:::: সূচীপত্র ::::
কৃষ্ণনগর ৩য়-অংশ

আমাদের ছেলেবেলায় আর্ট কথাটা বাংলা ভাষায় ঢোকেনি

ইংরেজিতে যাকে র্টিস্ট বলি, আমরা তাদের কারিগর বলেই জানতাম আমার বিশ্বাস, এই কারিগরদের দল থেকেই আর্টিস্ট উদ্ভূত হয়েছেযেমন ইতালি দেশে হয়েছিলআমরা সে দেশের যে-সকল লোককে বড় আর্টিস্ট বলে মানি, তারা প্রথমে ছিল কারিগর মাত্র

সে যা- হোক, কৃষ্ণনগরের কুমোরেরা ছিল যথার্থ আর্টিস্টতাদের মতো প্রতিমা গড়তে অন্য প্রদেশের কুমোরেরা পারত নাসুন্দর প্রতিমা গড়া তো বড় শিল্পীর কাজকিন্তু কৃষ্ণনগরের কুমোরেরা কেউ শিব গড়তে বাঁদর গড়ত নাআমি তাদের হাতের চমৎকার আহ্লাদি পুতুল দেখেছি, যার দাম দু-পয়সাওর ভিতর এমন গড়নের কৌশল আছে, যা দেখে হাসি পায়মুখব্যাদা করে পুতুল লোককে হাসায় নাহাসায় তার গড়নের গুণে আজকাল শিশুপাঠ্য বইয়ের ছবিগুলি প্রায়ই ভয়ঙ্কর
ভয়ঙ্কর রস যে হাস্যরস নয়, সে জ্ঞান কৃষ্ণনগরের পুতুলনির্মাতাদের ছিল।  কুমোরদের মতো বাংলায় অপর কেউই ক্লে-মডেলিংয়ে ওস্তাদ ছিল না।

আমার ছেলেবেলায় যদু পাল নামক এক ব্যক্তি বিষয়ে সবচেয়ে বড় কারিগর ছিলেন, তাঁকে নির্ভয়ে আর্টিস্ট বলা যায়

দাদা তাঁ অত্যন্ত ভক্ত হয়ে পড়েন এবং দাদার অনুরোধে তিনি বিলেতি বইয়ের ছবি দেখে ভিনাস গড়তেনআমাদের বাড়িতে তাঁ রচিত ছোট-ছোট দুটি-তিনটি ভিনাস ছিল; আমার সেকালে মনে হত যে তারা বিলেতি ভিনাসের অনুরূপতার একটিও আজ নেই, কারণ পাথরে নয়, মাটিতে তাদের গড়া হয়েছিলকৃষ্ণনগরের মাটি এঁটেল হলেও পাথরের মতো বহুকাল স্থায়ী নয়সে মাটি গুণীর হাতে পড়লে নানা বস্তুর রূপ নেয়, কিন্তু সে সব বস্তুর ধর্ম নিতে পারে নাএই যদু পালের বংশধরেরা এখনও গুণী বলে পরিচিত

মাটির মূর্তি প্রথমে গড়ে পরে সেটিকে পাথরে নকল করার নাম ভাস্কর্য

কৃষ্ণনগরে স্থাপত্যেরও সাক্ষাৎ পাই আর্কিটেকচাররাজবাড়ির চকফটক অতি সুন্দর আর রাজবাড়ির পূজোর দালান ও নাটমন্দির চমৎকার কটিই মুসলমান স্থাপত্যের সুন্দর লক্ষণএর তুল্য পূজোর দালান নাটমন্দির আমি অন্য কোথাও দেখিনিনদীয়া জেলায় ইংরেজ আমলে গড়া দু-একটি প্রকাণ্ড ইমারত দেখেছি, কিন্তু তাতে চোখ-ভোলানো সৌন্দর্য নেই

কৃষ্ণনগরে রাজবাড়ির সব ইমারত কারা গড়েছে জানিনে, তবে যে মুসলমান স্থাপত্যের নমুনা, সে বিষয়ে সন্দেহ নেইনিচে মোটা উপরে সরু থামের উপরে টানা খিলেন যেমন সুদৃঢ় তেমনি সুদৃশ্যআমাদের হরিপুরের বাড়ির মণ্ডপের সুমুখে বারান্দায় এই রকম থাম খিলান ছিল; এখন নেই, দাদারা তা ভেঙে ফেলেছেন, বোধ হয় খিলেনগুলো ভেঙে পড়বে ভয়েকোথায় কৃষ্ণনগর আর কোথায় হরিপুরএই দুই জায়গায়ই যে একই নমুনার থাম খিলেন ছিল তার থেকে অনুমান করছি দুই- মুসলমান স্থাপত্যআমি পূর্বে বলেছি যে, কলেজিয়েট স্কুলে একটি গাঁড়াল মাস্টার ছিলেনশুনেছি যে-কেউ সেকালে ইমারত গড়ত, তারাই গাঁড়াল বলে পরিচিতএর থেকে অনুমান করছি যে, সেকালে ভাস্কর্য-স্থাপত্যের চর্চা হিন্দুরাই করতইংরেজ আমলে সব উলটে-পালটে গিয়েছেআর্ট জিনিসটা এখন আমাদের ওষ্ঠাগত করায়ত্ত নয়

ছবি আঁকিয়ে লোক আমি সে শহরে দেখিনিদুটি-একটি পোটো অবশ্য আমি দেখেছিকিন্তু কোন হিসাবেই তাদের চিত্রকর বলা যায় না

তারা দেয়াল রং করতে পারত লতাপাত আঁকতে পারতবোধ হয় সেকালে ছবির কোন চাহিদা ছিল না

কিন্তু ফণী সেন বলে কৃষ্ণনগরে একটি যুবক ছিলেনতিনি কলকাতার আর্ট স্কুলের ছাত্রতিনি এবং আরও তিন-চার জন আর্ট স্কুলের ছোকরা মিলে সরস্বতী, চৈতন্য প্রভৃতির ছবি এঁকে আর ছাপিয়ে বাংলা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেনসে রকম ছাপানো ছবি আমি বহু লোকের ঘরে দেখেছিএঁদের পন্থা অনুসরণ করেই রবি বৰ্মা তাঁ সব ছবি আঁকেন এবং কতকটা প্রসিদ্ধিও লাভ করেছিলেন

চিত্রকর সব আজকাল প্রাদুর্ভূত হয়েছেন এবং তাঁদের নব-নব উন্মেষশালী বিচিত্র চিত্তবৃত্তি নিরোধ করবার শক্তি তাঁদের করায়ত্ত নয়

যদিচ আমরা যাদবানন্দ কীর্তনিয়ার বংশধর, আমাদের গ্রামের নাম হরিপুর, আর আমাদের কুলদেবতা শ্যামরায়, তথাপি আমাদের পরিবার বৈষ্ণবও নয়, কীর্তনবিলাসীও নয়শুধু কীর্তন কেন, কোনরূপ সঙ্গীতের চর্চা চৌধুরীকুলে কস্মিনকালেও ছিল না

বাবা ছিলেন বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন

সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী