গলসেই জঙ্গলে সেজদা তাঁর শিকারি বন্ধুদের নিয়ে বাঘের তল্লাসে ঘুরে বেড়াতেন। আর মুসলমান চাষাদের অতিথি হয়ে চালের গুঁড়োর রুটি তেলে রান্না মুরগির কারি খেতেনআমি কৌতুহলবশত একদিন এই শিকার-অভিযানে যাই, রাজার হাতিতে চড়েসমস্ত দিন হাতির ঝাঁকুনি রোদুরে আমি ভয়ানক ক্লান্ত হয়ে পড়লুমপরদিন আমার জ্বর হল, একেবারে ১০৫ সেই জ্বর দিন-আষ্টেক থাকেআমি বিছানায় শুয়ে-শুয়ে রবীন্দ্রনাথের সদ্যপ্রকাশিত 'বালকপত্রিকা পড়তুমএ পত্রিকা আমাকে মুগ্ধ করেছিলএর ভাষা অতি সহজ, এবং অতি চতুর, আর রসিকতায় টগবগ করতশ্রীমতী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী এই পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেনঅনেকগুলি ছোটখাটো প্রবন্ধ এই কাগজে প্রকাশিত হতআমি পরে শুনেছি সে সব রবীন্দ্রনাথের বেনামি লেখা


সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা