ফের কোলকাতা ৩য়- অংশ (পরিচিতজন-১)
পূর্বে বলেছি
আমাদের পরিবার প্রায় সকলেই বই-পড়িয়ে লোক ছিলেন। বাবা সেকালের হিন্দু কলেজে শিক্ষিত। সংস্কৃত তিনি এক বর্ণও জানতেন না ও বাংলা সাহিত্যকে তিনি
একটু অবজ্ঞার চক্ষেই দেখতেন। তাঁর বন্ধুবান্ধবরাও সকলেই ইংরেজিনবিশ ছিলেন। আমি ছেলেবেলায় তাঁদের
যে-কথোপকথন শুনেছি, তার থেকে আমার ধারণা তাঁরা সকলেই
বায়রনের ভক্ত ছিলেন। আর
শেক্সপিয়র তাঁরা সকলেই জানতেন। বায়রন
যে তাঁদের এত প্রিয় ছিল, তার কারণ তিনি স্বাধীনতার বাণী
প্রচার করেছিলেন। আমার
বয়স যখন পাঁচ-ছয় বছর, তখন বাংলা দেশের ইংরেজি শিক্ষিত
সম্প্রদায়ের ভিতর patriotism-এর জোয়ার বইতে আরম্ভ করেছে। তাঁরা পলিটিক্সের কোন ধার ধারতেন
না, কিন্তু ভারতবর্ষ যে পরাধীন, এ অবস্থা তাঁদের মনকে অত্যন্ত পীড়া দিত। আর আমাদের ছোট ছেলেদেরও—
স্বাধীনতাহীনতায় কে
বাঁচিতে চায় রে
কে বাঁচিতে চায়—
রঙ্গলালের কবিতার এই
ছত্রটি মুখস্থ করতে হত। তাঁরা
ধরে নিয়েছিলেন,
আমরা যাকে কাব্য বলি, তা শুধু শেক্সপিয়রেই
পাওয়া যায়। আমার
যখন সাত-আট বৎসর বয়স, তখন আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আশুতোষ চৌধুরী এবং তাঁর বন্ধুবান্ধবরা
জন স্টুয়ার্ট মিল-এর মহাভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। প্রায়ই তাঁদের মুখে মিলের নাম শুনতুম। অবশ্য তাঁরা মিলের Logic Economics কেউ পড়েননি। তাঁরা
পড়তেন শুধু Three
Essays on Religion আর Subjection of Women. এমার্সনের নামও তাঁদের
মুখে শুনেছি। আমি
অল্পবয়সে এই মিল ও এমাসনের নাম শুনে-শুনে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিলুম। তার পরে অদ্যাবধি আমি এ দুই লেখকের
একখানি বইও পড়িনি। দাদারা
নবীন সেনের 'পলাশীর যুদ্ধ' ও বঙ্কিমের প্রথম যুগের নভেল সব পড়তেন। আজও আমার বেশ মনে আছে যে আমার
যখন আট বৎসর বয়স,
আমি তখন প্রথম রবীন্দ্রনাথের নাম শুনি। রবীন্দ্রনাথ তখন 'জ্ঞানাঙ্কুর' কি ঐরকম একটা কাগজে
কবিতা প্রকাশ করতেন। এবং
রবি ঠাকুর কবি কি না, দাদা ও তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সে বিষয়ে আলোচনা করতে শুনেছি।
তারপর রবীন্দ্রনাথের কোন কাব্য আমরা দেখিওনি, পড়িওনি। আমার বয়স যখন চৌদ্দ, তখন আমি হেয়ার স্কুলের কোন সহপাঠীর অনুরোধে 'ভগ্নহৃদয়' একটু পড়ি। পড়ে যে খুব উল্লসিত হয়ে উঠি, তা বলতে পারিনে। সত্য কথা বলতে গেলে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয়ের পরেই আমি তাঁর কাব্যের সঙ্গে পরিচিত হই। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মট্স লেনের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন দাদার সঙ্গে তাঁর 'কড়ি ও কোমল' প্রকাশের পরামর্শ করতে। দাদাই ঐ কবিতা পুস্তক প্রকাশের ভার নিয়েছিলেন। বইটি ছাপা হবার পূর্বে তিনি কবিতাগুলি দাদাকে পড়ে শোনাতেন, সে ক্ষেত্রে আমি উপস্থিত থাকতুম। কবিতা বস্তুটি কী, সে বিষয়ে তাঁদের আলোচনা শুনতুম। তার থেকেই আমার ধারণা হয় যে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্বন্ধে যথেষ্ট অন্তর্দৃষ্টি আছে, যা হেম-নবীনের ছিল না। এই আলোচনার ফলে কবিতা সম্বন্ধে আমার মন যেন জেগে উঠল। তিনি কবে কী বলেছেন, তা অবশ্য আমার মনে নেই। তবে যেমন তিনি আমাদের পরিবারে সঙ্গীতের আবহাওয়া সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনি তিনি আমাদের মধ্যে কাব্যচর্চারও আবহাওয়া সৃষ্টি করেন, এই পর্যন্ত বলতে পারি। খুব সম্ভবত আমি তার দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছি।
