:::: সূচীপত্র ::::
কোলকাতা ২য়-অংশ (হেয়ার স্কুল)

আজ দু-বৎসর থেকে air-raid-এর কথা শুনছিকিন্তু কলকাতায় যে air-raid হতে পারে, তা কখনও ভাবিনিআজকাল শুনছি জাপানিরা নাকি আমাদের মাথায় বোমাবর্ষণ করবেফলে বিজলি বাতি উদ্ভাসিত কলকাতা থেকে বহু লোক পলায়ন করেছে, আমিও তাদের মধ্যে একজনকলকাতার এই কৃষ্ণপক্ষ কেটে না-গেলে ভারতবর্ষের রাজধানীতে হয়তো ফিরব না অবস্থায় লিখতে কি মন সরে ?

আমি ইতিপূর্বে বলেছি যে, সাড়ে-তেরো বৎসর বয়সে আমি কলকাতায় পড়তে আসি, চিড়িয়াখানা দেখতেও নয়, যাদুঘর দেখতেও নয়পৃথিবীর অপর দেশের বহু জীবজন্তুর ছবি আমি ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি, তাদের সশরীরে দেখবার আমার বিশেষ কৌতুহল ছিল নাআর যাদুঘরে সেকালে ছিল অধুনালুপ্ত সেকেলে অতিকায় জীবদের কঙ্কাল মাত্রসেই সব হাড়ের সঙ্গে পরিচয় লাভ করবারও কোনরূপ লোভ আমার ছিল না

আমি কলকাতায় এসে হেয়ার স্কুলে এনট্রান্স ক্লাসে ভর্তি হইসেকালে বোধ হয় ট্রান্সফারের কোন হাঙ্গামা ছিল নাহেয়ার স্কুলে শিক্ষার ব্যবস্থা কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের চেয়ে ঢের ভালো ছিলযদিও ইস্কুলবাড়িটি সে কলেজের তুলনায় ক্ষুদ্র, আর সেরকম দর্শনধারী মোটে ছিল নাঘরগুলি ছিল ছোট বিশেষত্বহীনকৃষ্ণনগর কলেজের ঘরগুলি ছিল প্রকাণ্ড উঁচু, আর তার দেওয়ালগুলি ছিল অতি সুন্দর পঙ্খের কাজ করা, ডিমের খোলার মতো তার চেহারাপরে তা জনৈক ইংরেজ প্রিন্সিপালের মনঃপূত না-হওয়ায় তিনি মানুষের মাথার সমান মাপে আলকাতরা দিয়ে দেওয়াল ঢেকে দিয়েছিলেনআমার সে বয়সেও মনে হয়েছিল এরই নাম বিলাতি vandalism. আর সে কলেজের হাতা ছিল বিরাট, যাতে ইচ্ছে করলে এক ডজন ফুটবল খেলার মাঠ হতে পারতহেয়ার স্কুল ছিল রাস্তার ধারে, প্রেসিডেন্সি কলেজের দক্ষিণেমাঝখানে একটু সঙ্কীর্ণ জমি ছিল, যেখানে টিফিনের সময়ে স্থূলকায় ছাত্রেরা বাড়ি থেকে পাঠানো বাটি-বাটি দুধ খেত ব্যাপার আমি ইতিপূর্বে কখনও দেখিনি বলে আমার কাছে বড় অদ্ভুত ঠেকতযাদের বাড়ি থেকে দুধ আসত না, সে সব ছেলে উক্ত দুগ্ধপায়ীদের নানা রকম ঠাট্টাবিদ্রুপ করত, যথা : 'বাড়ি থেকে মা-কে সঙ্গে নিয়ে এলেই তো বেশ কোলে বসে দুধ খেতে পারতিস!

যাক সব কথা !

ভোলানাথ পা তখন হেয়ার ইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলেনতিনি ইংরেজি চমৎকার পড়াতেনসত্য কথা বলতে গেলে, ইংরেজি ভাষার phrases and idioms-এর সঙ্গে তিনিই আমাদের পরিচয় করিয়ে দেনসেকেন্ড মাস্টারের নাম মনে নেইতিনি ছিলেন চেহারায় হেডমাস্টারের ঠিক বিপরীততার নাক ছিল বাঁশি মতো, আর চোখ চকচকেআর ছিল লম্বা পাকা দাড়ি, তার প্রথম অংশটা তামাটে, তারপর সাদা

ছেলেরা বলত তিনি গাঁজা খানবোধ হয় তাঁর শ্মশ্রুর  তাম্রবর্ণ দেখেতাঁকে ছেলেরা অত্যন্ত ভয় করত, যদিচ আমি তাঁকে কখনও কাউকে কড়া শাসন করতে দেখিনিতাঁর একটি কথা আমার আজও মনে আছে। তিনি হেডমাস্টারকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, কেশব কাল সখী হয়ে নৃত্য করেছেন, এর পর বোধ হয় ব্রাহ্মরা সকলে বোষ্টম হয়ে গড়াগড়ি করবেস্কুলের পণ্ডিত ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

