মেঘের কাহিনী
সম্বর হ্রদে, জর্জর দেহে, ঘুমায়ে আছিনু ভাই,
লবণে জড়িত লহরের
কোলে ঘুমেও স্বস্তি নাই ;
সহসা পূরবে, তরুণ অরুণ হাসিয়া দিলেন দেখা,
আমি জাগিলাম, বুকে দেখিলাম অরুণ-কিরণ লেখা !
কিরণাঙ্গুলি ধরি’
আমি, উঠিলাম ত্বরা করি’,
কম্পিত, ক্ষীণ, জর্জ্জ্বর তনু—ললাটে বহ্নি-শিখা ।
তৃণ পল্লবে, নিম্ন বায়ুতে আপনার জ্বালা ঢালি’
উচ্চ গিরির উন্নত
চূড়ে উঠতে লাগিনু খালি ;
কঠোর শিলার পরশে
আমার নয়নে ঝরিল জল,
ছল ছল চোখে লাগিনু উঠিতে—ছুঁইনু গগনতল ।
ডুবিলেন দিননাথ,
হাসি, পবন ধরিল হাত ;
তুষারের মত হ’য়ে গেল দেহ, ফুরা’ল সকল বল।
* * * *
বাতাসের সাথে
ধরি হাতে হাতে গগনে ছুটিনু কত,
পলে পলে ধরি
অভিনব রূপ—খেলি বাতাসেরি মত ;
চন্দ্রমা আর গ্রহ তারকার সকল বরতা লয়ে’—
বরষের পথ
মনের আবেগে নিমেষে চলিনু ধেয়ে ;
কত যে হেরিকু, আহা,
কভূ, স্বপনে ভাবিনি যাহা ।
ডাকে মোরে
দূর চাতক, ময়ুর, কবি—গান গেয়ে গেয়ে !
বিশ্বের ডাক
শুনেছি আবার—হৃদয় ভ’রেছে স্নেহে,
বিশ্বের প্রেমে
পরাণ আমার ধরেনা ক্ষুদ্র দেহে ;
বুকে ধরি
খর বিজলীর জ্বালা বুঝেছি আপনি জলে’
ধরণীর জ্বালা, তাই ত’ আবার চলিয়াছি মহীতলে ।
মরুতে যে বায়ু ব’য়—
আর, করিনা তাহারে ভয় ;
রঙীন মেখলা
পরিয়া চলেছি আশা দিতে ফুলদলে ।
আমারি মতন
কত শত মেঘ জুটেছে আজিকে হেথা,
কাজলের মত
বরণ, গাহিছে জীমূত-মন্দ্র-গাথা ।
চলিতে দুলিছে
শত গোস্তন, পূর্ণ শীতল রসে,
বেদনা তাপিত
আবেশে ঘুমায়, কবরীবন্ধ খসে ;
টুটে কৃতচূড় জটা,
তাহে, ফুটে দামিনীর ছটা,
কুন্তল ভার—আকুল ধরার চোখে মুখে পড়ে এসে ।
ঝর্ঝর রবে ঝরে বারিধার, শিখিলিত কেশ, বেশ ;
গর্জ্জন ধ্বনি সহসা উঠিল ব্যাপিয়া সৰ্ব্বদেশ ।
এ পারে বজ্র অট্ট হাসিল, ও পারে প্রতিধ্বনি,—
সংজ্ঞা হারা’নু, কি যে হ’ল পরে আর কিছু নাহি জানি।
জাগিনু যখন শেষ,
দেখি, আছি আমি ব্যাপি’ দেশ,
ভূতলে অতলে যেতেছে মিলায়ে আমারি সে তনুখানি !
আজ নাহি মোর জোছনা সিনান, কিরণে শিঙার নাই,
নাহি রামধনু-মেখলা আমার, নাই কিছু নাই, ভাই ;
আজ আমি শুধু সলিল-বিন্দু, ভাই আজি মোর ধূলি,
চাঁদের মিতালি ভোলা যায়, করি’ তার সাথে কোলাকুলি !
আমি, নহি নহি মেঘ আর,
এবে, জল আমি পিপাসার,
সার্থক আজি জন্ম আমার-যূথিরে ফুটায়ে তুলি ।