২৮
সৃষ্টিকৰ্ত্তা
কে সৃজিলা এ সুবিশ্বে, জিজ্ঞাসিব কারে
এ রহস্য কথা, বিশ্বে, আমি মন্দমতি ?
পার যদি, তুমি দাসে কহ, বসুমতি ;—
দেহ মহা-দীক্ষা, দেবি, ভিক্ষা, চিনিবারে
তাঁহায়, প্রসাদে যাঁর তুমি, রূপবতি,—
কে তিনি, দিনেশ রবি, করি এ মিনতি,
যাঁর আদি জ্যোতিঃ, হেম-আলোক সঞ্চরে
তোমার বদন, দেব, প্রত্যহ উজ্জ্বলে ?
অধম চিনিতে চাহে সে পরম জনে,
যাঁহার প্রসাদে তুমি নক্ষত্ৰ-মণ্ডলে
কর কেলি নিশাকালে রজত-আসনে,
নিশানাথ। নদকুল, কহ কলকলে,
কিম্বা তুমি,
অম্বুপতি,
গম্ভীর স্বননে।
২৯
সূৰ্য্য
এখনও আছে লোক দেশ দেশান্তরে
দেব ভাবি পূজে তোমা,
রবি দিনমণি,
দেখি তোমা দিবামুখে উদয়-শিখরে,
লুটায়ে ধরণীতলে,
করে স্তুতি-ধ্বনি ;
আশ্চর্যের কথা, সূৰ্য্য,
এ না মনে গণি।
অসীম মহিমা তব, যখন প্রখরে
শোভ তুমি,
বিভাবসু,
মধ্যাহ্নে অম্বরে
সমুজ্জ্বল করজালে আবরি মেদিনী !
অসীম মহিমা তব, অসীম শকতি,
হেম-জ্যোতিঃ-দাতা তুমি চন্দ্র-গ্রহ-দলে ;
উর্ব্বরা তোমার বীর্য্যে
সতী বসুমতী ;
বারিদ,
প্রসাদে তব, সদা পূর্ণ জলে ;—
কিন্তু কি মহিমা তাঁর,
কহ,
দিনপতি,
কোটি রবি শোভে নিত্য যাঁর পদতলে!
৩০
সীতাদেবী
অনুক্ষণ মনে মোর পড়ে তব কথা,
বৈদেহি! কখন দেখি,
মুদিত নয়নে,
একাকিনী
তুমি, সতি, অশোক-কাননে,
চারি দিকে চেড়ীবৃন্দ,
চন্দ্রকলা যথা
আচ্ছন্ন মেঘের মাঝে ! হায়,
বহে বৃথা
পদ্মাক্ষি, ও
চক্ষুঃ হতে অশ্রু-ধারা ঘনে !
কোথা দাশরথি
শূর কোথা মহারথী
দেবর
লক্ষ্মণ, দেবি, চিরজয়ী রণে ?
কি সাহসে,
সুকেশিনি, হরিল তোমারে
রাক্ষস ?
জানে না মূঢ়, কি ঘটিবে পরে !
রাহু-গ্রহ-রূপ
ধরি বিপত্তি আঁধারে
জ্ঞান-রবি, যবে
বিধি বিড়ম্বণ করে !
মজিবে এ
রক্ষোবংশ, খ্যাত ত্রিসংসারে,
ভূকম্পণে,
দ্বীপ যথা অতল সাগরে !
৩১
মহাভারত
কল্পনা-বাহনে
সুখে করি আরোহণ,
উতরিনু,
যথা বসি বদরীর তলে,
করে বীণা,
গাইছেন গীত কুতূহলে
সত্যবতী-সুত কবি,—ঋষিকুল-ধন !
শুনিলু গম্ভীর ধ্বনি ; উম্মীলি নয়ন
দেখিনু কৌরবেশ্বরে,২
মত্ত বাহুবলে ;
দেখিনু পবন-পুত্রে৩,
ঝড় যথা চলে
হুঙ্কারে !৪ আইলা কর্ণ—সূর্যের নন্দন৫—
তেজস্বী। উজ্জ্বলি যথা ছোটে অনম্বরে
নক্ষত্র,
আইলা ক্ষেত্রে পার্থ মহামতি,
আলো করি দশ দিশ, ধরি বাম করে
গাণ্ডীব৬—প্রচণ্ড-দণ্ড-দাতা রিপু প্রতি।৭
তরাসে আকুল হৈনু এ কাল সমরে,
দ্বাপরে গোগৃহ-রণে উত্তর যেমতি।৮
১. সম্ভ্রম
শব্দের আদি অর্থ ভয়। মধুসূদন সেই অর্থই গ্রহন করেছেন। অসম্ভ্রম ব্যবহার করে নির্ভয়
বুঝিয়েছেন।
২. কৌরবদের
মধ্যে প্রধান—দুর্যোধন।
৩. ভীমসেন।
পবনের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে জন্ম।
৪. ভীম ও দুর্যোধনের
গদাযুদ্ধ প্রসঙ্গ।
৫. কুন্তীর
কুমারী অবস্থার পুত্র। সূর্যের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে কর্ণের জন্ম।
৬. অর্জুনের
ধনুক। খাণ্ডবদাহনের প্রাক্কালে অগ্নিদেব প্রদত্ত।
৭. কর্ণ ও
অর্জুনের যুদ্ধ প্রসঙ্গ।
৮.
মহাভারতের বিরাট পর্বের প্রসঙ্গ। গোগৃহে কৌরবদের গোহরণকালে বৃহন্নলাবেশী অর্জুনকে
একাকী কৌরবদের পরাজিত করতে দেখে উত্তরা ভীত সম্ভ্রস্ত হয়েছিলেন।