কৃষ্ণনগর ৭ম - অংশ
কী কুক্ষণেই আত্মকথা লিখতে বসেছি। প্রথম থেকেই লেখায় পদে-পদে বাধা পড়ছে।
প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ভীষণ রোগে আক্রান্ত হলেন, যে-রোগে শেষটা তাঁর
মৃত্যু হয়। এ কথা আমি পূর্বে বলেছি।
তারপর উপর্যুপরি নানা পারিবারিক দুর্ঘটনা ঘটতে আরম্ভ হল। ফলে বিপর্যস্ত মন নিয়ে
মধ্যে-মধ্যে কলম চালিয়েছি।
কতকটা এগিয়েছি,
এমন সময়ে বর্তমান যুদ্ধ আমাদের গা ঘেঁষে এল। আমি কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে
চলে এলুম। বলা বাহুল্য, মরুভূমির ভিতর ওয়েসিস আমরা ইচ্ছে করলেই গড়ে তুলতে পারিনে। বাইরে শান্তি থাকলেও
মনে শান্তি থাকে না। এখানে সঙ্গীতের ও কলাবিদ্যার চর্চা করা হচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধের অবসানে সঙ্গীত ও শিল্পকলার
কোন সার্থকতা থাকবে কি না জানিনে। জার্মানি সঙ্গীতশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও জাপান চিত্রবিদ্যায় পারদর্শী। অথচ এ দুই জাতই এ দুই
বিদ্যার ধ্বংসসাধন করতে বদ্ধপরিকর হয়েছে। দেশ যখন ওলট-পালট হতে বসেছে, তখন আত্মকথার কোন সার্থকতা নেই। আমি লিখতে পারি, কিন্তু পড়বে কে— সাহিত্য হচ্ছে
অর্ধেক সঙ্গীত, অর্ধেক চিত্রকলা— এই কথাটা মনে রাখবেন। আর-এক মুশকিল। গত সংখ্যায় ‘রূপ ও রীতি'তে আত্মকথা পড়ে চক্ষুস্থির হয়ে গেল। ছাপার অক্ষরে এত ভুল পূর্বে কখনও দেখিনি। ‘রূপ ও রীতি'র পরিচালক আমাকে লিখেছেন যে— প্রথমত কাগজ পাওয়া
যায় না, তারপর লোকও পাওয়া যায় না। আজ যে কাজ করে, কাল সে অদৃশ্য হয়। এ অবস্থায় ছাপার অক্ষরের পক্ষে হাতের লেখার অনুসরণ করা অসম্ভব। যুদ্ধের আঁচ লেগেই
যখন ছাপাখানার এ রূপ অবস্থা, তখন যুদ্ধের আগুন জ্বললে তার অবস্থা কী হবে, তা সহজেই অনুমান করা
যায়। কাগজ সহজেই পোড়ে।
আমাদের দেশ পরাধীন দেশ, আর পরাধীনতায় আমরা কেউই সন্ত্তষ্ট নই । ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থায়
স্বাধীন হতে চাই। অপর পক্ষে আমরা অধীনতায় অভ্যস্ত হয়েছি। আর এমনি অভ্যস্ত হয়েছি যে আমাদের কাজকর্ম, কথাবার্তার ভিত্তি
হচ্ছে আমাদের অধীনতা। মানুষ সব অবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়, আমরাও নিয়েছি। এই অধীনতার ধাত বদলাতে আমরা ভয় পাই, বিশেষত যখন নুতন অধীনতা
ধ্বংসমূলক। ভাবনা এখন ভবিষ্যতের জন্য, অতীতের জন্য নয়। আর আমার আত্মকথা অতীতের কথা। অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে দোলাচল চিত্তবৃত্তি
নিয়ে আত্মকথা লেখা একরকম অসম্ভব। জীবনের খেই হারিয়ে যায়।
তা হলেও আমি তেরো বৎসর বয়সে আবার পদার্পণ করি।
বেহার আমার পূর্বপরিচিত। আমি যখন সিক্সথ ক্লাসে পড়ি, তখন আমি গ্রীষ্মকালে
দ্বারভাঙায় যাই। তখন বেহার ছিল একটা বিভীষিকা, সে কথা পূর্বে বলেছি। তারপর যখন ফোর্থ ক্লাসে পড়ি, তখন শীতকালে মজঃফরপুরে যাই। এ শহরটি আমাকে মুগ্ধ
করে। যদিও সন্ধ্যেবেলায়
ঘরে আঙ্গুটি জ্বালাতে হত। আমাদের কাছে ওটি ছিল একটি বাঙালি শহর। আমি শহরের যে-অংশ দেখি, সেটি ছিল অতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তার উপর সেখানে ঘোড়দৌড়
হত। দ্বারভাঙার মহারাজার
বাড়িতে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড আয়না ঝোলানো থাকত; আর শহরের আশেপাশে দেদার আম-লিচুর গাছ ছিল। সেখানে দু-একটি ছোকরার
সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। তার ভিতর কানাই নামে একটি ছোকরার কথা আজও মনে আছে। ছোকরাটি ছিল দেখতে
