৫৬
কুরুক্ষেত্রে
যথা দাবানল বেড়ে অনল-প্রাচীরে
সিংহ-বৎসে। সপ্ত রখী বেড়িলা তেমতি
কুমারে। অনল-কণা-রূপে শর, শিরে
পড়ে পুঞ্জে পুঞ্জে পুড়ি, অনিবার-গতি !
সে কাল অনল-তেজে, সে বনে যেমতি
রোষে, ভয়ে সিংহ-শিশু গরজে অস্থিরে
গরজিলা মহাবাহু চারি দিকে ফিরে
উড়িল চৌদিকে ধূলা, পদ-আস্ফালনে
অশ্বের। নিশ্বাস ছাড়ি আৰ্জ্জুনি বিষাদে,
ছাড়িলা জীবন-আশা তরুণ যৌবনে।
আঁধারি চৌদিক যথা রাহু গ্রাসে চাঁদে,
গ্রাসিলা বীরেশে যম। অন্তের শয়নে
নিদ্রা গেলা অভিমন্যু অন্যায় বিবাদে।১
৫৭
শৃঙ্গার-রস
শুনিনু নিদ্রায় আমি, নিকুঞ্জ-কাননে,
মনোহর বীণা-ধ্বনি ;—দেখিনু সে স্থলে
রূপস২ পুরুষ এক কুসুম-আসনে,
ফুলের চৌপর৩ শিরে, ফুল-মালা গলে।
হাত ধরাধরি করি নাচে কুতূহলে
চৌদিকে রমণী-চয়, কামাগ্নি-নয়নে,—
উজলি কানন-রাজি বরাঙ্গ-ভূষণে,
ব্ৰজে যথা ব্ৰজাঙ্গনা রাস-রঙ্গ-ছলে ।
সে কামাগ্নি-কণা লয়ে সে যুবক, হাসি
জ্বালাইছে হিয়াবৃন্দে ; ফুল-ধনুঃ ধরি
হানিতেছে চারি দিকে বাণ রাশি রাশি
কি দেব কি নর উভে জর জর করি।
“কামদেব অবতার রস-কুলে আসি,
শৃঙ্গার রসের নাম।” জাগিনু শিহরি।
৫৮
* * * *
নহি আমি,চারু-নেত্রা, সৌমিত্রি৪ কেশরী;
তবে কেন পরাভূত না হব সমরে ?
চন্দ্র-চূড়-রখী তুমি, বড় ভয়ঙ্করী,
মেঘনাদ-সম শিক্ষা মদনের বরে।
গিরির আড়ালে থেকে, বাঁধ, লো সুন্দরি
নাগ-পাশে অরি তুমি ; দশ গোটা শরে
কাট গণ্ডদেশ তার, দণ্ড লো অধরে ;
মুহুর্মুহুঃ ভূকম্পনে অধীর লো করি !—
এ বড় অদ্ভুত রণ ! তব শঙ্খ-ধ্বনি
শুনিলে টুটে লো বল। শ্বাস-বায়ু-বাণে
ধৈরয-কবচ তুমি উড়ায়ে, রমণি,
কটাক্ষের তীক্ষ্ম অস্ত্রে বিঁধ লো পরাণে। —
এতে দিগম্বরী-রূপ যদি সুবদনি,
ত্ৰস্ত হয়ে ব্যস্তে কে লো পরাস্ত না মানে ?
৫৯
সুভদ্রা
যথা ধীরে স্বপ্ন-দেবী রঙ্গে সঙ্গে করি
মায়া-নারী—রত্মোত্তমা রূপের সাগরে,—
পশিলা নিশায় হাসি মন্দিরে সুন্দরী
সত্যভামা, সাথে ভদ্রা, ফুল-মালা করে।
বিমলিল দীপ-বিভা ; পূরিল সত্বরে
সৌরভে শয়নাগার, যেন ফুলেশ্বরী
সরোজিনী প্রফুল্লিলা আচম্বিতে সরে,
কিম্বা বনে বন-সখী সুনাগকেশরী !
শিহরি জাগিলা পার্থ, যেমতি স্বপনে
সম্ভোগ-কৌতুকে মাতি সুপ্ত জন জাগে ; —
কিন্তু কাঁদে প্রাণ তার সে কু-জাগরণে,
সাধে সে নিদ্রায় পুনঃ বৃথা অনুরাগে।
তুমি পার্থ ভাগ্য-বলে জাগিলা সুক্ষণে
মরতে স্বরগ-ভোগ ভোগিতে সোহাগে।৫
১. মহাভারতের দ্রোণ পর্বের প্রসঙ্গ।
২. রূপবান।
৩. টোপর।
৪. সুমিত্রার পুত্র — লক্ষ্মণ।
৫. মহাভারতের প্রসঙ্গ।