এই সময়ে আমি একটি নতুন সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরিচিত হই। দাদার সঙ্গে-সঙ্গে ব্যোমকেশ চক্রবর্তী, সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহ ও লোকেন্দ্রনাথ পালিত বিলেত থেকে ফিরে আসেন। এঁরা সকলেই বিলেতে দাদার সমসাময়িব ছিলেন। ব্যোমকেশ চক্রবর্তীকে আমি প্রথম দেখি কৃষ্ণনগরে। রাজবাড়ির পূর্ব দিকে সুকুলপাড়া নামে একটি পাড়া আছে, সেখানে সব হিন্দুস্থানি ব্রাহ্মণের বাস— যারা একরকম বাঙালি হয়ে গেছে। আমি দাদার সঙ্গে পরেশ সুকুল বলে একটি ভদ্রলোকের বাড়ি যাই, এবং সেখানেই প্রথম ব্যোমকেশকে দেখি। তিনি দ্বিজেন্দ্রলালের জ্যেঠতুতো ভাই রাজেশ্বরবাবুর কন্যা মোহিতকে ব্বিাহ করেন। তাকে দেখে আমি একটু চমকে যাই। অতি সুন্দর পুরুষ, নাক-চোখ-মুখ সব কুঁদে কাটা, আর কথাবার্তায়, ফুর্তিতে টগবগ করছেন। যদিচ তিনি আমাদের স্বজাত, তবু প্রথম-প্রথম তার সঙ্গে তেমন মেলামেশা ছিল না। কিন্তু কালক্রমে তিনি আমাদের পরিবারের একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে ওঠেন। সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহ আমাদের বাসায় মধ্যে-মধ্যে আসতেন। এবং সেই থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত আমি তার সঙ্গে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ ছিলুম। তিনি ছিলেন অতিশয় অমায়িক লোক এবং যথেষ্ট বিদ্যাবুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি নিজ গুণে কলিকাতা হাইকোর্টে সব চাইতে বড় ব্যারিস্টার হয়ে ওঠেন, এবং শেষে লর্ড উপাধি প্রাপ্ত হন। তিনি ফরাসি ভাষা ভালোই জানতেন এবং অসংখ্য ফরাসি নভেল পড়তেন। সুতরাং সাহিত্যরসে একেবারে বঞ্চিত ছিলেন না।
লোকেন পালিত ছিলেন I C S, আর দিবারাত্রি সাহিত্যালোচনা করতেন। এ বিষয়ে তার মুখে খই ফুটত। আমি অবশ্য তার বই-পড়া মতামত সব
সময়ে গ্রাহ্য করতে পারতুম না। তিনি
ছিলেন রবীন্দ্রনাথের মহাভক্ত। তিনি
স্বনামধন্য ব্যারিস্টার টি পালিতের পুত্র। পালিত পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের বহু কালের ঘনিষ্ঠতা
ছিল। আমার বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথ
যখন প্রথম বিলেত যান, তখন ছোকরা লোকেন পালিতের সঙ্গে তাঁর পরিচয়
হয়। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ
আবিষ্কার করেন যে,
লোকেন অসাধারণ বুদ্ধিমান ও কইয়ে-বলিয়ে ছোকরা।
এই নব-বিলাতফেরতের দল সকলেই ছিলেন
বিদ্বান ও বুদ্ধিমান লোক। ব্যোমকেশ
ছিলেন বিজ্ঞানে শিক্ষিত। সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন
সিংহ ছিলেন আইনে অসাধারণ পারদর্শী। লোকেন
পালিত ছিলেন সাহিত্যে অভিজ্ঞ । আমি
এর পূর্বে সেকালের জনকতক বিলেতফেরতকে চিনতুম, যথা : ব্যারিস্টার মনোমোহন ঘোষ,
তাঁর ভ্রাতা, লালমোহন ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ বাঁড়ুজ্যে ও কৃষ্ণগোবিন্দ
গুপ্ত। কিন্তু তাঁরা ছিলেন
আমার অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ। এই
নতুন বিলেতফেরত সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমার যেমন ঘনিষ্ঠতা আমাদের প্রতি অনুকুল ছিলেন। এদের দলে পড়ে আমাদের দৈনিক জীবনযাত্রায়
কিছু-কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল; যথা টেবিলে ছুরিকাটায় খাওয়া, মুসলমান বাবুর্চি রাখা ইত্যাদি। আমরা সব ভাই-ই হয়ে উঠেছিলুম প্রায় আধা-বিলেতফেরত, যদিচ আমরা
বিলাতি পোশাক পরতুম না। সংক্ষেপে
বলতে গেলে, আমরা যেমন reformed Hindus ছিলুম, তেমনি reformed দেশি হয়ে উঠেছিলুম। অর্থাৎ হিদুয়ানি ও স্বদেশভক্তির
ভিতের উপর আমাদের মনের চরিত্র গড়ে উঠেছিল।
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই,
ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।