ভালো ও বেজায় স্ফূর্তিওয়ালা। শুনেছি, কানাই পরে মোক্তার হয়েছিল ও বড় মোক্তার হয়েছিল। কিন্তু অল্পবয়সে মদ
খেয়ে মারা যায়। আমার মতে, বেহার গ্রীষ্মকালে নরক আর শীতকালে স্বর্গ।
তারপর যখন সেকেন্ড ক্লাসে পড়ি, তখন শীতকালে ভাগলপুর
যাই। ভাগলপুরও তখন ছিল একরকম
বাঙালি শহর।
ভাগলপুরের বড়-বড় উকিলরা ছিলেন সব বাঙালি, যথা সূর্যনারায়ণ সিং, শিবচন্দ্র, অতুল মল্লিক প্রভৃতি। ভাগলপুরে সে সময়ে
উকিলবাবুরা বেজায় মদ্যপান করতেন, একমাত্র সূর্যনারায়ণ সিং ছাড়া। ভদ্রলোক একটি চমৎকার বাড়িতে বাস করতেন; শুনেছি সেটি পূর্বে
গবর্নরের বাড়ি ছিল।
ভাগলপুর তেমন সুদৃশ্য শহর ছিল না। তার পশ্চিমে ছোট একটি পাহাড়ের উপর Cleveland House নামে একটি প্রকাণ্ড বাড়ি ছিল। নিচে গঙ্গা, উপরে পাহাড়— জায়গাটা ছিল মনোরম। এখন সে বাড়ির মালিক পাথুরেঘাটার কালীকৃষ্ণ ঠাকুরবংশ। এইখানেই অতুল মল্লিকের
পুত্র বসন্ত মল্লিকের সঙ্গে পরিচিত হই;
পরে তিনি I C S পাস করে পাটনার জজ হন। মল্লিকমহাশয়ের অন্যান্য পুত্রদের সঙ্গেও
কলকাতায় আমি বিশেষ পরিচিত হই। তাঁদের সঙ্গে আমি একসময়ে বিলেতে ছিলুম।
আরা ছোট শহর, মজঃফরপুর ও ভাগলপুরের মতো বড় নয়। কিন্তু অতি স্বাস্থ্যকর জায়গা। আমি প্রায় চার মাস
সে শহরে বাস করি, কিন্তু আমাদের পরিবারে কারও একদিনের জন্যও অসুখ করেনি। আর আমরা সকলেই অতি
মোটা তাজা হয়ে সেখান থেকে ফিরে এসেছিলুম। সেখানে আমরা ডিসেম্বর মাসেও ঠাণ্ডা জলে স্নান করতুম, কিন্তু একদিনের জন্যও
সর্দিকাশিতে ভুগিনি। আরা হিন্দুস্থানি কায়স্থপ্রধান জায়গা। লালারাই সে শহরের প্রধান সম্প্রদায় ছিল। তাদের পয়সা ছিল, তার প্রমাণ পেতুম তাদের
অসম্ভব রকম স্ফীত উদরে। এত পেটমোটা লোক আমি ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি। এত বিশাল উদর নিয়ে এরা যে কী করে কাজকর্ম
করে বুঝতে পারতুম না। ডাল-রুটি খেয়ে-খেয়ে মানুষ যে ভাঁটার মতো গোলাকার হতে পারে, এ জ্ঞান আমার ছিল না। আরা সেকালে বাঙালিপ্রধান
শহর ছিল না। সেখানে দুটি মাত্র বাঙালি ভদ্রলোক দেখি— কৈলাসবাবু নামক একটি
উকিল ও আমার বন্ধু সোমনাথ মৈত্রের ঠাকুরদাদা চন্দ্রনাথ মৈত্র। তিনি ছিলেন আরা স্কুলের হেডমাস্টার। কৈলাসবাবুর পুত্র ব্যারিস্টার
নলিনী বাঁড়ুজ্যের সঙ্গে আমার বিলেতে পরিচয় হয়। সে ছিল অসাধারণ বলিষ্ঠ ও সহৃদয় লোক।
আরায় সন্ন্যাসীদের একটি সদাব্রত ছিল। অসংখ্য সন্ন্যাসী সেখানে দু-এক দিন থেকে স্থানান্তরে
চলে যেত। আমাদের বাসা ছিল লহরের (canal) পাশে। সাধুবাবাজিরা লহরে স্নান করতে আসত ও তাদের শিঙ্গারপটার করতে
ঘণ্টাখানেক লাগত। স্নান করে উঠে তারা এক ঘণ্টা ধরে ছাই মাখত ও কেশবিন্যাস করত। চুল মাথার উপর চুড়ো
করে বাঁধত। ফলে তাদের আর শীত লাগত না।
আরায় একটি বাড়ি ছিল যেখানে সিপাহি বিদ্রোহের সময়ে ইংরেজরা
আশ্রয় নিয়েছিল ও নিজেদের রক্ষা করেছিল। আমরা যখন আরায় যাই, তখনও সে বাড়ির দেওয়ালে গুলির দাগ ছিল। সিপাহি বিদ্রোহের বছর
পঁচিশ বাদে আমরা আরায় যাই ও সে বিদ্রোহে যারা যোগ দিয়েছিল তাদের মধ্যে কোন-কোন লোকের
সঙ্গে আমাদের দেখা হয়; ব্রাহ্মণ, ছত্ৰী, আহীর, ছুতোর, কামার প্রভৃতি। লালারা অবশ্য এ যুদ্ধে যোগ দেয়নি। আরার আহীররা ছিল সকলেই দীর্ঘাকৃতি ও বলিষ্ঠ। ছত্রীরাও তাই। এদের মুখে মিউটিনির
গল্প শুনতে আমাদের খুব ভালো লাগত। কুমার সিংহ এদের সকলেরই ছিল আদর্শ হিরো।
সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা।