৩২
নন্দন-কানন
লও দাসে,
হে ভারতি,
নন্দন-কাননে,
যথা ফোটে পারিজাত ; যথায় উৰ্ব্বশী, —
কামের আকাশে বামা চির-পূর্ণ-শশী, —
নাচে করতালি দিয়া বীণার স্বননে ;
যথা রম্ভা, তিলোত্তমা,
অলকা রূপসী
মন্দাকিনী বাহিনীর স্বর্ণ তীরে বসি,
মিশায়ে সু-কণ্ঠ-রব বীচির বচনে !
যথায় শিশিরের বিন্দু ফুল্ল ফুল-দলে
সদা সদ্যঃ ; যথা অলি সতত গুঞ্জরে ;
বহে যথা সমীরণ বহি পরিমলে ;
বসি যথা শাখা-মুখে কোকিল কুহরে ;
লও দাসে ; আঁখি দিয়া দেখি তব বলে
ভাব-পটে কল্পনা যা সদা চিত্র করে।
৩৩
সরস্বতী
তপনের তাপে তাপি পথিক যেমতি
পড়ে গিয়া দড়ে রড়ে ছায়ার চরণে ;
তৃষাতুর জন যথা হেরি জলবতী
নদীরে,
তাহার পানে ধায় ব্যগ্র মনে
পিপাসা-নাশের আশে ; এ দাস তেমতি,
জ্বলে যবে প্রাণ তার দুঃখের জ্বলনে,
ধরে রাঙা পা দুখানি,
দেবি সরস্বতি ! —
মার কোল-সম, মা গো, এ তিন ভুবনে
আছে কি আশ্রম আর ? নয়নের জলে
ভাসে শিশু যবে, কে সান্ত্বনে তারে ?
কে মোছে আঁখির জল অমনি আঁচলে ?
কে তার মনের খেদ নিবারিতে পারে,
মধুমাখা কথা কয়ে,
স্নেহের কৌশলে ? —
এই ভাবি,
কৃপাময়ি,
ভাবি গো তোমারে !
৩8
কপোতাক্ষ নদ
সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে।
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে ;
সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া-যন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে ! —
বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে ?
দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি-স্তনে।১
আর কি হে হবে দেখা ?—যত দিন যাবে,
প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে
বারি-রূপ কর তুমি ; এ মিনতি,
গাবে
বঙ্গজ-জনের কানে,
সখে,সখা-রীতে
নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে
লইছে যে তব নাম বঙ্গের সঙ্গীতে।
৩৫
ঈশ্বরী পাটনী
“সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটনী।”
অন্নদামঙ্গল।
কে তোর তরিতে বসি, ঈশ্বরী পাটনি ?২
ছলিতে তোরে রে যদি কামিনী কমলে, —
কোথা করী, বাম করে ধরি যারে বলে,
উগরি,
গ্রাসিল পুনঃ পূৰ্ব্বে সুবদনী ?
রূপের খনিতে আর আছে কি রে মণি ?
এর সম? চেয়ে দেখ, পদ-ছায়া-ছলে, —
কনক কমল ফুল্ল এ নদীর জলে —
কোন দেবতারে পুজি,
পেলি এ রমণী ?
কাঠের সেঁউতি তোর, পদ-পরশনে
হইতেছে স্বর্ণময়। এ নব যুবতী —
নহে রে সামান্যা নারী,
এই লাগে মনে ;
বলে বেয়ে নদী-পারে যা রে শীঘ্ৰগতি।
মেগে নিস্,
পার করে, বর-রূপ ধনে
দেখায়ে ভকতি শোন্,
এ মোর যুকতি !
১. কবি
প্রবাসে সাগরদাঁড়ি ও সন্নিহিত নদী কপোতাক্ষকে স্মরণ করেছেন।
২. ভারতচন্দ্রের
অন্নদামঙ্গল কাব্যের প্রসঙ্গ। দেবী অন্নদা ছদ্মবেশে ঈশ্বরী পাটনীর নৌকায় নদী পার
হয়েছিলেন।