আমরা কৃষ্ণনগর কলেজের ভূতপূর্ব পাঁচটি ছাত্র হেয়ার স্কুলে এসে ভর্তি হইতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লালগোপাল চক্রবর্তীসে ছিল দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি বলিষ্ঠ পড়াশোনায় খুব ভালোলাল গোপালের মৃগীরোগ ছিলক্লাসে এসে কখনও-কখনও অজ্ঞান হয়ে যেত, মাস্টাররা সব ভীত হয়ে পড়তেনআমরা কৃষ্ণনাগরিকরা মাথায় একটু জল দিয়ে পাঁচ মিনিটেই তাকে সজ্ঞান করতুপণ্ডিতমশায় আমাদের কখনও ভালো নজরে দেখেননিকেন জানিনেবিশেষত আমার উপর তাঁর যেন একটা আক্রোশ ছিলযদিচ আমরা ক্লাসে অতি ভালোমানুষ ছোকরা ছিলুমতাঁর একটি ব্যবহার আমার আজও মনে আছেএনট্রান্স পরীক্ষার মাসখানেক পরে আমি আমার বন্ধু গোকুল চাটুয্যে একদিন শ্রদ্ধানন্দ পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলুমপণ্ডিতমশায় অপর ফুটপাথে কোথায় যাচ্ছিলেনআমাকে দেখে তিনি রাস্তা পার হয়ে আমাদের ফুটপাথে এলেনএসে প্রথমেই বললেন, 'কী হে চৌধুরী, খুব বাবু সেজে বেরিয়েছ যে!' আমি বললুম, 'হয়তো তাই'

পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে, তা বোধ য় জানো ?
হাঁ, পণ্ডিতমশায়, জানি
পাস, না ফেল ?
পাস |
 তুমি পাস!
হাঁ, ফাস্ট ডিভিশনে

তিনি আর দ্বিরুক্তি না-করে অপর ফুটপাথে চলে গেলেনবছর চল্লিশ পরে আমি তাঁর অতিশয় প্রিয়পাত্র হয়েছিলুমযদিচ বীরবল ইতিমধ্যে তাঁকে ঠাট্টাঠটি করে লিখেছিল

হেয়ার ইস্কুলে থাকতে আমি কলকাত্তাই ছেলেদের প্রতি তেমন অনুরক্ত হইনিতাদের কথাবার্তা ছিল বিরস, তাদের ভাষা ছিল খেলো, আর তাদের রসিকতা সব বস্তাপচাতাদের মধ্যে একটি ছোকরা গোকুল চাটুয্যের আমি অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হয়ে উঠিআমি একদিন ক্লাসে ঢুকছি, এমন সময়ে বিনোদ গুপ্ত নামে দাড়ি-গোঁফওয়ালা একটি ছোকরা আমাকে কোন একটি চরমে সম্ভাষণ করে, যা আমার কানে অত্যন্ত বিশ্রী লাগেআমি তার গালে এক চপেটাঘাত করি; যদিচ আমি তখন বালক, আর গুপ্তজা যুবকআমনি তার দলবল আমাকে মারতে উদ্যত হয়এমন সময়ে গ্যালারি থেকে একটি ছোকরা লাফিয়ে পড়ে চিৎকার করে বললে, যে প্রমথ চৌধুরীর গায়ে হাত দেবে, তাকে আমি খুন করছোকরাটি ছিল ক্লাসের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জিমন্যাস্ট আর অতিশয় শক্তিশালীআমি তাকে পূর্বে চিনতুম না; এই ঘটনায় তার সঙ্গে আমার পরিচয় হলতারই নাম গোকুল চাটুয্যেপরে সে আমার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেউপরন্তু, সে আমার ফাইফরমাশ খাটতবড়বাজারে আমার সঙ্গে যেত, কাপড় কিনে দেবার জন্যআমার পরিচিত একটি ছোকরা তার বাড়িতে জোড়াবাগানে নিয়ে যেতহেয়ার ইস্কুলে আমি ক্রমে আবিষ্কার করি যে অনেকের কাছে আমি 'ললিতা' বলে পরিচিত ছিলুমআমি একটি ছোকরাকে একদিন জিজ্ঞাসা করি নামের অর্থ কী? সে বলে, ‘তুমি রবীন্দ্রনাথের ভগ্নহৃদয় পড়েনি? আমি বলি'না'সে বলে, 'একখানি ভগ্নহৃদয় কিনে পড়ো, তা হলেই জানতে পারবে যে ললিতার সঙ্গে তোমার কী মিল আছে' তার কথায় আমি 'ভগ্নহৃদয়' কিনে পড়িরবীন্দ্রনাথের পুস্তকের সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়

আমি 'ভগ্নহৃদয়'পড়ে মুগ্ধ হইনি, এবং ললিতার সঙ্গে আমার মিল কোথায়, তা- বুঝতে পারিনি। 'ভগ্নহৃদয়'- দুটি-চারটি প্রাকৃতিক বর্ণনা আমার খুব ভালো লাগেআর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত একটি গান ইস্কুলের ছেলেরা গাইততার প্রথম কথাগুলি প্রেমের কথা আর বোল নাশুনলুম এর সুরের নাম ইটালিয়ান ঝিঁঝিট। ঝিঁঝিট আমি জানতু, কিন্তু ইটালিয়ান ঝিঁঝিট কাকে বলে জানতুম নাএর থেকে আমার ধারণা হয় যে, কলকাতার ছেলেরা সঙ্গীতছুটপরে অভিজ্ঞতায় সে মতামত আমার দৃঢ় হয়েছিলকেন, সে কথা পরে বলব

সূত্র : আত্মকথা - প্রমথ চৌধুরী
মূল বইয়ে এমন অংশ বিভাজন নেই, ব্লগে প্রকাশের সুবিধার্থে এমন করা