:::: সূচীপত্র ::::
ফের কোলকাতা ২য়অংশ (সঙ্গীতচর্চা)


সেকালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ছিল একটি সঙ্গীতভবনরবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতিতে পড়েছি যে, এককালে তাঁদের বাড়িতে বড়-বড় সব ওস্তাদ অধিষ্ঠান করতেন, যেমন যদু ভট্টকিন্তু আমি তাঁদের দেখিনিএকটি বৃদ্ধ ওস্তাদ প্রতিভা দেবীদের গৃহশিক্ষক ছিলেনআমার ধারণা, তিনি খুব ভালো গাইতেনতাঁর গানে তানের বাহুল্য ছিল নাঅথচ রাগরাগিণী, সুর ও তালের উপর তাঁর সম্পূর্ণ অধিকার ছিলআমি পূর্বে যে হিন্দি গানটির উল্লেখ করেছি, সেটি বিষ্ণুর গানউপরন্তু রবীন্দ্রনাথের অল্পবয়সের স্বরচিত গান বাড়ির অনেক ছেলেমেয়ে গাইতএবং মন্দ গাইত নাদিনেন্দ্রনাথ তখন বালক ছিলেনতিনি যে পরে প্রসিদ্ধিলাভ করেছিলেন, সে এই আবহাওয়ার গুণেরবীন্দ্রনাথকে আমি কখনও কোন যন্ত্র বাজাতে দেখিনিতিনি চর্চা করেছিলেন একমাত্র কণ্ঠসঙ্গীতআমরা অবশ্য জোড়াসাঁকোর বাড়িতে থাকতুম না, থাকতুম মর্টুস লেনে একটি ছোট বাসাবাড়িতেকিন্তু দাদার বিবাহ-সম্বন্ধ হবার পর থেকে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ হয়এর একটি কারণ বোধ হয় আমরা ব্রাহ্ম না-হলেও reformed Hindus ছিলুমঅর্থাৎ হিন্দু সমাজের বিধিনিষেধ আমরা উপেক্ষা করতুমএবং আমরা ভাইরা সকলেই অল্পবিস্তর শিক্ষিত ছিলুম


এই ঘনিষ্ঠতার ফলে ঠাকুর পরিবারের ঐকান্তিক সঙ্গীতচর্চার প্রভাব থেকে আমি মুক্ত ছিলুম নাতাঁদের সঙ্গীতের দুটি ধারা একটি ক্ল্যাসিকাল আর একটি রবীন্দ্রনাথের স্বকীয় দুটিই পাশাপাশি চলতজোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার যে মার্গসঙ্গীতের প্রকৃষ্ট চর্চা করতেন, তার প্রমাণ আদি ব্রাহ্মসমাজের আদি ব্রহ্মসঙ্গীতে পাওয়া যায়আমি ছেলেবেলা থেকে এর কতকগুলি গানের সঙ্গে পরিচিত ছিলুমসে গানগুলি বাংলা দেশের গাইয়ে-বাজিয়েদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিল যথা, গাও হে তাঁহার নাম, খাম্বাজ-চৌতাল, আচল ঘন গহন, বাহার-চৌতাল; দেখিলে তোমার সেই, বাহার-একতালা; তুমি হে ভরসা মম, কাফি-ঝাঁপতাল ইত্যাদিহয়তো পূর্বে এ কথার আমি উল্লেখ করেছি, কিন্তু তার পুনরুক্তি করায় ক্ষতি নেইহিন্দি গান বাংলায় প্রথম এঁরাই ভাঙেনপরে শুনেছি 'গাও হে' এবং 'দেখিলে তোমার' গান দুটি গণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের, 'আচল ঘন' বিষ্ণু ওস্তাদের, এবং 'তুমি হে ভরসা' জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিতআমি এ সব গানের তালের উল্লেখ করেছিযদিচ আমি তালের কোন ধার ধারিনেতবে চৌতাল শুনলে বুঝতে পারি যে তার বোল 'ভেটকি মাছের তিনখানা কাঁটা নয়

রবীন্দ্রনাথের অল্পবয়সের গান অধিকাংশই পিলু বারোয়াঁ জাতের ছিল, এবং তার তাল ছিল বিলম্বিত নয় নাচুনেআমার কান বাঙালির স্বকৃতভঙ্গ মাৰ্গসঙ্গীতে অভ্যস্ত ছিল, যাতে সুরের রূপ বজায় থাকত, তান-কর্তবে ঢাকা পড়ত নাতাই কৃষ্ণনগরের মহারাজার সেতার-শিক্ষক বদ্রি সুকুলকে খুঁজে বার করলুমতিনি শ্যাম ক্ষেত্রী নামক একটি যুবকের সঙ্গে রূপচাঁদ রায় স্ট্রিটে বাস করতেনউভয়েই ডন, মুগুর ও কুস্তি করতেন, আর অবসরমতো সেতার বাজাতেনসেকালে সঙ্গীত আমাকে বিশেষ রকম বিচলিত করতআমাদের বাসায় একদিন সকালবেলা বদ্রি সুকুল ভৈরবী বাজান, তা শুনে আমার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগলএই সুকুলজি পরে ঠাকুর পরিবারের কোন-কোন ছেলেমেয়ের সঙ্গীতশিক্ষক হন। তিনি ছিলেন ঘোর হিন্দু, পয়লা নম্বরের পালোয়ান এবং অতি সচ্চরিত্রএর থেকে বুঝতে পারা যাবে যে, আমার কৃষ্ণনাগরিক সঙ্গীতপ্রীতির মায়া একেবারে কাটেনিসে যা-ই হোক, ঠাকুর পরিবারের aesthetic আবহাওয়া নিশ্চয়ই অলক্ষিতে আমার সঙ্গীতচর্চার কান্তি পুষ্ট করেছিলঅপর পক্ষে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রতি অনুকূল ছিলেন। 'বাল্মীকি প্রতিভা'র আমি খুব তারিফ করেছিও-নাটিকার কথা, সুর ও অভিনয় সবই রবীন্দ্রনাথের প্রতিভাপ্রসূতএবং শ্ৰীমতী অভিজ্ঞা ছিল ললিতকলায় তাঁর অগ্রগণ্য শিষ্যাপূর্বেই বলেছি যে, রূপজ্ঞানে আমি বর্জিত ছিলুম নাযে-রূপ চোখে দেখা যায় সে রূপের আমি চিরকালই অনুরাগী ছিলুমএবং এই ঠাকুর পরিবারের তুল্য সুন্দর স্ত্রী-পুরুষ আমি অন্য কোন পরিবারে দেখিনিযে-রূপ শ্রোত্ররসায়ন, সে রূপেরও এঁরা সম্যক চর্চা করতেনবাকি থাকল এক কাব্যের কথাসে কথা পরে বলব

সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।