:::: সূচীপত্র ::::
কৃষ্ণনগর ৫ম - অংশ

সেকালে কৃষ্ণনগরে খেলাধুলোও ছিলভাইদের মধ্যে আমি ছিলুম দুর্বল ও কৃশ, অথচ সুস্থঅতএব খেলায় আমার কোনরূপ কৃতিত্ব ছিল নাবিদেশি খেলার মধ্যে ক্রিকেটই সকলে খেলত, আর তার নাম ছিল ব্যাটবলসে ব্যাটবল খেলা ছিল একরকম ছেলেখেলাকেউ এ খেলায় খেলোয়াড় বলে ওতরায়নিঅবশ্য ম্যাচও খেলা হত, কিন্তু ম্যাচ খেলার উদ্দেশ্য ছিল উভয় পক্ষে মারামারি করাযে-দল হারত, তারা অপর দলকে আক্রমণ করতআর যারা অপরের মাথা ফাটাতে পারত, তারা প্রসিদ্ধ হত

চারপাশের গ্রাম থেকে কৃষ্ণনগরে অনেক ছোকরা পড়তে আসততাদের মধ্যে দেবগ্রামের ছেলেরা ছিল মারামারিতে ওস্তাদতারা ছিল শরীরে বলিষ্ঠ ও গোঁয়ারদেবগ্রামের আবহাওয়া বোধ হয় তখন খুব ভালো ছিল, এখন সে গ্রামে ম্যালেরিয়ার একটি প্রধান আড্ডা হয়েছেনবদ্বীপের ছেলেরাও ছিল সব জোয়ান, আর কৃষ্ণনগরের নেদের পাড়ার ছোকরারাও ছিল অনেকে বীরপুরুষতাদের মধ্যে কান্তি নামে একটি যুবক ছিলতার মতো সুন্দর লোক প্রায় দেখা যায় নাআর শরীরে বলবীৰ্যও ছিল অসাধারণ

শেষটা কলেজের আদেশে জিমনাস্টিকের চলন হয়আমি জিমনাস্টিক করতে পারতুম না, প্যারালেল বার-এ পিকক মার্চ করতে পারতুম না আমার বাহুর সে জোর ছিল না
কৃষ্ণনগরের নাবালক রাজার বদ্রি সুকুল নামে একটি সেতারশিক্ষক ছিলসরকার বাহাদুর রাজকুমারের সঙ্গীতশিক্ষা বন্ধ করে তাকে জিমনাস্টিক শিখতে আদেশ দিলেনওস্তাদজির চাকরি গেলওস্তাদজি প্রস্তাব করলেন যে, তাঁকেই জিমনাস্টিকের মাস্টার করা হোকতিনি এক মাসের মধ্যেই জিমনাস্টিক শিখে নেবেনতাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর হলতিনি ছিলেন পালোয়ানপ্যারালেল বারে তার তুল্য কেউ হতে পারতেন নাআমার দেহের এই সব অক্ষমতার পরিচয় পেয়ে আমি একটি বন্ধুর পরামর্শ অনুসারে ডন-মুগুর ও বৈঠক চর্চা করতে লাগলুমএই ডন-মুগুরের প্রসাদে আমার দেহ গড়ে উঠল, বুক হল চওড়া ও কোমর হল সরুতবে শরীরের শক্তি বাড়ল কি না বলতে পারিনে

আমি কৃষ্ণনগরের কথা এত বেশি করে বলছি তার কারণ, উক্ত শহরই আমার মুখে ভাষা দিয়েছে আর আমার মনের কাঠামো গড়েছেএ ছাড়া, আমি একটি মফস্বল শহরের চেহারার কথাও বলেছি

কৃষ্ণনগরে নবাবি আমলের সভ্যতার নিদর্শন, আর আমাদের নব সভ্যতার স্পষ্ট গুণ rationalism-এর পরিচয় ছিলএখন বোধ হয় কৃষ্ণনগর অপর সব মফস্বল শহরের নকলে গড়ে উঠেছে, তার কোন বিশেষত্ব নেই

আমরা অবশ্য কৃষ্ণনগরে শিকড় গেড়ে বসিনিপ্রথম-প্রথম প্রায় প্রতি বৎসর পূজোর সময়ে হরিপুর যেতামহরিপুর গ্রামটি খুব ভালো লাগতআমাদের গ্রামের উত্তরে ছিল নদী ও দক্ষিণে একটি প্রকাণ্ড বিল তিন-চার মাইল লম্বা আর মাইলখানেক চওড়া, আর অসংখ্য পুকুরঅবশ্য বেত ও বাঁশের বনও ছিল কেননা তখন চৌধুরী বংশের অনেকের বাড়ি-ঘর-দোর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল

এ গ্রাম চাষার গ্রাম নয়, জমিদারের গ্রামগাঁয়ে কোন চাষার বসতি ছিল নাসমগ্র গ্রামটিতে ছিল শুধু চৌধুরীদের ও তাঁদের দৌহিত্রদের বসতিসকলেই ছিলেন বাবু'দের দল যাদের অন্যেরা মান্য করতচৌধুরীরা খুব বড় জমিদার না-হলেও মাঝারি গোছের জমিদার এবং বহু কাল থেকে জমিদার ছিলেন

আমাদের পরিবারের পুরুষেরা ছিলেন সুপুরুষ, আর আমার খুড়ি জেঠিরা সব ছিলেন গৌরবর্ণআর প্রায় সকলই ছিলেন চালাকচতুরতাঁদের ছিল হাসিমুখ ও কথায়-বার্তায় এঁরা হাসির চর্চা করতেন

পরস্পরের ভিতর জমিজমা নিয়ে শরিকি বিবাদ ছিলকিন্তু বাহ্য ব্যবহারে তা প্রকাশ পেত না, বিশেষত পূজার সময়েআর বড়রা যথেষ্ট মদ্য পান করতেন, কিন্তু যুবকেরা নয়

তখন গ্রামের স্বাস্থ্য ভালো ছিল, আর প্রায় সকলেরই অন্নবস্ত্রের সংস্থান ছিলপ্রতি বাড়িতে দুর্গাপূজা হত, হয় মোষ, নয় পাঁঠাবলি হত নবমীর দিন ছেলে-বুড়ো মিলে পঙ্কোৎসব করত

আমার মনে ও চরিত্রে শহরের ও পাড়াগাঁয়ের প্রভাব কতটা আছে বলতে পারিনে, তবে দুইয়েরই কতকটা আছেতার ফলে আমার মনে পরস্পরবিরোধী সংস্কার থাকা সম্ভবতবে একটি বিষয়ে এ দু-জায়গায়ই মিল ছিলআমাদের পরিবার ছিল, গোঁড়া হিন্দু; তার অর্থ এই য়ে, হরিপুরের চৌধুরীরা সমাজের প্রচলিত প্রথা মেনে চলতেন, কিন্তু তাঁদের প্রকৃতিতে ভক্তির লেশ মাত্র ছিল নাবিধিনিষেধ মানাই তাঁদের ছিল ধর্মইংরেজি শিক্ষার প্রভাব তাঁদের চরিত্রে একরকম ছিল না বললেই সত্য কথা বলা হয়কেননা, তারা ইংরেজি-শিক্ষিত ছিলেন নাকাশী ছিল তাঁদের প্রিয় শহর

বৃদ্ধরা কাশী যেতেন দেহত্যাগ করতে, আর আমি আমার একটি জেঠতুতো ভাইকে দেখেছি যিনি কিছুদিন কাশীতে গিয়েছিলেন শিক্ষালাভ করতেকীসের শিক্ষা জানিনে কিন্তু শিখে এলেন শুধু তলোয়ার খেলা আর তীর-ছোঁড়াআর হাতের গোড়ায় নাটোর তাঁদের ছিল একরকম শহর

আমি ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগরেই বাস করতুম সাড়ে-এগারো মাস ও হরিপুরে পনেরো দিনকিন্তু হরিপুর আমরা সঙ্গেই এনেছিলুম, তার মানসিক আবহাওয়াও !

তা ছাড়া, আমরা নদীয়া জেলাতেও এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়িয়েছিআমার বয়েস যখন আট বৎসর, তখন বাবা দ্বারভাঙায় বদলি হলেন ও আমরা সপরিবারে সেখানে যাত্রা করলুমকৃষ্ণনগর থেকে নৌকোয় মগরায় গেলুম, আর সেখানে গিয়ে রেলে চড়লুমরাত্তিরটা ট্রেনে ঘুমিয়েছিলুম, সকালবেলায় মধুপুর পৌঁছলুমপাহাড় সেই প্রথম দেখলুম, যদিচ অতি ছোট-ছোটক্রমে গরম বাড়তে লাগলতখন বৈশাখ মাসজসিদি স্টেশনে পৌছে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে পড়লুমকী ভীষণ গরম! আমি সেই থেকে গরম দেশকে বেজায় ভয় করি; সে ভয় আমার আজও আছেএই গ্রীষ্মকাতরতাই আমার কর্মজীবনের ব্যর্থতার জন্য দায়ী

সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা