কৃষ্ণনগর ৬ষ্ঠ - অংশ
বাংলার তুলনায় বেহার আমার এতটা অপ্রীতিকর
লাগে যে, তার একটু বর্ণনা করা আবশ্যক।
আমরা বাড়িতে তেতে-পুড়ে বেলা চারটের সময় বাড়
স্টেশনে পৌঁছলুম, অর্থাৎ বিহারে পদার্পণ করলুম। সেকালে বাড় থেকে স্টিমারে গঙ্গা পার হয়ে
জনকরাজার দেশে যেতে হত।
বাড়ে গিয়ে শুনি, স্টিমার বাড় ছেড়ে
গিয়েছে। অগত্যা আমাদের রাস্তার ধারে একটি মুদির দোকানে আশ্রয় নিতে হল। এক দিন এক রাত সেই
খাপরার ঘরে থাকবার কথা, সেখানে বোধ হয় ঘণ্টাখানেক ছিলুম। সেই সময়টুকুর মধ্যে ক্রমান্বয়ে 'রাম নাম সৎ হায়' এই ধ্বনি শুনলুম।
ইতিমধ্যে একটি বাঙালি ভদ্রলোক ঘোড়ায় চড়ে
সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, আপনাদের এখানে থাকা হবে না— কেননা কলেরার মড়ক
লেগেছে। আপনারা আমার বাড়িতে চলুন। আমার বাসায় নিচের তলায় একটি প্রকাণ্ড ঘর আছে, সেই ঘরে আপনাদের সপরিবারে
থাকতে ও খেতে দেব শুধু আলোচলের ভাত ও পাঁঠার মাংস, আর কিছুই নয়।
আমাদের দলবল বড় কম ছিল না। বাবা, মা, মাসিমা, আমরা দুটি ভাই, তিনটি বোন; আমাদের গৃহশিক্ষক দুটি
কি তিনটি, আত্মীয় জন-তিনেক, চাকর আর একটি বাঙালি পাচক ব্রাহ্মণ, দেখতে অতি সুন্দর আর
অতি বলিষ্ঠ। আমরা সদলবলে উক্ত বাঙালি ভদ্রলোকের বাড়ি অতিথি হলুম ও তাঁর দত্ত ভাত আর পাঁঠার
ঝোল খেয়ে মাটিতে বিছানা পেতে সে রাত্রি কাটালুম। সমস্ত দিন উপবাসের পর ও-খাবার আমাদের মুখে
খুব ভালো লাগল। মা ও মাসিমা কী খেলেন জানিনে। কেননা, মা জীবনে কখনও মাংস ভক্ষণ করেননি, আর মাসিমা ছিলেন বিধবা। বোধ হয় সেদিন ছিল
একাদশী।
তার পরদিন বেলা নটা-দশটায় গঙ্গায় স্নান
করলুম। বাইরে আগুন জ্বলছে, আর গঙ্গার জল যেন বরফজল। আমরা উক্ত ভদ্রলোকের
বাড়ি দুপুরে আলোচলের ভাত ও পাঁঠার ঝোল খেয়ে বোধ হয় বেলা তিনটে চারটের সময় স্টিমারে
চড়ে গঙ্গা পার হলুম। উক্ত ভদ্রলোক ছিলেন শান্তিপুরের লোক, আর তাঁর উপাধি বোধ হয় প্রামাণিক। এই সহৃদয় লোকটি আমাদের
অতিশয় যত্ম করেছিলেন। তাঁর ভদ্রতার স্মৃতি আমার মনে আজও জ্বলজ্বল করছে।
গঙ্গা পার হয়ে - আমরা আবার রেলে চড়লুম ও
সন্ধ্যায় দ্বারভাঙায় নামলুম। পথিমধ্যে দেখলুম শুধু রোদে-পোড়া খাপরার চাল। এমন শুষ্ক ও নীরস দেশ
ইতিপূর্বে কখনও দেখিনি। বাংলা দেশ সবুজ আর বিহার পাটকিলে। মনে আছে, মাঝে-মাঝে আমবাগান দেখেছি।
দ্বারভাঙায়ও সমান গরম। যে-বাসায় গিয়ে উঠলুম, সেটি গণ্ডকের খুব কাছে। গণ্ডকের জলও ঠাণ্ডা, তাতে স্নান করে সুখ
হত। দিনটি গরমে ছটফট করে, সন্ধ্যেয় বেড়াতে
বেরতুম। আমার পিসতুতো ভাই গান গাইতে শুরু করলেন। মা সে গান শুনে ভয় পেয়ে বাবাকে বললেন যে, প্যারীমোহন পশ্চিমে
এসে হঠাৎ গাইয়ে হয়েছে! বাবা বললেন, ভয় নেই, প্যারীমোহন মহুয়া খেয়ে গান গাচ্ছে। আর গরম সহ্য করবার জন্য মহুয়া খাচ্ছে। তিনি তখন 1st year-এ পড়তেন আর
মধ্যে-মধ্যে মদ্য পান করা তাঁর অভ্যাস ছিল। আমরা মহুয়া পান করতুম না। সুতরাং দিনটে গরমে ভাজা হতুম। বাবার ইচ্ছে ছিল যাঁরা
কলেজে পড়তেন তাঁদের পাটনায় পাঠিয়ে দিবেন আর যারা স্কুলে পড়ছে তাদের দ্বারভাঙার
ইস্কুলে ভর্তি করবেন। কিন্তু তিনি হঠাৎ খবর পেলেন যে পাটনায় ভয়ঙ্কর কলেরা হচ্ছে। তাই তিনি দাদা, মেজদাদা, সেজদাদা ও আমাকে কৃষ্ণনগর
ফিরে যেতে আদেশ করলেন। এক হস্তার মধ্যেই আমরা চার ভাই, মাসিমা, আমাদের গৃহশিক্ষক ও আত্মীয়দের সঙ্গে চাকর-বামুন নিয়ে কৃষ্ণনগরে
ফিরে এলুম। আমরা গোয়াড়িতে নতুন বাসায় উঠলুম ও যে যে-ক্লাসে পড়তুম সে সে-ই ক্লাসেই রয়ে
গেলুম। কৃষ্ণনগর এসে হাঁফ
ছেড়ে বাঁচলুম। আর বেহার থেকে নিয়ে এলুম তার গ্রীষ্মের স্মৃতি। বাবা আমাদের বাংলা দেশে পাঠিয়ে ভালোই করেছিলেন, কারণ যারা দ্বারভাঙায়
রয়ে গেল, তাদের মধ্যে দু-জন আমার সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা ও সর্বকনিষ্ঠা ভগ্নী, উভয়েই কলেরায় আক্রান্ত
হন। বোনটি সেখানে মারা
গেল। আর ভাইটি ফিরে এলেন
শুধু হাড় ও চামড়া নিয়ে। আমরা সাড়ে-তিন বৎসর গোয়াড়িতে বাসা ভাড়া করেছিলুম। তারপর দ্বারভাঙার দুর্ঘটনার
দরুন বাবা কৃষ্ণনগরে সাহেবপাড়ায় একটি বাড়ি কিনে আমাদের সকলকে সেখানে রেখে গেলেন
।
কৃষ্ণনগর সেকালে খুব স্বাস্থ্যকর জায়গা ছিল। আমরা নিজেদের যে-বাড়িতে
উঠে গেলুম পরে পাঁচ বৎসর সেই বাড়িতেই রইলুম ও সপরিবারে ভালোই ছিলুম। হঠাৎ ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে
কৃষ্ণনগরে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ হল। দাদা ও মেজদাদা কলকাতার কলেজে পড়তে গিয়েছিলেন। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে
সে ম্যালেরিয়া ভীষণ রূপ ধারণ করল। নিম্নশ্রেণীর লোকেরা প্রতিদিন বিশ-ত্রিশ জন করে মারা যেতে লাগল। আমাদের বাড়িতে আমি
ও আমার মা ছাড়া আর সকলে জ্বরে পড়লেন। জ্বর হলেই টেম্পারেচার ১০৫ ডিগ্রির নিচে হত না আর পনেরো দিনের
কম ছড়ত না। দাদা তখন বিলেতে ও মেজদাদা কলকাতায়। আমি তখন এনট্রান্স ক্লাসে পড়ছি ও দিব্যি সুস্থ ছিলুম। কৃষ্ণনগরের ম্যালেরিয়া
আমাকে স্পর্শ করেনি। এই সময়ে একটি রবিবারে আমি গোয়াড়ি যাই একখানি খাতা কিনতে, অবশ্য পায়ে হেঁটে। প্রায় বেলা বারোটায়
বাড়ি ফিরি। পথিমধ্যে ভয়ঙ্কর মাথা ধরে, ফলে বাড়ি এসেই শুয়ে পড়ি।
তারপর চোখ খুলে দেখি আমার মেজদাদা যোগেশ চৌধুরী
পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলুম, তুমি এখানে এলে কবে? তিনি বললেন, শুধু আমি নই, দিদি আর মন্মথও এসেছেন
আরা থেকে। আমি প্রশ্ন করলুম, কেন? মেজদাদা বললেন, তুমি আট দিন অজ্ঞান ছিলে, । আজই শুধু তোমার জ্ঞান ফিরে এসেছে। তোমার অজ্ঞান অবস্থায় যে যেখানে ছিল সকলকে টেলিগ্রাম করে আনানো
হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলুম, আমি তো তবে ভালো হয়ে উঠেছি ? তিনি বললেন, না। তোমার জুর ছেড়েছে!
কিন্তু দুপাশের কর্ণমূল বেজায় ফুলে উঠেছে। ডাক্তারবাবু বলেছেন, জলের হাওয়ায় সেরে যেতে পারে, তাই তোমাকে নৌকোয়
নিয়ে যেতে হবে! আমি যখন জেগে উঠি তখন বিকেল পাঁচটা, আর সন্ধ্যে ছ-টায় আমাকে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে
নৌকোয় চড়ানো হল। সকালবেলা কালনায় পৌঁছতে আমার দুই কৰ্ণমূলের দুখানি পাউরুটি— প্রায় অদৃশ্য
হল। তার পরদিন বলাগড় পৌঁছে
দেখি কান-দুটি স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছে।
সন্ধ্যেয় গিয়ে আমরা সপরিবারে ট্রেনে চড়লুম
আরা যাবার জন্য, আর তার পরদিন বেলা এগারোটা আন্দাজ ট্রেন থেকে নামলুম।
এ সব কথা বলছি কী কারণে, পরে বলব। আমার এত বড় রোগ হয়েছিল, আর গিয়ে দেখি তার
কোন রেশ নেই। কিন্তু দিন পাঁচ-ছয় পরে একদিন আহারান্তে দুপুরবেলায় একখানি ইংরেজি কাগজ পড়তে
গিয়ে আবিষ্কার করলুম যে ইংরেজি অক্ষর পর্যন্ত ভুলে গিয়েছি। ভয়ে আমার ঘাম হতে লাগল। বাবা পাশের একখানি
খাটে শুয়েছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রমথবাবু, তুমি ঘামছ কেন?'
আমি বললুম, 'কৃষ্ণনগরের জ্বর বোধ হয় আজ পুরো ছাড়ছে।' এ কথা শুনে বাবা বললেন, ‘বটে! দিব্যি খাচ্ছ-দাচ্ছ, হেসে খেলে বেড়াচ্ছ, আর জ্বর তোমার আজ ছাড়ল
?’ আমি বললুম, 'এ জ্বর বর্ণচোরা জ্বর'। এ কথা শুনে বাবা হেসে
বললেন, 'ছেলে আমার তুখোড় বটে!' আমি আর কিছু বললুম না। কিন্তু মন স্থির করলুম যে, আর সাত দিন কোন ইংরেজি
বই ছোঁব না। আর 'উদভ্ৰান্ত প্রেম' পড়তে লাগলুম। সাত দিন পরে Golden
Treasury-র Songs and Lyrics পড়ে দেখি যে ইংরেজির জ্ঞান আবার বেবাক ফিরে
এসেছে।
আমার যে কী ব্যারাম হয়েছিল তা আমি জানিনে। কেননা, তারপর চার বৎসরের মধ্যে
আমার একদিনও জ্বর হয়নি। Sunstroke হতে পারে কিন্তু
তার ফলে কর্ণমূল ফুলবে কেন? আর তার ফলে ইংরেজি ভাষার
স্মৃতি লোপ হবে কেন ও আট দিন অচৈতন্য থাকব
কেন ?
আমার ইন্দ্ৰিয় সব সজাগ ছিল, কেবল মনের একাংশ সাময়িক
ভাবে লুপ্ত না-হোক, সুপ্ত হয়েছিল।
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে
এমন করা।