:::: সূচীপত্র ::::
কোলকাতা ১ম-অংশ

আরা থেকে আমরা আর কৃষ্ণনগরে ফিরলুম না, এলুম কলকাতায় বসবাস করতে অর্থাৎ পড়তে; যেমন আমরা কৃষ্ণনগরে বসবাস করতাম সেখানে পড়তেছেলেরা যাতে M. A, B A পাস হয়, বাবার সেদিকে খুব ঝোঁক ছিল

কলকাতায় যখন ফিরলুম, তখন আমার বয়েস সাড়ে-তেরো বৎসরতখন আমি নতুন মানুষদেহ হয়েছে সুস্থ, সবল ও সুঠাম; আর মনের মোড় ফিরে গিয়েছেআমি অঙ্ক কষতুম ভালো, ক্লাসের পরীক্ষায় একশ মার্কের ভিতর অন্তত নব্বই পেতুমযখন থার্ড ক্লাসে পড়ি, তখন আমি Wood’s Algebra-র সব equation সহজেই কষতে পারতুম যা আমার গৃহশিক্ষক মোটেই পারতেন নাঅঙ্ক কষারও একটা instinct আছে, সকলের থাকে না

কিন্তু আরা থেকে যখন ফিরে এলুম, তখন অঙ্কের প্রতি আমার কোন অনুরাগ ছিল নাতখন সাহিত্য আমার প্রিয় হয়েছিলBulwer Lytton-এর নভেল, George Eliot-এর Adam Bede আর Golden Treasury-Songs and Lyrics আমি উলটেপালটে পড়তুমকেননা, আরায় এই জাতীয় বই সব আমাদের বাড়িতে ছিলআজ যে আমি সাহিত্যিক, সে ঐ রোগ-আরোগ্যের গুণে

ইতিপূর্বে কলকাতা শহরের শুধু নামই শুনিনি, চোখেও দেখেছিলুমআমার বয়েস যখন নয়, তখন এক বেলার জন্যে কলকাতা এসেছিলুমএসে পৌঁছই দুপুরবেলা আর সন্ধের পরই ফিরে যাইকলকাতায় দেখলুম রাস্তা চওড়া, সন্ধ্যের পর রাস্তায় আলো আছেকিন্তু সেখানে টিকতে পারলুম না দুর্গন্ধের চোটেকৃষ্ণনগরের গায়ে বিকট গন্ধ ছিল না

তারপর দশ বৎসর বয়সে কলকাতায় আসি মজঃফরপুর যাবার পথেএবারও দেখি খাবারে গন্ধগন্ধ আসে কোত্থেকে? সেকালে উনুনে কাঁচা কয়লা পোড়ানো হততারপর বারো বৎসর বয়সে আবার কলকাতা এসে তিন-চার দিন থাকি, ইডেন হসপিটাল লেনেতখন এ গলিটিকে চাঁপাতলা লেন বলতসে বাড়িতে নদে জেলার অনেক যুবক ছিলেনতাঁরা ডাক্তারি পড়তেনফলে বাসাটি ছিল মড়ার হাড়ে ও খুলিতে ভর্তি

আমি যখন কলকাতায় পড়তে এলুম, তখন আমরা নিমু খানসামার গলিতে একটি বাসায় উঠলুমসে রাস্তা এখন ইডেন হসপিটাল-ভুক্ত হয়েছেকলকাতায় তখন বিশেষ গন্ধ পাইনিকিন্তু নিমু খানসামার গলিতে বেশি দিন থাকতে পারলুম না গলির দোষে নয়, বাড়ির দোষে

আমাদের কৃষ্ণনাগরিক বন্ধুরা এ বাড়ি আমাদের জন্য ভাড়া করেছিলেনমাসখানেক পরে বৈঠকখানা বাজার রোডে একটি বাড়িতে উঠে গেলুমবাড়িটি ছোট, কিন্তু বাসযোগ্যসে বাড়ির পূর্বে ছিল মুসলমান বস্তি, আর পশ্চিমে ছিল খ্রিস্টান ভদ্রলোকদের বাসাবছরখানেক সেখানে থাকিতারপর বছর-দুয়েক হুজুরিমলের গলিতে উঠে যাই

এবার কলকাতা আমাদের ভালো লেগেছিল; কারণ এ শহরে তখন ম্যালেরিয়া ছিল না, সংক্রামক রোগও ছিল নাতারপর গ্রীষ্মকালে কৃষ্ণনগরের মতো গরমও ছিল নাসন্ধ্যের সময়ে দিব্যি দক্ষিণে হাওয়া বইত যে-হাওয়া কৃষ্ণনগর পর্যন্ত যেত নাআমরা সন্ধ্যেবেলায় গোলদীঘির ধারে গিয়ে আরামে বসে থাকতুম

আমি কলকাতায় এসে হেয়ার স্কুলে ভর্তি হই এবং এনট্রান্স ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করিকলকাতার স্কুল-কলেজের কথা পরে বলবস্কুলের বেশি ছেলের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল নাযারা সন্ধ্যেবেলায় গোলদীঘিতে হাওয়া খেতে যেত, তাদের সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়তাদের দু-এক জনের নাম আমার আজও মনে আছেপূর্ণ আড্ডি বলে হুগলীর একটি ছেলে ছিলভালো ছেলেআর-একটি ছেলে আমার বিশেষ বন্ধু হয়ে ওঠে, তার নাম গোকুল চাটুয্যেসে লেখাপড়ায় ভালো ছিল না, কিন্তু জিমনাস্টিকে সকলের সেরা ছিলছোকরাটি ছিল অতি বলিষ্ঠ ও দিলদরাজথাকত কালী সিংহির গলিতেকী জন্য সে আমার বন্ধু হয়ে ওঠে, তা পরে বলবআরও জনকতক ধনীসন্তানের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলকিন্তু তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়নি

হেয়ার স্কুলে আমার সহপাঠীদের সঙ্গে হেমচন্দ্র খাস্তগীর এখনও বর্তমানস্কুলে তিনি আমাদের চোখে পড়েননি, কিন্তু পরে তিনি কৃতী হয়েছেননীলু দত্ত নামে একটি গন্ধবণিক ছোকরার সঙ্গেও আমার পরিচয় ছিলছোকরাটির ছিল মস্ত বড় চোখ, নানা রকম ঠারঠোর দেখাতে পারত

আমরা পদ্মাপারের বাঙাল এবং ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগরে থাকলেও আহার সম্বন্ধে দেশের আহারেই অভ্যস্ত ছিলুমআরায় হিন্দুস্থানি বাবুর্চির হাতে ডাল-রুটি ও মাংস ছিল খুব মুখরোচক ও পুষ্টিকর আহার

কলকাতায় এসে আমাদের কলকাতার আহার মনঃপূত হত নাঝাল আমাদের মুখে মিষ্টি লাগতসুতরাং ঝাল বেশি খেতুমমাস-দুই পরে আবিষ্কার করলুম যে আমাদের বুকজ্বালা করছেআমরা ভাইরা পরামর্শ করে আহারে ঝালের মাত্রা কমিয়ে দিলুম, বুকের জ্বালাও কমল

সে যা-ই হোক, আমাদের স্বাস্থ্য কলকাতায় ভালো ছিলআমরা যখন কলকাতায়, দাদা তখন বিলেতে, বাবা পশ্চিমে: সুতরাং আমরা ছেলেরাই হয়েছিলুম বাড়ির কর্তাতার ফলে সাংসারিক হিসেবে আমাদের চোখ-কান খুলে গেলআমরা ছোকরা বয়সেই গৃহস্বামী হয়ে উঠি

আমি আমার কলকাতা-বাস এবং এই শহরে অজিত অভিজ্ঞতার কথা বলবার জন্য লিখতে বসেছিকিন্তু আজকের দিনে কলকাতার ভগ্নদশায় সে বিষয়ে কিছু বলতে মন সরছে নাকৃষ্ণনগরে জনৈক ডাক্তারবাবুর মুখে শুনেছিলুম যে, সেকালে ইউরোপে প্লেগ বলে একটি ভীষণ মারাত্মক রোগ ছিলআমি বড় হয়ে কলকাতা শহরে প্লেগের প্রকোপ দেখেছি

সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা