মোবাশ্বের আলী
(১৯৩১-২০০৫)
অধ্যাপক মোবাশ্বের আলী
ছিলেন একাধারে
একজন ভাষাসৈনিক,
সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, সাহিত্য সমালোচক, শিক্ষাবিদ,
কথাশিল্পী, অনুবাদক ও গবেষক।
অত্যন্ত পারঙ্গমতার
সঙ্গে তিনি
বাংলা ভাষাকে
সমৃদ্ধ করতে
সচেষ্ট ছিলেন।
ড. নীলিমা ইব্রাহীমের
ভাষায়, “মফস্বলের
একজন অধ্যাপক--অথচ বাংলা
সাহিত্যের বিশেষতঃ প্রবন্ধ সাহিত্যকে উন্নত
করতে তাঁর
যে সদা
প্রচেষ্টা সে জন্য তিনি অবশ্যই
প্রশংসার যোগ্য”
(মোবাশ্বের আলী- সাহিত্যকর্ম ও স্মারকগ্রন্থ-
মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ-সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১৩)
তাঁর অন্যতম সাহিত্যকর্মের
একটি -“শেলীঃ
জীবন ও
সাহিত্যকৃতি” গ্রন্থটি সম্পর্কে অধ্যাপক কবীর
চৌধুরী’র
বক্তব্য- “পনেরোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই
গ্রন্থে মোবাশ্বের
আলী ইংরেজী
কাব্য সাহিত্যের
এক শক্তিশালী
কবির জীবন
ও সাহিত্য
কর্মের মনোজ্ঞ
বিবরণ প্রদান
করেছেন।
... মোবাশ্বের আলীর গ্রন্থে কবির ব্যক্তি
জীবনের নানা
অন্তরঙ্গ বিষয়
চমৎকার ফুটে
উঠেছে।”
বাংলা সাহিত্যের তিন
মহারথী- রবীন্দ্র,
নজরুল এবং
মধুসূদন সম্পর্কে
তিনি সমসাময়িককালে
সম্পূর্ণ নতুন
আঙ্গিকে, নতুন
দৃষ্টভঙ্গিতে সমালোচনা করে গেছেন।
মোবাশ্বের আলী কর্তৃক
রচিত রবীন্দ্র-নজরুল ৮টি
বই হলো:
১। নজরুল
প্রতিভা (৫ম
সংস্করণ); ২। নজরুল : সমাজ,
পরিবেশ, কাল;
৩।
নজরুল ও
সাময়িক পত্র,
৪।
নজরুল ও
তিন নারী;
৫।
স্মৃতিপটে নজরুল; ৬। রবীন্দ্রনাথ
: অন্তরঙ্গ আলোকে (২য় সংস্করণ), ৭। রবীন্দ্রনাথ
: স্মৃতির আলোকে; ৮। রবীন্দ্রনাথ
: গল্প থেকে
নাটক।
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন
সম্পর্কেও তাঁর মূল্যবান গ্রন্থগুলো হলো
১। মধুসূদন
ও নবজাগৃতি
(বইটির সপ্তম
সংস্করণ প্রকাশিত
হয়েছিল বলে
জানি)
২। মধুসূদনের
বিশ্ব
৩। মধুসূদনের
পত্রাবলী ও
স্মৃতিকথা এবং
৪। মাইকেল
মধুসূদন দত্ত-ইংরেজী গদ্য
রচনা ও
স্মৃতিকথা।
কবি মাইকেল মধুসূদন
দত্তের ব্যাপারে
তিনি একজন
অথরিটি ছিলেন। (প্রফেসর
ড. আব্দুল
মান্নান চৌধুরী,
দৈনিক জনকণ্ঠ-
৯ নভেম্বর
২০১২)
‘মধুসূদন ও নবজাগৃতি’
সম্পর্কে অধ্যাপক
দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের উক্তি প্রণিধানযোগ্য
: “মোবাশ্বের আলী তথ্যপূর্ণ আলোচনার সাহায্যে
রেনেসাঁস প্রভাবিত
মধুসূদন প্রতিভার
জাগরণের চিত্রটি
সাফল্যের সাথে
তুলে ধরেছেন।”
ভারতীয় শিক্ষাবিদ প্রফেসর
ড. প্রণয়কুমার
কুণ্ডু'র
মূল্যায়ণ,
“মোবাশ্বের আলীর বইটি
যখন হাতে
এল, তখন
মনে
হল-বাংলার পূর্বপ্রান্তে এমন কিছুসংখ্যক
সাহিত্যের পাঠক ও লেখক রয়েছেন,যাঁরা নিরলস
অধ্যবসায় ও
নিষ্ঠার সঙ্গে
সব কিছু
সংকীর্ণতার নানা দিগন্ত উন্মুক্ত হয়েছে,
ওখানেও তেমনি
নতুন নতুন
দৃষ্টিকোণ থেকে মধুসূদনের নবমূল্যায়নের চেষ্টা
হয়েছে।”
(মোবাশ্বের আলী- সাহিত্যকর্ম
ও স্মারকগ্রন্থ-
মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ-সম্পাদিত পৃষ্ঠা-১৮)
তা ছাড়া ‘বঙ্কিম
সাহিত্য দর্শনের
স্বরূপ অন্বেষণ’
নামে গ্রন্থটিতেও
তিনি প্রতিভার
স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘বঙ্কিমচন্দ্রের
জীবন ও
সাহিত্য কীর্তি’
তাঁর আরেকটি
উল্লেখযোগ্য গবেষণামূলক গ্রন্থ।
অনুবাদক হিসেবেও মোবাশ্বের
আলী ছিলেন
সার্থক ।
তাঁর অনুবাদকর্মের
মধ্যে রয়েছে:
আগামেমনন, তপন বাহকেরা,
দয়ালুরা, এন্টিগোনী,
ইলিয়ড, ওডিসি,
ঈনিড, ট্রয়ের
রমনীরা, রমণীর
রোধ ও
অন্যান্য গল্প,
সিসিফাস ও
অন্যান্য গল্প,
ভার্জিনের বার্ণিও, প্লুটার্ক (১ম ,২য়
ও ৩য়
খণ্ড), পেরিক্লিস,
আলেকজান্ডার সহ আরো কিছু প্রবন্ধ। ।
আসলে অনুবাদকর্মের
মাধ্যমেই মোবাশ্বের
আলী যে
অমরতার সঞ্চার
করেছেন, তা
তাকে এক
ভিন্ন মাত্রা
দিয়েছে।
নিজের আলোয়
তিনি দীপ্তিমান
হয়ে উঠেছেন। বাংলা
ভাষার অনুবাদ
কর্মে তিনি
রচনা করেছেন
একটি স্বতন্ত্র
ধারা।
তাঁর পরিশীলিত
অনুবাদ কর্মের
গুণে পাঠকদের
মুগ্ধ করেছেন।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত
গ্রন্থ ‘বিশ্বসাহিত্য’,
প্রথম প্রকাশ
১৯৭৪-তে,
২০১২ সালে
প্রকাশ হয়েছে
ষষ্ঠ সংস্করণ
। বিশ্বসাহিত্যের চর্চা করতে করতে
তিনি যেন
নিজেই বিভিন্ন
দেশের সাহিত্যিকদের
জীবন ও
সাধনার সঙ্গে
একাত্ম হয়ে
যেতেন।
বিশ্বসাহিত্যে তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। শেক্সপিয়ার,
হোমার, সফোক্লিস,
ভার্জিল, কালিদাস,
তলস্তোয়, চেখভ,
গোর্কি, পাস্তারনাক,
ওমর খৈয়াম,
হাফিজ কি
শেলি—সবার
বিষয়ে তাঁর
গবেষণা ও
মূল্যায়ন ছিল সূক্ষ্ম ও গভীর। তিনি
বাংলা ভাষাভাষী
পাঠকের জন্য
বিশ্বসাহিত্যের জানালা খুলে দিয়েছিলেন।
‘বিশ্বসাহিত্য’ একটি ক্ল্যাসিক গ্রন্থ, এই
গ্রন্থ তাঁকে
অমরতা দান
করেছে।
গ্রন্থটি সম্পর্কে বিজ্ঞজনের
অভিমত নিম্নরূপ:
বাংলাদেশে স্বদেশ ও
বিদেশের সাহিত্য-কর্ম সম্পর্কে
যাঁরা বিদগ্ধ
আলোচনা করেছেন,
তাঁদের মধ্যে
নিঃসন্দেহে মোবাশ্বর আলী একজন।
(অধ্যাপক কবীর
চৌধুরী)
সুন্দর ও নির্মোহ
ভঙ্গীতে দক্ষভাবে
লেখক বিশ্ব
সাহিত্য গ্রন্থখানিকে
সমৃদ্ধ করতে
সক্ষম হয়েছে। লেখক
তাঁর সৃষ্টি
শৈলিতায় গ্রন্থখানি
এদেশের পাঠকের
কাছে বিশ্বসাহিত্যের
দরবার মেলে
ধরেছেন।
দু’বাঙলার
জন্য এটি
একটি উন্নত
কাজ।
(ড. নীলিমা
ইব্রাহীম)
স্বদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি,
ইতিহাস-ঐতিহ্য
অনুসন্ধান ও অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি
বিশ্বসাহিত্য পরিক্রমায়ও নিষ্ঠাবান ছিলেন।
গ্রীক-ইংরেজি-ফরাসী প্রভৃতি
ভাষায় সাহিত্য
ও সাহিত্যিক
ব্যক্তিত্বসহ বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিক ও আধুনিক
রূপকারদের পরিচয় এবং সাহিত্যের স্বরূপ
তিনি তুলে
ধরেছেন তাঁর
লেখনীর মাধ্যমে। (শান্তি
রঞ্জন ভৌমিক)
৫২-এর ভাষা
আন্দোলনে সক্রিয়
অংশগ্রহনের সৌভাগ্য হয়েছিল ভাষাসৈনিক মোবাশ্বের
আলী’র। তিনি
১৯৪৮ সাল
থেকে ১৯৫২
সাল পর্যন্ত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বাংলা বিভাগের
ছাত্র ছিলেন
ও ফজলুল
হক মুসলিম
হলের আবাসিক
ছাত্র ছিলেন। ৪৮
থেকে ৫২
সাল পর্যন্ত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বিশেষত ফজলুল
হক হলের
আবাসিক ছাত্ররূপে
ভাষা আন্দোলনের
আর্থ-সামাজিক
প্রেক্ষাপট নিরীক্ষণের অবকাশ তাঁর হয়েছিল
এবং তিনি
এতে সক্রিয়ভাবে
অংশগ্রহণের সুযোগ পান। ভাষা
আন্দোলন সম্পর্কে
মোবাশ্বের আলী সাহেবের কিছু উক্তি
সংযোজন করছি—
“বাংলার মানুষের জন্য
ভাষা আন্দোলন
একটি গুরুত্বপূর্ণ
মাইলফলক এবং
এই আন্দোলনকে
সীমিত অর্থে
নয়, বৃহত্তর
অর্থে তাত্পর্য
গ্রহণ করতে
হবে।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান
সৃষ্টি।
কিন্তু জনসংখ্যার
দিক দিয়ে
পূর্ব পাকিস্তান
তথা পূর্ব
বাংলা সংখ্যাগরিষ্ঠ
হলেও পশ্চিম
পাকিস্তানীদের হাতে শোষণ ও শাসনের
শিকারে পরিণত
হয় এবং
তা বিশেষভাবে
প্রকট হয়ে
ওঠে ভাষার
ক্ষেত্রে।
অধিকাংশ পাকিস্তানীর
ভাষা বাংলা
হলেও পাকিস্তানের
সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলার কোন স্থান
হলো না
নবসৃষ্ট রাষ্ট্রে। এই
বঞ্চনার ফলে
বাংলার মানুষের
মনে যে
ক্ষোভ তা
ফেটে ওঠে
বায়ান্নর একুশেতে। বায়ান্নর
একুশেতে ভাষাকে
কেন্দ্রীভূত করে যে বিক্ষোভ, এর
মূলে শুধু
ভাষা নয়,
আর্থ-সামাজিক
ঘটনাবলীও কার্যকর
হয়েছে।
বাংলার মানুষের
যে বঞ্চনা,
পশ্চিম পাকিস্তানীদের
যে আধিপত্যবাদ,
এই সকল
মিলে ভাষা
আন্দোলনকে জোরদার করে তোলে।
ভাষা আন্দোলনের
সাথে বিজড়িত
হয়ে আছে
আর্থিক, সামাজিক
ও রাষ্ট্রীয়
সকল সমস্যা। এজন্য
একুশের যে
বিস্ফোরণ তা
বৃহত্তর তাত্পর্যে
নির্ণয় করতে
হবে।
এজন্য একুশ
থেকে যাত্রা
শুরু করে
একাত্তরে এসে
এই ভাষা
আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের
রূপ পরিগ্রহ
করে।
ভাষা আন্দোলন,
যথার্থ বলতে
বঞ্চিত মানুষের
বিক্ষোভের এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস।”
(ভাষাসৈনিক শামসুল হুদা
-ইত্তেফাক,০৯ নভেম্বর, ২০১৪)
** অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
**
মধুসূদন ও নবজাগৃতি,
নজরুল প্রতিভা,
রবীন্দ্রনাথ:অন্তরঙ্গ আলোকে,
রবীন্দ্রনাথ: গল্প থেকে
নাটক,
শেলীঃ জীবন ও
সাহিত্যকৃতি,
বরিস পাস্তেরনাক,
শিল্পীর ট্র্যাজেডি,
নজরুল ও সাময়িকপত্র,
নজরুলঃ সমাজ পরিবেশ
কাল,
গ্রীসের গল্প,
গ্রীসের দশটি গল্প,
গ্রীসের আরো গল্প,
গ্রীক ট্যাজেডি,
এন্টিগোনি (রূপান্তর),
শিল্পীর ভূবন,
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি,
মধুসূদনের বিশ্ব,
আগামেমনন (রূপান্তর),
তর্পন বাহকেরা (রূপান্তর),
দয়ালুরা (রূপান্তর)।
মোবাশ্বের আলীর রচিত
ও অনূদিত
গ্রন্থসংখ্যা ৪৫টি।
**কিছু সামাজিক স্বীকৃতি**
বাংলা একাডেমি পুরস্কার
(১৯৭৪),
কুমিল্লা ফাউন্ডেশন পুরস্কার
(১৯৮৪),
কুমিল্লা জেলার ইতিহাসের
প্রধান সম্পাদকরূপে
স্বর্ণপদক লাভ (১৯৮৫),
বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ
পুরস্কার (১৯৯৩),
ফেলো, বাংলা একাডেমি,
জাতীয় নজরুল
সমাজ স্বর্ণপদক
(২০০১),
রেপোর্ট বাংলাদেশ মানব
উন্নয়ন পুরস্কার
(২০০৪),
একুশে পদক (১৯৯২),
মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার
(১৯৯৩),
বাংলাদেশ মহিলা সমিতি
পুরস্কার (১৯৯৫) এবং
নজরুল পুরস্কার (১৯৯৯)।