:::: সূচীপত্র ::::
ফের কোলকাতা ৪র্থ - অংশ (পরিচিতজন)

এখানে একটি গল্প বলিআমি যেদিন সন্ধ্যায় লন্ডনে গিয়ে পোঁছই, তার পরের দিনই Inner Temple-এ ভর্তি হই, আর সেই দিন সন্ধ্যাবেলায়ই সেখানে dinner খেতে যাইTemple-এ এক-এক term-এর ভিতর অন্তত দু-দিন dinner না-খেলে সে term রক্ষা করা হয় নাআমি গিয়ে দেখি প্রকাণ্ড খানা-কামরা লোকে ভর্তিএকটি টেবিলে এক বাঙালি ছোকরা বসেছিলেন, তাঁর পাশের চেয়ার খালি দেখে আমি সেই চেয়ারে বসে পড়লুমতিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আপনি বাঙালি ?
 হাঁ
বিলেতে এলেন কবে ?
গতকল্য
আমি আপনাকে ছুরিকাঁটা ব্যবহার করতে শেখাই
— আচ্ছা।
এর পর তিনি আমাকে শেখাতে লাগলেন যে ডান হাতে ধরতে হয় ছুরি, আর বা হাতে কাঁটাআর কোন কাঁটা-ছুরিতে মাছ খেতে হয়, তা-ও দেখালেনআমি তাঁকে ধন্যবাদ দিলুমতারপরে প্রথমে যখন সুরুয়া এল, ভিতরে খোঁদল-করা প্লেটে, তখন তিনি সে প্লেটটি বুকের দিকে হেলিয়ে চামচ দিয়ে সুপ তুলে খেতে লাগলেনআমি তাকে বললুম 'এ প্লেটটি উলটােদিকে হেলাতে হয়।' তিনি বললেন 'আপনি আমাকে শেখাতে এসেছেন?' তখন আমি বললুম তাকিয়ে দেখুন, ইংরেজরা কী রকম করে সুপ খাচ্ছে।' একনজর দেখে, হাতের চামচ রেখে দিয়ে তিনি আমাকে নমস্কার করলেনএই ছোকরাটির নাম নলিনী বাঁড়ুজ্যে, আরার বড় উকিল কৈলাসবাবুর ছেলেবাঙালি, কিন্তু বেহারি বাঙালিনলিনী ছিলেন সুদর্শন আর অসাধারণ বলিষ্ঠপরে তিনি আমার একটি অন্তরঙ্গ বন্ধু হন

এ ঘটনা উল্লেখ করবার কারণ এইটে দেখানো যে, আমি বিলেত যাবার পূর্বেই ইংরজি খানাপিনীয় অভ্যস্ত ছিলুমআমি যে তখন পলিটিক্সে ঘোর স্বদেশি ছিলুম তার প্রমাণ উক্ত টেবিলে আমার অন্য পার্শ্বে একটি ধনী পার্শি যুবক বসেছিলেন, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন 'তুমি কি একজন কংগ্রেসওয়ালা ?' উত্তর 'হাঁ।'

এ কথা শুনেই তিনি কংগ্রেসকে আক্রমণ করলেনএবং তিনি ভারতবর্ষীয় কি না জিজ্ঞেস করায় বললেন না, তিনি পার্শি অর্থাৎ পার্শিয়ান, এবং পার্শিয়ান বলেই ইংরেজদের কাছে তাঁদের বিশেষ প্রতিপত্তি আছেতাঁদের ভলন্টিয়র দলে ভর্তি করা হয়, যা অন্য কোন ভারতবর্ষীয়কে করা হয় নাআমি বললুম 'ইংরেজরা গ্রিক সাহিত্য পড়ে, এবং গ্রিক ইতিহাস থেকেই তারা তোমাদের পূর্বপুরুষদের অসাধারণ বীরত্বের কাহিনী জানতে পেরেছেম্যারাথন ও থার্মপিলিতে তোমাদের বীরত্বের কথা কোন্‌ শিক্ষিত ইংরেজ না-জানে?'

আমাদের কথা শুনে চারপাশ থেকে ইরেজ ছোকরারা হো-হো করে হেসে উঠলএর পরে সেই কংগ্রেস-বিরোধী যুবক মৌন অবলম্বন করলেন

উক্ত কথোপকথনেই প্রমাণ যে, আমি আহারাদি বিষয়ে নকল ইংরেজ হলেও মনোভাবে খাঁটি স্বদেশি বাঙালি ছিলুমআমাকে পরে কোন-কোন সাহিত্য-সমালোচক বিলেতফেরত বলে খোঁটা দিয়েছেনএ অপবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়পদ্যলেখক আমি সরস্বতীর মাথায় বনেট পরিয়েছি, আর গদ্যলেখক হিসাবে আমার লেখার মাথায় হ্যাট পরিয়েছি

রবীন্দ্রনাথ তখন বোধ হয় চার-পাঁচখানি মাত্র কবিতাপুস্তক লিখেছিলেন, যথা ভগ্নহৃদয়, সন্ধ্যাসঙ্গীত, প্রভাতসঙ্গীত, ভানুসিংহের পদাবলী, আর ছবি ও গানকিন্তু ইতিমধ্যেই তিনি কবি হিসাবে পরিচিত হয়েছিলেনএমনকী, তিনি কবি কি না তা সমালোচকেরা আলোচনা করতেনতাঁর অভক্ত সমালোচকেরা তাঁকে বলত 'কী-জানি-কী'র কবিঅপর পক্ষে জনকতক ভক্ত তাঁর চারপাশে জুটেছিল; তাঁদের ভিতর একজন, তাঁর নাম বোধ হয় যোগেন্দ্রনাথ মিত্র, 'রবিচ্ছায়া' বলে একখানি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যা রবীন্দ্রনাথের পদ্যসংগ্রহএই ভদ্রলোককে আমি মট্‌স লেনের বাসায় প্রথম
দেখিতিনি দাদার সঙ্গে রবীন্দ্র-সাহিত্য আলোচনা করতে আসতেনতার পর বহুকাল তিনি অদৃশ্য হন। পরে তিনি যখন Board of Revenue- সেক্রেটারি হন, তখন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সমভিব্যাহারে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেনদেখলুম, গবর্নমেন্টের বড় চাকুরে হয়েও তাঁর রবি-ভক্তি সমান বজায় আছে

অক্রুর দত্ত লেনে সাবিত্রী লাইব্রেরি বলে একটি সাহিত্য সম্মিলন প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে সেকালের সাহিত্যিকেরা, যথা চন্দ্রনাথ বসু ইত্যাদি, মধ্যে-মধ্যে বক্তৃতা করতে আসতেনঅক্রুর দত্তের বাড়ির একটি যুবক আমাদের বাসায় দু-একদিন এসেছিলেন, রবীন্দ্রনাথকে সে সভায় বক্তৃতা করবার জন্য অনুরোধ করতেতিনি যে সাহিত্য বিষয়ে কিছু জানতেন, এরূপ আমার বিশ্বাস নয়আমার ধারণা, তিনি হেয়ার স্কুলে আমার সঙ্গে এক ক্লাসে পড়তেনতারপর লেখাপড়া ছেড়ে দেন

রবীন্দ্রনাথের অপর দু-চারজন বন্ধু ছিলেন, যথা প্রবোধ ঘোষ ইত্যাদিতাঁরা অবশ্য সাহিত্যিক ছিলেন না, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত ভক্ত ছিলেনএদের বিষয়ে বিশেষ কিছু বলবার নেইতারপর রবীন্দ্র- নাথের একটি কাব্যরসিক বন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তাঁর কথা পরে বলব


সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।