:::: সূচীপত্র ::::
আলোকলতা


মূল নাই, ফুল ফল পত্র নাই মোর,
বাতাসে জনম মম, তরুশিরে বাস ;
তন্তু সম সূক্ষ্ম তনু, স্ববর্ণের ডোর,
যে মোরে আশ্রয় দেয় তা’রি সর্বনাশ


চিনেছ ? 'আলোকলতা’ বলে মোরে লোকে ;
যে মোরে আদরে শিরে ধরে আপনার
নিস্তার নাহিক তার, বেড়ি পাকে, পাকে,
শ্ৰীহীন, লাবণ্যহীন, করি তনু তার,—


রস মরে, পত্র ঝরে, শরার শুকায়,
আত্মহারা আলিঙ্গনেতরু তনু,
সমাচ্ছন্ন পরশের মোহ-মদিরায় ;
প্রতিবাতে কাঁপে দেহ অসার তরুর


শুকাইলে বৃক্ষ, আমি তবে সে শুকাই ;
আলোকের ধন, পুনঃ, আলোকে লুকাই !


হয়  হ’তাম সুখী আমরা দুটিতে,—
হেলা ভরে তুমি গেলে চলি’ ;
প্রেম-শতদল হায় ফুটিতে ফুটিতে
মনে পড়ে ?গিয়েছিলে দলি


মানুষ পাষাণ হয়, কর কি প্রত্যয় ?
চেয়ে দেখসাক্ষী তার আমি ;
ঠেকিয়া শিখেছি এবে, কেহ কার’ নয়,
সত্য কি না জানে অন্তর্যামী


কেনা, বেচা, বেনেগিরি কানাকড়ি নিয়ে,
হট্টগোল হাটের মাঝারে ;
ক্ষয় গেল সোনাটুকু যাচিয়ে, যাচিয়ে,
প্রতিদিন দোকানে, বাজারে,—


অধরে যে হাসি ছিলমিশেছে অধরে,
জঙ্গলের ফুলের মতন ;
নয়নে যে জ্যোতি ছিল, শুধু অনাদরে,
নয়নে সে হয়েছে মগন


যে দিন পাঠায়েছিনু প্রেম-নিমন্ত্রণ
অবসর হয় নি তোমার,
আজ তুমি উঞ্ছবৃত্তি করেছ গ্রহণ,
কি অদৃষ্ট তোমার আমার !


ভেব’না যন্ত্রণা দিতে, গঞ্জনা, ধিক্কারে,
আজ আমি এসেছি হেথায়,
আপনার চেয়ে ভালবেসেছিনু যারে
তা কথা কা’রে কহা যায়?


বাহিরে, যেথায় তোরে করে পরিহাস
ক্ষীণ কণ্ঠে সেথা তুলি হাসি,
অন্তরে অন্তরে বাঁধা স্মৃতি নাগপাশ,
সঙ্গোপনে অশ্রুজলে ভাসি


তবুও কাঁদেন প্রাণ পূর্ব্বের মতন,—
অনুভূতি তীক্ষ্ম নহে আর,
জেনেছি মৃত্যুর স্বাদ না যেতে জীবন ;
অশ্ৰুশূন্য শুষ্ক হাহাকার !

সূত্র : বেণু ও বীণা - সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত