8৮
করুণ-রস
সুন্দর নদের তীরে হেরিনু সুন্দরী
বামারে মলিন-মুখী, শরদের শশী
রাহুর তরাসে যেন! সে বিরলে বসি,
মৃদে কাঁদে সুবদনা ; ঝরঝরে ঝরি,
গলে অশ্রু-বিন্দু, যেন মুক্তা-ফল খসি !
সে নদের স্রোতঃ অশ্রু পরশন করি,
ভাসে, ফুল্ল কমলের স্বর্ণকান্তি ধরি,
গন্ধামোদী গন্ধবহে সুগন্ধ প্রদানি।
না পারি বুঝিতে মায়া, চাহিনু চঞ্চলে
চৌদিকে ; বিজন দেশ ; হৈল দেব-বাণী ;—
“কবিতা-রসের স্রোতঃ এ নদের ছলে ;
করুণা বামার নাম—রস-কুলে রাণী ;
সেই ধন্য, বশ সতী যার তপোবলে।”
৪৯
সীতা—বনবাসে
ফিরাইলা বনপথে অতি ক্ষুন্ন মনে
সুরথী লক্ষ্মণ রথ, তিতি চক্ষুঃ-জলে ;—
উজলিল বন-রাজী কনক কিরণে
স্যন্দন, দিনেন্দ্ৰ যেন অস্তের অচলে।
নদী-পারে একাকিনী সে বিজন বনে
দাঁড়ায়ে, কহিলা সতী শোকের বিহ্বলে ; —
“ত্যজিলা কি, রঘু-রাজ, আজি এই ছলে
চির জন্যে জানকীরে ? হে নাথ ! কেমনে —
কেমনে বাঁচিবে দাসী ও পদ-বিরহে ?
কে, কহ, বারিদ-রূপে, স্নেহ-বারি দানে,
(দাবানল-রূপে যবে দুখানল দহে)
জুড়াবে, হে রঘুচূড়া, এ পোড়া পরাণে ?”
নীরবিলা ধীরে সাধ্বী ; ধীরে যথা রহে
বাহ্য-জ্ঞান-শূন্য মূৰ্ত্তি, নির্ম্মিত পাষাণে।১
৫০
কত ক্ষণে কাঁদি পুনঃ কহিলা সুন্দরী ;—
“নিদ্রায় কি দেখি, সত্য ভাবি কুস্বপনে ?
হায়, অভাগিনী সীতা ! ওই যে সে তরি,
যাহে বহি বৈদেহীরে আনিলা এ বনে
দেবর ! নদীর স্রোতে একাকিনী, মরি ! —
কাঁপি ভয়ে ভাসে ডিঙ্গা কাণ্ডারী-বিহনে !
অচিরে তরঙ্গ-চয়, নিষ্ঠুরে লো ধরি,
গ্রাসিবে, নতুবা পাড়ে তাড়ায়ে, পীড়নে
ভাঙ্গি বিনাশিবে ওরে ! হে রাঘব-পতি,
এ দশা দাসীর আজি এ সংসার-জলে !
ও পদ ব্যতীত, নাথ, কোথা তার গতি!” —
মূর্চ্ছায় পড়িলা সতী সহসা ভূতলে,
পাষাণ-নিৰ্ম্মিত মূৰ্ত্তি কাননে যেমতি
পড়ে, বহে ঝড় যবে প্রলয়ের বলে।
৫১
বিজয়া-দশমী
“যেয়ো না,রজনি,আজি লয়ে তারাদলে
!
গেলে তুমি, দয়াময়ি,
এ পরাণ যাবে ! —
উদিলে নিৰ্দ্দয় রবি উদয়-অচলে,
নয়নের মণি মোর নয়ন হারাবে !
বার মাস তিতি, সতি, নিত্য অশ্রুজলে,
পেয়েছি উমায় আমি ! কি সান্ত্বনা-ভাবে —
তিনটি দিনেতে, কহ, লো তারা-কুন্তলে,
এ দীর্ঘ বিরহ-জ্বালা এ মন জুড়াবে ?
তিন দিন স্বর্ণদীপ জ্বলিতেছে ঘরে
দূর করি অন্ধকার ; শুনিতেছি বাণী —
মিষ্টতম এ সৃষ্টিতে এ কর্ণ-কুহরে !
দ্বিগুণ আঁধার ঘর হবে, আমি জানি,
নিবাও এ দীপ যদি !”—কহিলা কাতরে
নবমীর নিশা-শেষে গিরীশের রাণী।২
১. বইতে টীকাটি ছাপা নেই।
২. মেনকা।
বাংলা শাক্তপদাবলীর অন্তর্গত আগমনী ও বিজয়াসঙ্গীত থেকে উপাদান সংগৃহীত।