ফের কোলকাতা ১ম- অংশ (ফের St.Xavier's ও রবীন্দ্রনাথের গানচর্চা)
আমি St. Xavier's থেকে এফএ দিই ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হই।
আমি যে এবার পরীক্ষায় এক ধাপ নেবে যাই, তার কারণ দু-দুবার রোগাক্রান্ত হয়ে আমি পরীক্ষা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েছিলুম। ইস্কুলের লেখাপড়ায় আমার মন লাগত না। তা ছাড়া rheumatic fever-এর প্রসাদে আমার শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ডাক্তারবাবুরা ভয় দেখিয়েছিলেন যে, উক্ত রোগে যদি আমার হৃদযন্ত্র বিগড়ে গিয়ে থাকে, তা হলে তার আর কোন চিকিৎসা নেই। এবং আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, আমি যেন কোন রকম exercise না-করি।আমি এর পূর্বে ফুটবল খেলতুম। আমি এবং আমার ভাই মন্মথ বোধ হয় প্রথম বাঙালি ছেলে যারা ফুটবলে পদাঘাত করে। মন্মথ অক্সফোর্ড মিশনের ব্রাউন সাহেবের কাছে ফুটবল খেলা শিখেছিল।মন্মথর ছিল শরীরের গড়ন চমৎকার ও বলিষ্ঠ । ভয়ডর কাকে বলে সে জানত না। আমার বন্ধু ।নারায়ণ শীলের কাকা হরিদাস শীল একদিন আমাদের কাছে প্রস্তাব করেন যে, এসো আমরা সকলে মিলে ফুটবল খেলা শুরু করি। এবং তিনি নিজের ব্যয়ে একটি ফুটবল কিনে আমাদের দেন। মন্মথ ফুটবল খেলার নিয়মকানুন সব জানত। সে-ই আমাদের ফুটবল খেলা শেখায়। মন্মথ আর আমি, আমরা দুটি পাড়াগাঁয়ে ছেলে forward খেলতুম | ধাক্কাধুক্কি খাওয়ায় আমরা ভয় পেতুম না।আমি কস্মিনকালে কোন খেলাতে ভালো ছিলুম না। কিন্তু আমার এই ফুটবল খেলার নেশা হয়।ক্ৰমে-ক্রমে আরও পাঁচজন ছেলে ফুটবল খেলায় মত্ত হয়ে ওঠে। লালচাঁদ বড়ালও এই খেলোয়াড়দের ভিতর একজন ছিল। এদের ভিতর একটি ছোকরাকে আমি বহুকাল পরে দেখি। তখন তিনি সেক্রেটারিয়েটে কাজ করেন। আর তাঁর প্রায় পেন্সন নেবার বয়স হয়েছে। তিনি আমাকে বলেন যে, তিনি নিজ ব্যয়ে শিবপুরে একটি ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর অল্পবয়সের এই শখ চিরজীবনের প্রধান শখ হয়ে উঠেছিল। আমাদের ভিতর অবশ্য আমার ভাই মন্মথ পয়লা নম্বরের ফুটবল-খেলিয়ে হয়ে ওঠেন।গোরাদের সঙ্গে ম্যাচ খেলতে গিয়ে তাঁর একটি পা জখম হয়।
আমি এই অসুখের পর ফুটবল খেলা ছেড়ে দিলুম। খেলাধুলো করিনে, ইস্কুল-কলেজের বইও পড়িনে।এ অবস্থায় আমার পক্ষে দিনযাপন করা কষ্টকর হয়ে উঠল। দাদা আশুতোষ চৌধুরী বিলেত থেকে অনেক ফরাসি বই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন, 'তুমি ঘরে চুপচাপ করে বসে থাকো, ফরাসি শেখো না কেন? আমি তোমাকে সাহায্য করব।' সেই থেকে আমার ফরাসি বই পড়ার অভ্যাস হয়ে গেল। দাদার সঙ্গে কলকাতা প্রত্যাবর্তনের পর আমার জীবন ও মনের মোড় ফিরে গেল। দাদা যে-সব নতুন লেখকের বই নিয়ে এসেছিলেন, আমি পূর্বে কখনও তাদের নাম শুনিনি— যথা, রসেটি ও সুইনবার্ন প্রভৃতির কবিতা। আর ছবি সম্বন্ধে pre-Raphaelite art-এর সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই।
দাদার বাড়ির আবহাওয়া aesthetic ছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রায় প্রত্যহই আমাদের মর্টুস লেনের বাসায় শুভাগমন করতেন। সঙ্গে থাকতেন তার ভাগিনেয় সত্যপ্রসাদ গাঙ্গুলী। আমার যত দূর মনে পড়ে সত্যপ্রসাদ হারমনিয়ামে রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গত করতেন। তিনি মধ্যে-মধ্যে অভিজ্ঞা নামে একটি ভ্রাতুষ্পুত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে আসতেন। এমন চমৎকার গাইয়ে মেয়ে আমি ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি। তার গলা ছিল সুমিষ্ট ও দরদি, আর সে অভিনয় করত অতি সুন্দর । আমি তাকে বাল্মীকি প্রতিভার প্রথম গান থেকে আরম্ভ করে শেষ গান পর্যন্ত অবলীলাক্রমে এককালীন বসে গাইতে শুনেছি। বাল্মীকি প্রতিভা গীতিনাট্য। তার গানের রূপ ফুটিয়ে তুলতে অভিনয়ের আবশ্যক।ও-নাটকের সমস্ত গান গাওয়াই অত্যন্ত কঠিন, কারণ তাতে দেশি-বিলেতি নানা রূপ সুর আছে, দেশি গান ভারি-ভারি রাগেরও আছে, এবং দেশি-বিলেতি প্রত্যেক সুর বিভিন্ন রকম অভিনয়ের অপেক্ষা রাখে। বাল্মীকি প্রতিভার গান অভিজ্ঞার মতো মৰ্মস্পশী করে গাইতে আমি আর কাউকে কখনও শুনিনি। সঙ্গীতের বিষয়ে তার কিছু শিক্ষাও ছিল; সে কোন-কোন হিন্দি গানও অতি দরদ দিয়ে গাইত। 'ঠারি রহো মেরে আঁখন আগে' বলে অভিজ্ঞার গীত একটি ছায়ানটের গান আজও আমার কানে লেগে আছে। অভির সঙ্গে যখন প্রথম দেখা হয়, তখন তার বয়স বছর-তেরো হবে। দেহ বলে তার কোন জিনিস ছিল না। মুখের মধ্যে দুটি বড়-বড় জীবন্ত চোখ ছিল। আর সে চোখদুটি মাধুর্যপূর্ণ।সে ছিল শেক্সপিয়রের কল্পিত আরিয়েলের সগোত্র। অর্থাৎ অশরীরী সঙ্গীত। সে মেয়েটি বিবাহিত হবার জন্য জন্মগ্রহণ করেনি। অবশ্য পরে তার বিবাহ হয়েছিল, আমার বিলেতে পরিচিত কোন যুবকের সঙ্গে। আমি শুনেছি যে, বিবাহের এক মাসের মধ্যেই সে ক্ষয়কাশে মারা যায়। এ খবর যখন পাই, তখন আমি বিলেতে ছিলুম। শুনে আমার মনে হল, বাংলা দেশের একটি রত্নপ্রদীপ অকালে নিভে গেল। আমি অভিজ্ঞার বিষয়ে এত কথা লিখছি এই কারণে যে, জীবনে কোন-কোন লোক প্রথম থেকেই আমাদের মনে বিশেষ ছাপ রেখে যায়, যা কখনও বিলুপ্ত হয় না। অভি ছিল সেই দু-চারটি লোকের ভিতর একজন। ইংরেজরা বলে, Whom the gods love die young. অভি ছিল সেই দেবানাং প্রিয় একটি বালিকা। কেননা, সে কখনও কিশোরী হয়নি। এরই বড়দিদি প্রতিভা দেবীকে আমার দাদা বিবাহ করেন।
আমি যে এবার পরীক্ষায় এক ধাপ নেবে যাই, তার কারণ দু-দুবার রোগাক্রান্ত হয়ে আমি পরীক্ষা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েছিলুম। ইস্কুলের লেখাপড়ায় আমার মন লাগত না। তা ছাড়া rheumatic fever-এর প্রসাদে আমার শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ডাক্তারবাবুরা ভয় দেখিয়েছিলেন যে, উক্ত রোগে যদি আমার হৃদযন্ত্র বিগড়ে গিয়ে থাকে, তা হলে তার আর কোন চিকিৎসা নেই। এবং আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, আমি যেন কোন রকম exercise না-করি।আমি এর পূর্বে ফুটবল খেলতুম। আমি এবং আমার ভাই মন্মথ বোধ হয় প্রথম বাঙালি ছেলে যারা ফুটবলে পদাঘাত করে। মন্মথ অক্সফোর্ড মিশনের ব্রাউন সাহেবের কাছে ফুটবল খেলা শিখেছিল।মন্মথর ছিল শরীরের গড়ন চমৎকার ও বলিষ্ঠ । ভয়ডর কাকে বলে সে জানত না। আমার বন্ধু ।নারায়ণ শীলের কাকা হরিদাস শীল একদিন আমাদের কাছে প্রস্তাব করেন যে, এসো আমরা সকলে মিলে ফুটবল খেলা শুরু করি। এবং তিনি নিজের ব্যয়ে একটি ফুটবল কিনে আমাদের দেন। মন্মথ ফুটবল খেলার নিয়মকানুন সব জানত। সে-ই আমাদের ফুটবল খেলা শেখায়। মন্মথ আর আমি, আমরা দুটি পাড়াগাঁয়ে ছেলে forward খেলতুম | ধাক্কাধুক্কি খাওয়ায় আমরা ভয় পেতুম না।আমি কস্মিনকালে কোন খেলাতে ভালো ছিলুম না। কিন্তু আমার এই ফুটবল খেলার নেশা হয়।ক্ৰমে-ক্রমে আরও পাঁচজন ছেলে ফুটবল খেলায় মত্ত হয়ে ওঠে। লালচাঁদ বড়ালও এই খেলোয়াড়দের ভিতর একজন ছিল। এদের ভিতর একটি ছোকরাকে আমি বহুকাল পরে দেখি। তখন তিনি সেক্রেটারিয়েটে কাজ করেন। আর তাঁর প্রায় পেন্সন নেবার বয়স হয়েছে। তিনি আমাকে বলেন যে, তিনি নিজ ব্যয়ে শিবপুরে একটি ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর অল্পবয়সের এই শখ চিরজীবনের প্রধান শখ হয়ে উঠেছিল। আমাদের ভিতর অবশ্য আমার ভাই মন্মথ পয়লা নম্বরের ফুটবল-খেলিয়ে হয়ে ওঠেন।গোরাদের সঙ্গে ম্যাচ খেলতে গিয়ে তাঁর একটি পা জখম হয়।
আমি এই অসুখের পর ফুটবল খেলা ছেড়ে দিলুম। খেলাধুলো করিনে, ইস্কুল-কলেজের বইও পড়িনে।এ অবস্থায় আমার পক্ষে দিনযাপন করা কষ্টকর হয়ে উঠল। দাদা আশুতোষ চৌধুরী বিলেত থেকে অনেক ফরাসি বই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন, 'তুমি ঘরে চুপচাপ করে বসে থাকো, ফরাসি শেখো না কেন? আমি তোমাকে সাহায্য করব।' সেই থেকে আমার ফরাসি বই পড়ার অভ্যাস হয়ে গেল। দাদার সঙ্গে কলকাতা প্রত্যাবর্তনের পর আমার জীবন ও মনের মোড় ফিরে গেল। দাদা যে-সব নতুন লেখকের বই নিয়ে এসেছিলেন, আমি পূর্বে কখনও তাদের নাম শুনিনি— যথা, রসেটি ও সুইনবার্ন প্রভৃতির কবিতা। আর ছবি সম্বন্ধে pre-Raphaelite art-এর সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই।
দাদার বাড়ির আবহাওয়া aesthetic ছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রায় প্রত্যহই আমাদের মর্টুস লেনের বাসায় শুভাগমন করতেন। সঙ্গে থাকতেন তার ভাগিনেয় সত্যপ্রসাদ গাঙ্গুলী। আমার যত দূর মনে পড়ে সত্যপ্রসাদ হারমনিয়ামে রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গত করতেন। তিনি মধ্যে-মধ্যে অভিজ্ঞা নামে একটি ভ্রাতুষ্পুত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে আসতেন। এমন চমৎকার গাইয়ে মেয়ে আমি ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি। তার গলা ছিল সুমিষ্ট ও দরদি, আর সে অভিনয় করত অতি সুন্দর । আমি তাকে বাল্মীকি প্রতিভার প্রথম গান থেকে আরম্ভ করে শেষ গান পর্যন্ত অবলীলাক্রমে এককালীন বসে গাইতে শুনেছি। বাল্মীকি প্রতিভা গীতিনাট্য। তার গানের রূপ ফুটিয়ে তুলতে অভিনয়ের আবশ্যক।ও-নাটকের সমস্ত গান গাওয়াই অত্যন্ত কঠিন, কারণ তাতে দেশি-বিলেতি নানা রূপ সুর আছে, দেশি গান ভারি-ভারি রাগেরও আছে, এবং দেশি-বিলেতি প্রত্যেক সুর বিভিন্ন রকম অভিনয়ের অপেক্ষা রাখে। বাল্মীকি প্রতিভার গান অভিজ্ঞার মতো মৰ্মস্পশী করে গাইতে আমি আর কাউকে কখনও শুনিনি। সঙ্গীতের বিষয়ে তার কিছু শিক্ষাও ছিল; সে কোন-কোন হিন্দি গানও অতি দরদ দিয়ে গাইত। 'ঠারি রহো মেরে আঁখন আগে' বলে অভিজ্ঞার গীত একটি ছায়ানটের গান আজও আমার কানে লেগে আছে। অভির সঙ্গে যখন প্রথম দেখা হয়, তখন তার বয়স বছর-তেরো হবে। দেহ বলে তার কোন জিনিস ছিল না। মুখের মধ্যে দুটি বড়-বড় জীবন্ত চোখ ছিল। আর সে চোখদুটি মাধুর্যপূর্ণ।সে ছিল শেক্সপিয়রের কল্পিত আরিয়েলের সগোত্র। অর্থাৎ অশরীরী সঙ্গীত। সে মেয়েটি বিবাহিত হবার জন্য জন্মগ্রহণ করেনি। অবশ্য পরে তার বিবাহ হয়েছিল, আমার বিলেতে পরিচিত কোন যুবকের সঙ্গে। আমি শুনেছি যে, বিবাহের এক মাসের মধ্যেই সে ক্ষয়কাশে মারা যায়। এ খবর যখন পাই, তখন আমি বিলেতে ছিলুম। শুনে আমার মনে হল, বাংলা দেশের একটি রত্নপ্রদীপ অকালে নিভে গেল। আমি অভিজ্ঞার বিষয়ে এত কথা লিখছি এই কারণে যে, জীবনে কোন-কোন লোক প্রথম থেকেই আমাদের মনে বিশেষ ছাপ রেখে যায়, যা কখনও বিলুপ্ত হয় না। অভি ছিল সেই দু-চারটি লোকের ভিতর একজন। ইংরেজরা বলে, Whom the gods love die young. অভি ছিল সেই দেবানাং প্রিয় একটি বালিকা। কেননা, সে কখনও কিশোরী হয়নি। এরই বড়দিদি প্রতিভা দেবীকে আমার দাদা বিবাহ করেন।
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই,
ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।