৬০
উৰ্ব্বশী
যথা তুষারের হিয়া, ধবল-শিখরে,
কভু নাহি গলে রবি-বিভার চুম্বনে,
কামানলে ; অবহেলি মন্মথের শরে
রথীন্দ্র, হেরিলা, জাগি, শয়ন-সদনে
(কনক-পুতলী যেন নিশার স্বপনে)
উৰ্ব্বশীরে। “কহ, দেবি, কহ এ কিঙ্করে,”—
সুধিলা সম্ভাষি শূর সুমধুর স্বরে,
উন্মদা মদন-মদে, কহিলা উৰ্ব্বশী ;
“কামাতুরা আমি, নাথ, তোমার কিঙ্করী ;
সরের সুকান্তি দেখি যথা পড়ে খসি
কৌমুদিনী তার কোলে, লও কোলে ধরি
দাসীরে ; অধর দিয়া অধর পরশি,
যথা কৌমুদিনী কাঁপে, কাঁপি থর থরি।”১
৬১
রৌদ্র-রস
শুনিলু গম্ভীর ধ্বনি গিরির গহ্বরে,
ক্ষুধাৰ্ত্ত কেশরী যেন নাদিছে ভীষণে ;
প্রলয়ের মেঘ যেন গর্জিছে গগনে ;
সচুড়ে পাহাড় কাঁপে থর থর থরে,
কাঁপে চারিদিকে বন যেন ভূকম্পনে ;
উথলে অদূরে সিন্ধু যেন ক্ৰোধ-ভরে,
যবে প্রভঞ্জন আসে নির্ঘোষ ঘোষণে।
জিজ্ঞাসিনু ভারতীরে জ্ঞানার্থে সত্বরে !
কহিলা মা ;—“রৌদ্র নামে রস, রৌদ্র অতি,
রাখি আমি, ওরে বাছা, বাঁধি এই স্থলে,
(কৃপা করি বিধি মোরে দিলা এ শকতি)
বাড়বাগ্নি মগ্ন যথা সাগরের জলে।
বড়ই কর্কশ-ভাষী, নিষ্ঠুর, দুর্ম্মতি,
সতত বিবাদে মত্ত, পুড়ি রোষানলে।”
৬২
দুঃশাসন
মেঘ-রূপ চাপ ছাড়ি, বজ্রাগ্নি যেমনে
পড়ে পাহাড়ের শৃঙ্গে ভীষণ নির্ঘোষে ;
হেরি ক্ষেত্রে ক্ষত্র-গ্লানি দুষ্ট দুঃশাসনে,
রৌদ্ররূপী ভীমসেন ধাইলা সরোষে ;
পদাঘাতে বসুমতী কাঁপিলা সঘনে ;
বাজিল ঊরুতে আসি গুরু অসি-কোষে
যথা সিংহ সিংহনাদে ধরি মৃগে বনে
কামড়ে প্রগাঢ়ে ঘাড় লহু-ধারা শোষে ;
বিদরি হৃদয় তার ভৈরব-আরবে,
পান করি রক্ত-স্রোতঃ গৰ্জিলা পাবনি।
“মানাগ্নি নিবানু আমি আজি এ আহবে
বৰ্ব্বর !— পাঞ্চালী সতী, পাণ্ডব-রমণী,
তার কেশপাশ পর্শি, আকর্ষিলি যবে,
কুরু-কুলে রাজলক্ষ্মী ত্যজিলা তখনি।”২
৬৩
হিড়িম্বা
উজলি চৌদিক এবে রূপের কিরণে,
বীরেশ ভীমের পাশে কর যোড় করি
দাঁড়াইলা, প্রেম-ডোরে বাঁধা কায় মনে
হিড়িম্বা ; সুবর্ণ-কান্তি বিহঙ্গী সুন্দরী
কিরাতের ফাঁদে যেন ! ধাইল কাননে
গন্ধামোদে অন্ধ আলি, আনন্দে গুঞ্জরি,—
গাইল বাসন্তামোদে শাখার উপরি
মধুমাখা গীত পাখী সে নিকুঞ্জ-বনে।
সহসা নড়িল বন ঘোর মড়মড়ে,
মদ-মত্ত হস্তী কিম্বা গণ্ডার সরোষে
পশিলে বনেতে, বন যেই মতে নড়ে !
দীর্ঘ-তাল-তুল্য গদা ঘুরায়ে নির্ঘোষে,
ছিন্ন করি লতা-কুলে ভাঙি বৃক্ষ রড়ে,
পশিল হিড়িম্ব রক্ষঃ—রৌদ্র ভগ্নী-দোষে।”৩
১.২.৩. মহাভারতের বিভিন্ন পর্ব থেকে গৃহীত।