কৃষ্ণনগর ৪র্থ-অংশ
আমি পূর্বে বলেছি যে, যশোরে মুখুজ্যেমহাশয়
নামক জনৈক অজ্ঞাতকুলশীল ভদ্রলোক আমাদের বাড়িতে থাকতেন ও সেতার বাজাতেন। তিনি কারও সেতারের
মাস্টার ছিলেন না। উক্ত ভদ্রলোকের চেহারা আমার আজও মনে আছে। তাঁর দাড়ি ছিল পাকা ও লম্বা, আর তাঁর দেহ ছিল কৃশ— না-লম্বা, না-বেঁটে।
আমি কৃষ্ণনগরে এসে মায়ের কাছে মুখুজ্যেমহাশয়ের
দু-চারটি সেতারের বোল শুনেছি। আমার মাতুল পরিবারে সঙ্গীতের চর্চা ছিল, তাই আমার মায়ের গানের
গলাও ছিল— কানও ছিল। তাঁর কাছ থেকেই আমি সঙ্গীতপ্রিয়তা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছি। আমি যে মধ্যে-মধ্যে
সঙ্গীত সম্বন্ধে বাচালতা করি, তার কারণও সঙ্গীতের প্রতি আমার আবাল্য অনুরাগ।
ছেলেবেলায় আমার এই সেতারের বোল এত ভালো লাগত
যে, আজও তা মনে আছে। একটি হচ্ছে এই :
শান্তিপুরের খালের ভিতর জাহাজ ডুবছে
বজরা ভেসে উঠেছে,
সাহেব বলে, তোবা তোবা,
বিবি বলে জান গেল!
আর একটা পাখি বলে
চোখ গেল।
দ্বিতীয়টির প্রথম ছত্ৰ মনে আছে :
বৌ কথা কও পাখি ছিল ডালেতে বসে
তাদের মারলি কী দোষে !
সেতারের বোল শুধু দাদেরে দেরে নয়— গানও হয়।
আমি পরে একটি বেহাগের হিন্দি গান শুনি, সেটি অবিকল সেতারের
গৎ থেকে গানে রূপান্তর করা হয়েছে।
পূর্বেই বলেছি যে, আমাদের পরিবারে কেউ
গাইয়ে-বাজিয়ে ছিলেন না। অল্পস্বল্প যা গান গাইতে পারতেন আমার মা। তিনি অন্যের মুখে শুনে
দু-চারটি গান শিখেছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অতি মৃদু অথচ মালায়েম। তাঁর একটি গানের কথা
আজও মনে আছে :
অয়ি সুখময়ী ঊষে
কে তোমারে নিরমিল (ললিত)
আর সেকালে ব্রহ্মসঙ্গীতের প্রথম যুগে প্রকাশিত
দু-চারটি গান শুনেছি,
কার মুখে তা মনে নেই, তার কতকগুলি যেন আজও
মনে আছে।
১ । গাও হে তাঁহার নাম। (খাম্বাজ)
২। দেখিলে তোমার সেই অতুল প্রেম আননে। (বাহার)
৩। দিবা অবসান হল। (পূরবী) এই শেষ গানটি শুনে আমার মন মুষড়ে গিয়েছিল— শুধু ওর ভাষার
জন্য নয়, সুরের জন্যও। পূরবী শুনলে আজও আমার মন দমে যায়। তার পর একটি যুবকের মুখে পিলু-রাগিণীর একটি গান শুনে আমার কানে
অতি চমৎকার লাগল। তারপর পিলুর অনেক গান আরও দু-চার জনের মুখে শুনি।
তারপর দ্বিজেন্দ্রলালের পিতা কার্তিক দেওয়ানের
মুখে অনেক গান শুনেছি। তিনি ছিলেন অতি সুকণ্ঠ ও সঙ্গীতবিদ্যায় সুশিক্ষিত। তিনি বোধ হয় বাংলা, হিন্দি দু-ভাষারই গান
গাইতেন, কিন্তু কী যে গাইতেন আমার
মনে নেই।
দ্বিজেন্দ্রলালও গাইয়ে বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি সভা-সমিতিতে গান
গাইতেন ছোকরা বয়সেই। বোধ হয় কণ্ঠসঙ্গীত তাঁর পিতার কাছেই শিক্ষা করেছিলেন। আরও দু-চারজনের মুখে অতি মিষ্টি গান শুনেছি, তাঁদের নামও মনে আছে।
এ সব গানই গাওয়া হত ওস্তাদি ঢঙে, ওস্তাদদের তাল-কর্তব
বাদ দিয়ে। সেকালের বাংলা গানকে হিন্দি গানের অপভ্রংশ বলা যেতে পারে। একেবারে তান বাদ দিয়ে ঝিঁঝিট-খাম্বাজ গাওয়া
যায় না, তাই ও-জাতীয় গান গাইতে হলে গলাকে একটু খেলাতে হয়, যা বেহাগ-বাগেশ্রীতে
করতে হয় না। ফলে বাল্যকালে আমার কান তৈরি হয়েছিল বাংলায় যাকে বলে ওস্তাদি ঢঙের গানে। আজ পর্যন্ত আমার কানের
সে অভ্যাস যায়নি। আমার কান সহজেই মাৰ্গসঙ্গীতের অনুকূল।
কৃষ্ণনগর নবদ্বীপের গা-ঘেঁষা শহর হলেও, এ শহরে কীর্তনের রেওয়াজ
ছিল না। বোষ্টম-বৈরাগী সর্বত্রই আছে, কৃষ্ণনগরেও ছিল। এই ভিক্ষাজীবী বৈরাগীদের মুখে দু-চারটি কীর্তন শুনেছি। তার দু-একটি গানের
সুর আজও মনে আছে। যথা : ‘নদীয়ার বৈরাগীর রাজা শ্রীচৈতন্য গৌরহরি’, আর ‘হরিনাম বিনে কি বল আছে সংসারে, বল রে মাধাই মধুর স্বরে’ ইত্যাদি-ইত্যাদি। একটা নেড়ানেড়ির গজল
পুরো মনে আছে, সেটা হচ্ছে এই :
যদি গৌর চাস
কাঁথা নে ধনী।
সকালবেলা ভিক্ষেয় যাবি
ঘরে এসে তেল মাখাবি,
আর পেতে দিবি বিছানাখানি।
আর গাঁজার কলকেয় আগুন দিবি দিবসরজনী।
এ গান শুনে আমাদের খুব মজা লাগত, কিন্তু ভক্তি বেড়ে
যেত না। বলা বাহুল্য, এ জাতীয় কীর্তন আমাদের মনে কোন ছাপ রেখে যায়নি, আর কীর্তন শেখবার লোভ
আমাদের জন্মায়নি। আর নেড়ির এই গান ; এ পূজোতে ঝুমকে দিবি তবে ঘরে রইব’ ইত্যাদি উপরিউক্ত নেড়ার
গানের সনাতন উত্তর । পুরুষ চায় সেবাদাসী, স্ত্রী চায় অলঙ্কার।
গান গাইবার প্রবৃত্তি অনেকের আছে, কিন্তু শক্তি সকলের
নেই। আমার দাদাও গান গাইতে
চেষ্টা করতেন। তাঁর একটি গানের প্রথম ছত্র আজও মনে আছে : ‘ও-পাড়াতে দুধ জোগাতে যাই গো আমার বেলা হল।’ এরই নাম কি মাগসঙ্গীত ? আমাকে জনৈক মারহাট্টি ওস্তাদ বলেছিলেন যে, ‘বাত তো আচ্ছা লাগতি, গানেকা কেয়া জরুরত
হ্যায় ?’
দাদার গান সম্বন্ধে ঐ একই প্রশ্ন করা যায়। আমার মেজদাদা কখনও
এইরূপ বৃথা চেষ্টা করেননি। আমার সেজদাদা কুমুদনাথ ছবি আঁকতেন ভালো আর বাঁশি বাজাতেন মন্দ
নয়। কিন্তু শিকারে মত্ত
হয়ে বাঁশি ও পেনসিল দুই-ই ত্যাগ করেন।
আমি অল্প বয়েস থেকেই গান গাইতুম। আমার কণ্ঠস্বর ছিল
musical. এই কারণে, কানে যে-সুর আসত, গলায় তা বদলি হত। আমার গানের শিক্ষক ছিল বঙ্কু নামক স্কুলের ছেলে। তার গলা ছিল চমৎকার, যেমন শ্রুতিমধুর তেমনি
দরাজ। আর শিখি আমাদের গৃহশিক্ষকের
কাছে। মাস্টারমশায়ের কণ্ঠে
সুর ছিল কিন্তু স্বর ছিল না।
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।